আপাতত দুটি স্ক্রিন এবং ৪২২টি দর্শকাসন নিয়ে শুরু হয়েছে নয়া ‘মেট্রো’
নস্টালজিয়া উস্কে দীর্ঘ এক দশক পর সিনেপ্রেমীদের জন্য আবার খুলল ঐতিহ্যবাহী মেট্রো সিনেমা হলের সদর দরজা। কালের নিয়মে শহরে একের পর এক মাল্টিপ্লেক্স আর ঝাঁ চকচকে শপিং মল/ প্রেক্ষাগৃহের রমরমায় হারিয়ে গেছে মেট্রোর মতো কত কত সিনেমা হল। ২০১১ সালে একটি হিন্দি ছবির মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যায় মেট্রোর দরজা। দশ বছর পর নস্টালজিয়ায় ভাসছে শহরবাসী।
ঠিকানা ৫, চৌরঙ্গী রোড (আদি কলকাতা অনুযায়ী), ধর্মতলার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একটা হেরিটেজ বিল্ডিং। মেট্রো সিনেমা হল। ১৯৩৫ সালে মেট্রো গোল্ডেন মেয়ার কোম্পানির হাতে প্রতিষ্ঠা এই থিয়েটারের। ধর্মতলার অন্যতম বনেদি জায়গায় এই হল অবহেলায় বন্ধ পড়ে থেকেছে বহুদিন। অথচ তার নামে এই এলাকার নাম হয়েছে মেট্রো। বাস এসে লোক নামিয়েছে ‘মেট্রো’ ডাক দিয়ে। কত মানুষ দেখা করেছেন এই ঠিকানায়। এরপর মুম্বাইয়ের একটি ফার্ম কিনে নেয় থিয়েটারটি। পুনঃনির্মাণ শুরু হয় হলের। এরপর মেট্রো সেন্ট্রাল নামে খোলা হয় একটি শপিং কমপ্লেক্স। যার বাইরেটা রেখে দেওয়া হয়েছিল হুবহু মেট্রো সিনেমার মতো।
আপাতত দুটি স্ক্রিন এবং ৪২২টি দর্শকাসন নিয়ে শুরু হয়েছে নয়া ‘মেট্রো’
কেবল ভেতর থেকে বদলে গেছে সবকিছু। যেভাবে মানুষ বদলায়। অবশেষে মধ্য কলকাতার বিখ্যাত এই ল্যান্ডমার্ক মুছে ফেলা গেল না। ১৯৩৪ সালে এক মার্কিনি কোম্পানি তাঁদের নিজেদের সিনেমা প্রোমোট করতে ব্রিটিশ রাজত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতায় শুরু করেন এই হল। এলিট ব্রিটিশ শহর হিসাবে কলকাতায় তখন হলিউডি আর বলিউডি সিনেমার চাহিদা তুঙ্গে। থমাস ডব্লিউ ল্যাম্ব নামক নিউইয়র্কের এক বিখ্যাত থিয়েটার স্থপতির নকশায় নির্মিত হল এই হল। ১৯৩৫ সালে প্রথমবারের জন্য স্ক্রিনিং হল ‘ওয়ে আউট ওয়েস্ট’ নামক একটি ইংরেজি ছবির। ব্রিটিশ রাজত্বে কলকাতানিবাসী ব্রিটিশ এলিটদের ভিড়ে এই হল প্রতি শো-এ হাউজফুল হত। দেশ স্বাধীনের বহু বছর পর টলিউড ধীরে ধীরে জায়গা করে নিল মেট্রোয়। একবিংশ শতকের দোরগোড়ায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে মেট্রো। দর্শকদের উপস্থিতি ম্লান হয়ে আসে। বহু হোঁচট খেতে খেতে ২০১০ সাল পর্যন্ত সিনেমা দেখানো বন্ধ করেনি তারা। ২০১১-তে হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতাবাসী ভেবেছিল তাঁদের একটা যুগ শেষ হয়ে গেল। এখন শুধু স্মৃতি আঁকড়ে থাকা।
২০১২ সালে কলকাতা মিউনিসিপাল করপোরেশনের হেরিটেজ কমিশন নিলামে তোলে এই হেরিটেজ বিল্ডিং। মুম্বাইয়ের একটি ফার্ম কিনে নেয় সম্পত্তি। তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এটিকে ছ’তলা মাল্টিপ্লেক্সে পরিণত করা হয়। সব বদলে গেলেও হলের ঐতিহ্যশালী সম্মুখদ্বার ও সিঁড়িটি রেখে দেওয়া হয়েছিল হুবহু এক। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আবার দর্শকদের জন্য খুলে গেল ঐতিহ্যবাহী মেট্রোর দরজা। কলকাতার প্রবীণ নাগরিক এবং আইটি পর্যবেক্ষক অরুণ পাল এই খবরে খুবই খুশি। তিনি জানাচ্ছেন, “এমন শহরবাসী খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন, যিনি কোনওদিন মেট্রোতে সিনেমা দেখেননি। মেট্রো তো আমাদের কাছে শুধুই সিনেমাহল নয়, আমাদের ছোটোবেলা, প্রেম এমনকি শহরের অন্যতম একটি ল্যান্ডমার্ক, যা কলকাতার বহু পুরোনো সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।”
বর্তমান মেট্রো আইনক্স
এক্কেবারে নতুন রূপে দর্শকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কর্তৃপক্ষ। মেট্রো রিয়্যালিটি গ্রুপের তরফে আপাতত দুটি স্ক্রিন এবং ৪২২টি দর্শকাসন নিয়ে মেট্রো শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রদর্শনী হচ্ছে তিনটি ছবির – বাংলা ছবি ‘প্রেম টেম’ এবং হলিউড ছবি ‘টম অ্যান্ড জেরি’ ও ‘টুইসডেস অ্যান্ড ফ্রাইডেস’। ভোজনপ্রেমীদের জন্য থাকছে ক্যাফে আনওয়াইল্ড। সিনেমা না দেখে শুধুমাত্র খাবারের মজাও নেওয়া যেতে পারে। আগের মতো সিঙ্গল স্ক্রিন নয়, আইনক্সের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মেট্রো এবার ‘মেট্রো আইনক্স’।
হেরিটেজ স্থপতি সুবীর কুমার বসুর মস্তিষ্কপ্রসূত এই নয়া মেট্রোর নকশা
বিশিষ্ট হেরিটেজ স্থপতি সুবীর কুমার বসুর মস্তিষ্কপ্রসূত এই নয়া মেট্রোর নকশা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবান ডিজাইনে স্নাতকোত্তর শেষ করে বহু ঐতিহাসিক কাজের সাক্ষী থেকেছেন সুবীরবাবু। সাম্প্রতিক মেট্রো সিনেমার পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসে তিনি অন্যতম ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর নকশার চিন্তা মনে করাচ্ছে, পুরোনো যা কিছু, সব ভেঙে তাকে একেবারে নতুন করে তৈরি করতে হবে এমন নয়। প্রয়োজনে পুরোনোকে ‘নতুনভাবে পুরোনো’-ও সাজানো যায়।
আইনক্স লিজারের চিফ এক্সিকিউটিভ অলোক ট্যান্ডন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “এ আমাদের কাছে অত্যন্ত গর্ব এবং সম্মানের বিষয়, যে ঐতিহ্যবাহী সিনেমাহলটি এখন মেট্রো আইনক্স হিসাবে পুনরায় খোলা হয়েছে। এছাড়া এই পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পেরে আমরা সম্মানিত। একইসঙ্গে কলকাতা শহরে মেট্রোকে ঘিয়ে যে গৌরবময় স্মৃতি রয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতেও আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
আশির দশকের বিখ্যাত বাংলা ব্যান্ড ‘নগর ফিলোমেল’-এর একটি গান মনে পড়ে যাচ্ছে। গানের শুরুতে ছিল, “ভেসে আসে কলকাতা কুয়াশা-তুলিতে আঁকা/ শহরতলির ভোর মনে পড়ে/ কাঠচাঁপা আর কৃষ্ণচূড়ার শৈশব শুধু খেলা করে”। এই গান ছিল ফেলে আসা জীবনের। স্মৃতি উস্কে কলকাতার মেট্রোও কি আবার শৈশবকে ফিরিয়ে দেবে না? নিশ্চয় দেবে, কলকাতা আশাবাদী।