তাঁর অভিনীত চরিত্রেরা যেমন সোহাগ দেখাতেন, তেমন শাসনও করতেন
বাঙালির অদ্বিতীয় ম্যাটিনি আইডল সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে দেখে একসময় রূপোলী পর্দায় মহানায়ক গেয়ে উঠেছিলেন “এবার ম’লে সুতো হব, তাঁতির ঘরে জন্ম লব”… মান্না দে’র গাওয়া সেই অনবদ্য গানের আবেদনে এবং উত্তম-সাবিত্রী-র দুর্দান্ত কেমেস্ট্রি বাংলার দর্শক কি আজও ভুলতে পেরেছে? বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্র-থিয়েটার ও টেলিভিশনের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। তাঁর কর্মজীবন ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। প্রায় ৮০টি চলচ্চিত্র, প্রায় ২০টি টেলিভিশন ধারাবাহিক এবং অসংখ্য থিয়েটার প্রযোজনায় সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছেন সাবিত্রী।
বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার একটি ছোট্ট শহর কমলাপুরে জন্মগ্রহণ করেন সাবিত্রী। তাঁর বাবা শশধর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্টেশনমাস্টার। সাতমহলা বাড়ি ছেড়ে দেশভাগের সময়কালে কলকাতায় চলে আসেন সাবিত্রী। শুরু হয় নতুন লড়াই।

উত্তমকুমার-সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রে আজও অমর হয়ে আছে। শেষ অঙ্ক, মৌচাক, মরুতীর্থ হিংলাজ, ধন্যি মেয়ে, গলি থেকে রাজপথ, পথে হল দেরি, সবার উপরে, দুই ভাই, নিশিপদ্ম-র মতো ছবিতে তাঁদের রসায়ন মুগ্ধ করেছে প্রতিটি প্রজন্মের দর্শককে। সিনেমার সেই রসায়ন গভীর এক বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল। সে বন্ধুত্বের স্মৃতি আজও উজ্জ্বল সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের অভিব্যক্তিতে।

সিনেমার পাশাপাশি একসময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মঞ্চ-নাটকেও। মঞ্চে তাঁকে দেখার জন্য উপচে পড়ত ভিড়। আজও সাবিত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তিনি থিয়েটারের মেয়ে।
বাংলা চলচ্চিত্রের আরেক সার্থক জুটি সৌমিত্র-সাবিত্রী। জীবনের উপান্তে এসেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কাজ করে গিয়েছেন সাবিত্রীর সঙ্গে। এমনকি সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে তিনি সর্বকালের সেরা অভিনেত্রী হিসেবে আখ্যাও দেন। উত্তমকুমার-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি সাবিত্রী অভিনয় করেছেন বাংলার অন্যান্য বর্ষীয়ান অভিনেতাদের সঙ্গেও। এই তালিকায় রয়েছেন- ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস, তুলসী চক্রবর্তী, জহর রায়, পাহাড়ি সান্যাল, অনুপ কুমার প্রমুখরা। সিনেমার পাশাপাশি একসময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মঞ্চ-নাটকেও। মঞ্চে তাঁকে দেখার জন্য উপচে পড়ত ভিড়। আজও সাবিত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তিনি থিয়েটারের মেয়ে।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় দুইবার বিএফজেএ পুরস্কারের প্রাপক। ১৯৯৯ সালে পান সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার। ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে রাজ্যের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার বঙ্গবিভূষণে ভূষিত করে। ২০১৪ সালে পান ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী।

ছোটোবেলার ফেলে আসা সেই বাংলাদেশ, পথ-ঘাট-মাঠ-দিঘি, পদ্মার মাঝি, পাশের বাড়ির প্রিয় বান্ধবী, আত্মীয়-পরিজন : হাত বাড়ালেই যেন সেই হারিয়ে যাওয়া জীবন। শিকড়ে ফিরতে চান সাবিত্রী। এমনটাই হুবহু ধরা ছিল সাবিত্রীর আত্মজীবনী সত্যি সাবিত্রী-তে।
তাঁর অভিনীত চরিত্রেরা যেমন সোহাগ দেখাতেন, তেমন শাসনও করতেন। কারণ সাবিত্রী নায়িকা নন, অভিনেত্রী। বড়োবৌদি আর দাদাকে লুকিয়ে ভাইয়ের জন্য সিগারেট ম্যানেজ করে দেন, এই দৃশ্য কি বাংলা সিনেমার দর্শক আগে কখনও দেখেছে! গলি থেকে রাজপথ, একাই হেঁটে বেরিয়েছেন। দাপটের সঙ্গে।