ছড়ার মাধ্যমে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বার্তা, বনাধিকারিক এখন উত্তরবঙ্গের গর্ব

তাঁর লেখা থেকেই তৈরি হচ্ছে আদিবাসী গানের সুর

কখনও তিনি কতগুলো শব্দ সাজিয়ে লিখে রাখছেন। সে সব শব্দ থেকে হয়ে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের মাটির গান ভাওয়াইয়া। কখনও সাজানো সে সব শব্দ থেকে কোনও আদিবাসী গানের সুর তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আবার তাঁর লেখায় সুন্দর করে সাজানো সব শব্দ হয়ে উঠছে একেকটি ছড়া। তবে সবই বন ও বন্য প্রাণী রক্ষার আবেদনকে ভিত্তি করে।

হ্যাঁ, এভাবেই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মধ্যে সংস্কৃতিকে প্রবেশ করিয়ে বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে অন্য মাত্রা তৈরি করেছেন এক বনাধিকারিক। বর্তমানে তিনি জলপাইগুড়ি বন দপ্তরের একজন এডিএফও। নাম বিমল দেবনাথ। ডুয়ার্সের গরুমারা, লাটাগুড়ি থেকে জলদাপাড়ার জঙ্গল যেখানেই তিনি বন বিভাগের আধিকারিক হিসাবে কাজ করেছেন বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। তারমধ্যে অবশ্যই একটি হল স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করে তোলা।

তাঁর পদ্ধতি স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করে তোলা

বিমলবাবু পরিস্কারই বলেন, পরিবেশ সুস্থ রাখতে আমাদের গ্রিন ফিল্টার হল অরণ্য বা বৃক্ষ। এই অরণ্য রক্ষা করার সঙ্গে আমাদের প্রাণীকূলকেও রক্ষা করতে হবে। আর তাই বন সংরক্ষণ চেতনার মধ্যে ভাওয়াইয়া বা আদিবাসী  সংস্কৃতির প্রবেশ করানো। এই সংস্কৃতি প্রবেশের ফলে গ্রাম বনবস্তিতে আরও বেশি করে বনের প্রতি ভালাবাসা জন্মেছে। গরুমারার ধূপঝোড়া এলাকার বাসিন্দা তথা ভাওয়াইয়া শিল্পী জানকী রায় বিমলবাবুর লেখা বিভিন্ন শব্দে সুর বসিয়ে একের পর এক ভাওয়াইয়া গান গেয়ে চলেছেন।

বিমলবাবু আরও বলছেন, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, তার সঙ্গে চেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। মানুষকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আর সেইসবই হচ্ছে গান, ছড়ার মাধ্যমেও। 

পরিবেশ সুস্থ রাখতে আমাদের গ্রিন ফিল্টার হল অরণ্য বা বৃক্ষ

সবুজ খুব ভালোবাসেন বিমলবাবু। শুধু চাকরি করেন বলে নয়, গাছকে যে তিনি ভালাবাসেন তার বহু উদাহরণ রয়েছে। জঙ্গলে চোরা শিকারী থেকে কাঠ চোরের প্রবেশ ঠেকানোর কাজে তিনি তাঁর অনেক দক্ষতা দেখিয়েছেন। এই জঙ্গল থেকে সেই জঙ্গলে তিনি নির্ভীক ভাবে ঘুরে বেড়ান। আবার বিশ্ব বন্ধু দিবসে প্রায় সারাটা সময় গাছের মধ্যে মাথা রেখে গাছকে জোরে আলিঙ্গন করতে পারেন। জঙ্গল রক্ষার ভাবনায় তিনি জলকাদা মারিয়ে কখনও এই জঙ্গল থেকে সেই জঙ্গল আবার কখনও উত্তাল তোর্সা নদী পার হন সাধারণ নৌকায়। আবার তাঁকে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান সুরক্ষিত রাখতে হাতির পিঠে চেপে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। হস্তি বিশারদ পার্বতী বরুয়াকে এনে উত্তরবঙ্গের জঙ্গল মহলে মাহুতদের প্রশিক্ষণ আয়োজনেও তাঁকে ভিন্ন ধর্মী প্রয়াস নিতে দেখা গিয়েছে। ফলে তাঁর শিকড় বনবস্তির মানুষের মনেও গেঁথে গিয়েছে।   

শিলিগুড়ি প্রধাননগরে বাড়ি এই অন্যরকম বন  আধিকারিকের। বন ও বন্যপ্রাণী নিয়ে ওইসব কাজ করার পাশাপাশি তিনি আগামীতে জল নিয়ে কাজ করতে চান বেশি করে। তিনি বলেন, জল নিয়ে কাজ শুরু করেছি। মাটিকে কীভাবে আরও বেশি জল পান করানো যায় তা নিয়ে আগামী দিনে আরও কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে। 

তাঁর শিকড় গেঁথে গিয়েছে বন-বস্তির মানুষের মনেও 

বিমলবাবু বহু ছড়া, কবিতা লিখছেন পরিবেশ নিয়ে। সেসবের অনেকগুলো স্থানীয় লোক সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিচ্ছে।

আগামীতে জল নিয়েও কাজ করতে চান বিমলবাবু

বৃক্ষপ্রেম নিয়ে লিখেছেন, “বন্ধুর বুকে মাথা দিয়েছিলাম কিছুক্ষণ/ বন্ধু আমায় বুকে জড়িয়ে করলো আলিঙ্গন /কত কথা বললো আমায় শুনলাম দিয়ে মন/ কে কী বুঝলো জানি না সব বুঝল সবুজ বন”। আবার পর পর লিখে চলেছেন, “বর্ণময় পৃথিবী বিবর্ণ করোনা/ সব ছাড়বে সাইকেল ছাড়বো না/বর্ণময় পৃথিবী বিবর্ণ করোনা /আবার ফিরবে ছন্দময় জীবন/ মেলে রঙিন পাখনা/ বর্ণময় পৃথিবী বিবর্ণ করোনা/ প্রকৃতি-মাকে অত্যাচার করোনা/ বর্ণময় পৃথিবী বিবর্ণ করোনা/ নিয়ম মেনে চলা ভয় করোনা /”। আবার তিনি লিখছেন,—
 
“আমার গাছ

বিমল দেবনাথ 

আমার গাছ-

ফল জল বায়ু মাটি

আমার গাছ

বাসা ভোরে জাগা পাখির  

আমার গাছ 

ভূত সবুজ বর্তমান ভবিষ্যৎ

আমার গাছ

জন্ম মৃত্যু প্রেম ভালোবাসা 

আমার গাছ

প্রাণ দায়ী অজাত শত্রু

তবুও –  

আমার গাছ

মরে যায় কুড়ুলে ঝড়ে

আর-  

ভালোবাসা জন্ম মৃত্যু কাঁদে।

আমার গাছ  

আবার জন্ম নিবে বড় হবে

বুক পেতে দাও মাটি করে।"

এভাবে তাঁর বহু লেখা কবিতা, ছড়া কিংবা গান এখন উত্তরবঙ্গের বনজঙ্গলে ফেরে যা এক অন্যরকম সৃজন ও পরিবেশ ভাবনা।    

Developed by DXDasia