
একসময়ের ‘নিষিদ্ধ’ উপন্যাস ‘বিবর’, আবার থিয়েটারের মঞ্চে
সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি। বাংলার পাঠকমহলে আলোড়ন পড়ে গেল একটা উপন্যাস নিয়ে। ‘বিবর’। লেখক – সমরেশ বসু। একদল ছিছিক্কার উগরে দিলেন উপন্যাসের বিষয়বস্তু নিয়ে। অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হল সেটি। অপর দল, আড়াল না-রেখে প্রকৃত মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তোলার সাহস দেখানোর জন্য কুর্নিশ জানালেন লেখককে।

কিন্তু কেন সমরেশ বসু বিবর-এর মতো একটি উপন্যাস লিখলেন? পরবর্তীকালে, এ-নিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন – ‘নিজের এবং অনেকের লেখা পড়েই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ছিলাম এবং আমার ধারণা, বাঙালি পাঠক সমাজেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল।’ গতানুগতিক সাহিত্যের চলন থেকে বেরিয়ে, তাঁর এই প্রয়াস চিরকালই ‘বাংলা সাহিত্যে অশ্লীলতা’ সংক্রান্ত বিষয়ে অন্যতম প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে।

সমরেশ বসুর কথা থেকে আভাস পাওয়া যায় – সাহিত্য-বিষয়ক সামাজিক ট্যাবু ভেঙে বেরোতে চাইছিলেন তিনি। তারই ফলশ্রুতি ১৯৬৫ সালে লেখা ‘বিবর’। কিন্তু সমরেশ বসুরও আগে, এই বাংলাতেই হাংরি আন্দোলনকারীরা যে অবচেতন ও যৌনতাকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন পথ আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন, সমরেশ বসুও কি সেই হাংরি আন্দোলনের দ্বারাই পরোক্ষ-প্রভাবিত? বিভিন্ন সময়ে সমালোচকরা বলেছেন, হাংরি আন্দোলনের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা না ঘটলে, সমরেশ বসু ‘বিবর’ বা ‘প্রজাপতি’ লিখতে পারতেন না।
আরও পড়ুন
কলকাতার মঞ্চে ‘ডাইনি’ ম্যাকবেথ
যাইহোক, মূল উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর কেটে গেছে তেষট্টি বছর। এর মধ্যে অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়েছে, সেই নিষেধাজ্ঞা উঠেও গেছে একসময়। সিনেমা হয়েছে, একবার নাটকও হয়েছে ‘বিবর’-কে ভিত্তি করে। এবার, দমদম ব্রাত্যজন-এর প্রযোজনায়, মঞ্চস্থ হল ‘বিবর’। নির্দেশনায় দেবাশিস দত্ত। নাট্যরূপ দিয়েছেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়, মুখ্য উপদেষ্টা ব্রাত্য বসু।

নির্দেশক জানাচ্ছেন – ১৯৬৫ নয়, বর্তমান প্রেক্ষিতে নিয়ে আসা হয়েছে উপন্যাসটি। কিন্তু এই উপন্যাসটিই কেন? আর, এতদিন পরে মঞ্চে উপন্যাসটি ফিরিয়ে আনার কারণই বা কী? নির্দেশকের কথায়, বিবরের প্রাসঙ্গিকতা এখনও হারায়নি। সামাজিক ট্যাবুগুলি এখনও অনেকটাই অটুট। তার ওপর, বিবর এক যুবকের আত্ম-উন্মোচনের কথা বলে। রমণের পর এক নারীকে খুন ও পরবর্তী পিছ-কল্পনা নিয়ে এগিয়ে যায় উপন্যাসটি। নাটকেও সেই ধারাই বজায় রাখা হয়েছে। এবং সাম্প্রতিক সামাজিক দুর্নীতিগুলিও ঠাঁই পেয়েছে নাটকে। অবশ্য, তাতে মূল বক্তব্যের অঙ্গহানি হবে না – এমনটাই দাবি তাঁর।

দমদম ব্রাত্যজনের প্রথম প্রযোজনা এটি। আর প্রথম প্রযোজনাতেই তাঁরা এমন সাহসিকতার পরিচয় দিতে চান। তা নাটকের বিষয়বস্তুই হোক বা আঙ্গিকগত অভিনয়। একসময় হইহই ফেলে দেওয়া উপন্যাস এতদিন পর বাংলা থিয়েটারের মঞ্চে ফিরলে আখেরে তা থিয়েটারেরই জয়। “বাংলা থিয়েটারে কিচ্ছু হচ্ছে না” বলে একদল দর্শক অভিমান উগড়ে দেন। আশাকরি তাঁদের চোখে পড়বে ‘বিবর’-এর মতো প্রযোজনা। ২২ জুলাই এই নাটকের প্রথম অভিনয় হয়েছে দমদমের অজিতেশ মঞ্চে। প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় রবিবার ওই একই মঞ্চে দেখা যাবে এই নাটক।

