পুজোর ‘ভোগ’-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস
পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখে আজও দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হল- ভোগ। ভোগ রান্নার স্বাদ গন্ধ সবই ইউনিক। এখন তো আবার বিভিন্ন বিখ্যাত বনেদি বাড়ি, রাজবাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগ হোমডেলিভারিও করা হয়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার পুজো পরিক্রমার প্যাকেজে শোভাবাজার রাজবাড়ি সহ অন্যান্য বনেদি বাড়িতে বসে ভোগ খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকে। কিন্তু, ‘ভোগ’ আসলে কী?
ভোগ শব্দের অর্থ হল, ‘আনন্দ বা তৃপ্তি’। বাঙালির পাঁচদিনের পুজো উপাচারের সঙ্গে সমান তালে এই পুজোগুলিতে যে ভোগ বৈচিত্র্য লক্ষিত হয়, তার মূল ভিত হল সমকালীন সবজি ও ফসল। ঐতিহাসিক ব্যাখায় শরৎ ও বসন্ত দুই ঋতুতে দেবী শাকম্ভরী ও মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো ছিল বিধিবদ্ধ। ফলতঃ একে অনেকেই বাঙালির নবান্ন বা নতুন ফসলের উৎসব মনে করেন। এই কারণেই ভোগ দুর্গাপুজোয় এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। রন্ধনশৈলীর বৈচিত্র্য দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
বহু প্রাচীন কাল থেকেই বাঙালির দুর্গাপুজোর বৈশিষ্ট্য হয়ে থেকেছে ভোগের বৈচিত্র্য। পুরাতন বনেদি বাড়ির ভোগ ইতিহাস বিচারে ভোগের বেশ কয়েকটি ভাগ লক্ষ্য করা যায়। নিরামিষ শস্যপ্রধান ভোগ, আমিষ ভোগ, শীতল, মিষ্টান্ন ও পান্তাপ্রসাদ। ভোগের ধারণা যেমন মনস্তাত্ত্বিক ভাবে ব্যাখা করা যায়, তেমনই ভোগের প্রকার ভেদেও এই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ছবি পরিলক্ষিত হয়। সমাজের ও সংস্কৃতির বিবর্তনে দুর্গাপুজো উমা মায়ের বাপের বাড়ি ফেরা। উমা যেন সব বাঙালির ঘরের মেয়ে। তার বৎসরান্তে একবার ফেরা পিতৃগহ তথা বাংলায় আনন্দের আবেশ এনে দেয়। দুর্গাপুজোর ভোগেও পড়ে তার ছায়া। নানারকম নিরামিষ পদ, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নদী-পুকুরে পাওয়া যায় এমন মাছ সহ নানারকম আমিষ ভোগ, দেবীর গুরুপাক খাবার খাওয়ার পর শীতলের ব্যবস্থা যেমন, ক্ষীর ডাব পান বা আমলকি, তারই সঙ্গে দশমীর দিন পান্তা প্রসাদ। এখানে কয়েকটি জনপ্রিয় ও সাবেকি পুজোর ভোগের উল্লেখ করা যাক-
হাওড়া শিবপুরের রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু হয় ১৬৮৫ সালে। পুজো শুরু করেন রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরী। রায়চৌধুরীদের দুর্গাপুজোয় নবমীর দিন হোম সম্পন্ন হলে, হাঁড়িকাঠ উঠিয়ে বাড়িতে পংক্তিভোজনের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়াও নানা রকম মিষ্টান্ন তো থাকেই। মা দুর্গার সামনে রাখা বিভিন্ন খাদ্যের মধ্যে নিরামিষ আমিষ নির্বিশেষে অন্যতম হচ্ছে কলার বড়ার পায়েস বা কদলী পায়েসান্ন। চালের পয়েসে ডোবানো কলা আর নারকেলের এই অভূতপূর্ব মিষ্টান্নটি স্বাভাবিক কারণেই বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন ভোগ হিসেবে দেবীর সামনে দেওয়া হয় পুজোর সময়ে।

ভবানীপুর গিরিশ ভবনের সাদা ধবধবে, বিস্তৃত ঠাকুরদালানটা এখনও নানান গল্প বলে৷ এ বাড়ির ইতিহাস বহু পুরোনো। প্রাচীন বনেদিয়ানায় ভরপুর এই বাড়ির দুর্গাপুজো ১৯২ বছরের পুরোনো। বাড়ির বর্তমান ঠিকানা ৩৯ গিরিশ মুখার্জি রোড। এ বাড়ির পুজোর সংকল্প হয় বাড়ির পুত্রবধূদের নামে৷ যাঁর নামে সংকল্প হয় তিনি পঞ্চমীর দিন শুধু ঠাকুরের অন্নভোগ আর রাতে ফলমূল আহার করেন৷ আর ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত তিনি শুধুমাত্র রাতে আরতির পর প্রসাদ খান৷ এ বাড়ির কুলদেবতা অষ্টধাতুর জগদ্ধাত্রী মাতা৷ এ বাড়ির মেয়ে-বৌরা জগদ্ধাত্রী মন্ত্রে দীক্ষিত হন৷ দীক্ষিত হলে তবেই তিনি বাড়ির ভোগ রাঁধতে পারেন৷ গিরিশ ভবনের পুজোর মহাভোগ হিসেবে যে পদটির খ্যাতি রয়েছে, তা হল- ছানার কালিয়া।

১৮৬০-এ রামচন্দ্র চ্যাটার্জি শুরু করেন চোরবাগান চ্যাটার্জি বাড়ির পুজো। সপ্তমী থেকে নবমী তিন দিন বিভিন্ন রকম ভোগের আয়োজন করা হয় এখানে। সপ্তমীতে প্রথম পুজোয় খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, মাছ, অম্বল, পায়েস সহযোগে ভোগ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পুজোয় দেওয়া হয় অন্নভোগ। সঙ্গে পাঁচ ভাজা, পটল বা ফুলকপির কালিয়া, বাঁধাকপি, পোনা মাছের কালিয়া, নিরামিষ চিংড়ি-মালাইকারি, আমের চাটনি, বাড়িতে তৈরি বোঁদে ও ল্যাংচা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই আমিষ ভোগ অনেকে উপজাতি প্রধান বঙ্গদেশের উপজাতি প্রভাবের ফল বলেও মনে করেন। উপজাতিদের মধ্যে যে দেবী চণ্ডীর উল্লেখ আছে তারই প্রভাবে অষ্টমী নবমী তিথির সন্ধিক্ষণের পুজোয় কিছু পরিবারে পরিবারে দুর্গাপুজোয় মাছপোড়া দেবার রীতি আছে। ফলত এই আমিষ ভোগের প্রচলনের সম্পূর্ণ ব্যাখা করা কঠিন। যাই হোক, বিবিধতা সত্ত্বেও বাঙালি ভোগে অভিনবত্ব রেখে নানান নতুন উদ্ভাবনী দক্ষতার প্রমাণ রেখেছে। বাঙালির সব থেকে আকর্ষণীয় মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখা করা যায় দশমীর এই পান্তা প্রসাদে।

পান্তাভাত ইলিশমাছ ভাজা কচুর লতি আর বাসি তেঁতুল/আমসির চাটনি, কখনও বা মাছের মাথার অম্বল। দশমীর এই ভোগ বিশেষ অর্থ বহন করে। প্রথমত, সামাজিকভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে স্বামী বা শ্বশুরালয় আদরণীয় বা সম্মানীয়। তাই বাপের বাড়ি থেকে ফিরে মেয়ে বাপের বাড়ির গুণগান করবে না আবার মিথ্যাও বলবে না। তাই ফেরার দিনে মাকে এই খাবার খাওয়ানো। যা খেয়ে মা ফিরে বলবেন এই তো পান্তা আর কচুর শাক খেয়ে এলাম। এতে হরবোলা স্বামীর মানও থাকবে আর মায়ের বিনম্রতাও বজায় থাকবে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, যাত্রাপথে যাতে কোনও অসুবিধা না হয় তাই মাকে (ঘরের মেয়েকে) হালকা খাবার খাইয়ে পাঠানো হয়, মেয়ে চলে যাবার দুঃখে বাবা-মা আর রান্না করেন না, অরন্ধন পালন করেন, টিমটিম করে জ্বলতে থাকে একটি প্রদীপ, আশার সূক্ষ্ম কিরণ হয়ে – আসছে বছর আবার হবে, অর্থাৎ সব বাধা-বিঘ্ন পেরিয়ে মাতৃরূপী কখনও বা কন্যারূপী রাজসিক দেবী আবার তাঁর বৈভব নিয়ে বঙ্গমৃত্তিকায় আনন্দ ফসলে ভরে দেবেন, এই আশায় বাঙালি পথ চেয়ে থাকে।