শতবর্ষে ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ : নিম্নবর্গের কথা যাঁকে সবথেকে বেশি ভাবিয়েছিল

রণজিৎ গুহ-কে সারা পৃথিবী একডাকে ইতিহাসবিদ বলে চেনে

‘দেশ’ পত্রিকায় ‘ক্লান্তিহীন মেধাচর্চা: আত্মানুসন্ধানের দর্পণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে রণজিৎ গুহ (Ranajit Guha) সম্পর্কে অধ্যাপক-সাহিত্যিক চিন্ময় গুহ (Chinmoy Guha) লিখছেন, “আমার ধারণা, তপন রায়চৌধুরী যেমন প্রথম থেকেই ইতিহাসকে সাহিত্য হিসেবে পড়তে চেয়েছিলেন, তেমনি রণজিৎ গুহ সাহিত্যকে ইতিহাস, রাজনীতি এবং শেষপর্যন্ত প্রজ্ঞাময় দর্শন হিসেবে। ক্ষমতার সম্পর্ক সেখানে অসীম গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাজনীতি থেকে নীতি, এবং নীতি থেকে রাজনীতিতে অনায়াসে যাতায়াত করেন। হাইডেগারের অস্তিত্ববাদ তাঁকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে কি না জানি না, কিন্তু আমরা লক্ষ করব মানবচৈতন্য ক্রমশ তাঁর রচনার মূল দীপক হয়ে উঠছে।”

চিন্ময়বাবু যে মানবচৈতন্যের কথা এখানে বলেছেন, তার স্থান মানবাধিকারের উপরে। তুমি ‘কি’ এবং ‘কেন’ না জেনে তোমার প্রাপ্য অধিকারের কথা বলবে কী করে? এই ‘কি’ এবং ‘কেন’-র মধ্যেই অন্তর্নিহিত থাকে মানবচৈতন্য বা ইংরেজিতে তাকে আমরা বলতে পারি ‘Human Consciousness’. আজীবন নিপীড়িতের ইতিহাস, সাহিত্যের উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ, অথবা রাজনীতি, নৃতত্ত্ব, শিল্পের ইতিহাস বা সংস্কৃতিপাঠ—সবেতেই এই ‘মানবচেতনা’র কথা বলে গিয়েছেন রণজিৎ গুহ। ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে থাকা শ্রমিক, কৃষক, নিম্নমধ্যবিত্ত, গ্রাম ও শহরের গরিব জনতা, আদিবাসী, নিম্নবর্ণ, স্ত্রীলোক—আজীবন এঁদের কথাই বলেছেন, তাঁর ‘নিম্নবর্গের পাঠ’ তারই প্রামাণ্য নথি। সারা বিশ্বজুড়ে তাঁর পরিচিতি বলতে গেলে এই ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’।

সারা পৃথিবী একডাকে তাঁকে ইতিহাসবিদ বলে চিনলেও, তিনি শুধু ইতিহাসবিদ নন বিশ্ববরেণ্য এক তাত্ত্বিক। তাঁর ইতিহাসের লেখাপত্র আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের নানা শাখার পড়ুয়াদের অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে বহু দিন থেকেই। রণজিৎ গুহ-র নেতৃত্বে, মার্ক্সীয় চিন্তার দ্বারা গভীর ভাবে প্রভাবিত, কিন্তু এক ভিন্ন তাত্ত্বিকতায় উন্নীত এই ইতিহাস-ধারা আমাদের এতদিনকার ইতিহাসের চাপা পড়ে যাওয়া আওয়াজকে তুলে আনতে চেষ্টা করে। এই কারণে, তাঁর প্রথম বই প্রকাশ ১৯৬৩ সালে ঘটলেও ১৯৮২ সালে সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ-এর প্রথম খণ্ড প্রকাশই রণজিৎ গুহ-র খ্যাতির প্রধান ভিত্তি। পরবর্তী জীবনে বাংলায় তিনি বেশ কিছু মৌলিক ইতিহাস রচনা করেছেন, যেগুলির ইংরেজি অনুবাদ এখনও পর্যন্ত হয়নি। তাঁর সমগ্র জীবনব্যাপী ইতিহাসের সমস্ত রচনা ও সাহিত্য-বিষয়ক সমস্ত লেখা সর্বপ্রথম দুটি খণ্ডে সংকলিত করেছে আনন্দ পাবলিশার্স।

ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের বাইরে সাহিত্য নিয়েও অনেক লিখেছেন তিনি, লেখক-জীবনের গোড়া থেকেই। প্রথম দিকের সেই সব লেখার পর আবার পুরোদস্তুর সাহিত্যচর্চায় তিনি মন দেন ২০০৯ সাল থেকে, যখন মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রকাশিত হয় তাঁর দুটি সাহিত্য-আলোচনার বই। ইতিহাস ও তত্ত্বের মধ্যে তাঁর চিন্তা-উদ্ভাবনের যে অনায়াস প্রয়োগ আমরা দেখেছি, সাহিত্যপাঠে ঠিক তেমনই মনীষার পরিচয় পাওয়া যায়। গতানুগতিক সাহিত্য-জগতের বাইরে তাঁর বিচরণ, কিন্তু বাংলার সাহিত্য-জগতের নানা পরিচিত লেখক ও লেখাকে তিনি তাঁর আলোচনায় নিয়ে এলেন। ব্যক্তি, গোষ্ঠী, প্রকৃতির সঙ্গে আত্ম-র সম্পর্ক কী ভাবে আবর্তিত হয়, রণজিৎ গুহ-র সাহিত্য-আলোচনার প্রধান সন্ধান হয়ে উঠল সেটাই। ‘বুদ্ধদেব ও সুধীন্দ্রনাথের পর বাংলা সাহিত্য-আলোচনায় দেশ-বিদেশ অতীত-নিকট দাপিয়ে এমন স্বচ্ছন্দ বিচরণ ঘটেনি’ – বলেছেন অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী।

২০২২-এর ২৩ মে ৯৯-এ পা রেখেছিলেন। শতবর্ষ পূর্ণ হওয়ার দোরগোড়ায় এসে, ২৮ এপ্রিল, শুক্রবার সন্ধ্যায় চলে গেলেন ইতিহাসবিদ-তাত্ত্বিক রণজিৎ গুহ। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা উডসের বাসভবনে স্ত্রী মেখঠিল্ড এবং পরিচর্যাকারীরা শেষ সময়ে তাঁর পাশে ছিলেন। ১৯৫৯-এ এ দেশ ছাড়ার পরে ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স, অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে তিনি অধ্যাপনা করেন। 

২০২৩-এর মার্চ মাসের ছবি। রণজিৎ গুহ'র সঙ্গে স্ত্রী মেখঠিল্ড গুহ এবং অস্ট্রিয়ার পারকার্সডর্ফ-এর মেয়র স্টেইনবিচলার। ছবি: স্ট্যাডগেমেইন্ডে পারকার্সডর্ফ

অমর্ত্য সেন অনেক আগেই তাঁকে বলেছেন, ‘বিশ শতকের সবচেয়ে সৃজনশীল ভারতীয় ঐতিহাসিক’। রণজিৎ দুই দশক ধরে অস্ট্রিয়ায় অবসর জীবনযাপন করছেন, তার আগে কয়েক দশক ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি আমাদের স্মৃতির বাইরে রয়ে গেছেন বা চর্চার মধ্যে নেই। বরং তাঁর একাডেমিক কাজগুলো সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পঠিত হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে নতুন চিন্তা ও তত্ত্বের অভিমুখ খুলে দিচ্ছে।

কলকাতায় সিপিআই-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন রণজিৎ। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র থাকাকালে ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বরে প্যারিসে বিশ্ব ছাত্র সম্মেলনে যোগ দেন। এরপর সাইবেরিয়া, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীন বিপ্লব স্বচক্ষে জরিপ করেন দলের প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত অনুপ্রেবেশের বিরোধিতায় তিনি দল ছাড়েন। তত দিনে অবশ্য তার লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে। দলীয় মুখপত্রে ‘মেদিনীপুরের লবণশিল্প’ নামে একটি লেখা লেখেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পেছনের তাত্ত্বিক ভাবনা নিয়ে লেখেন অসম্পূর্ণ ধারাবাহিক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কাল পড়ান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে গবেষণার ইচ্ছা থাকলেও নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ তাকে ছাত্র হিসেবে নেননি। পরে পাড়ি দেন ইংল্যান্ডের সাসেক্সে। সেখানকার গবেষণা ‘আ রুল অফ প্রপার্টি’ নামে পরে প্রকাশিত হয়। ১৯৮০ সালে সাবঅলটার্ন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হলেন রণজিৎ গুহ, পরের বছর থেকে তা অক্সফোর্ড প্রকাশও করতে থাকল। তাঁর মতে, ভারতীয় ইতিহাস-লিখন এক বদ্ধতায় পর্যবসিত হয়েছে। কেন না তা উচ্চবর্গকে স্বতঃসিদ্ধ আলোচনা-বিষয় হিসেবে ধরে নেয়। বিকল্প হিসেবে রণজিৎ বলেন, নিম্নবর্গের দিকে ইতিহাসকারকে চোখ ফেরাতে হবে। তার ব্যক্তিক চৈতন্য, বিদ্রোহী মানস ও আদিসত্তার প্রকরণগুলো আলোকপর্বের গোঁড়ামো কাটিয়ে ইতিহাসবিদকে পড়তে হবে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, দীপেশ চক্রবর্তী, শাহিদ আমিন, ডেভিড আর্নল্ড ও ডেভিড হার্ডিম্যান ছিলেন রণজিৎ গুহ’র প্রস্তাবিত সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীতে। আশির দশকে গ্রামশি, ফুকো, রলা বার্ত ও ক্লদ লেভি স্ত্রসের গঠনবাদের ভিত্তিতে নিজের কিছু টিপ্পনী যোগ করে, অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের একটি কাঠামো তৈরি করলেন রণজিৎ গুহ। শুধু ভারত নয়, জাপান বা ল্যাটিন আমেরিকাতেও এই সাবঅলটার্ন শাখা ছড়িয়ে পড়ে। পরে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বিতর্কে যোগ দেন, সাবঅলটার্ন কর্তৃত্ব ও এলিট আধিপত্যের নয়া সমালোচনা করেন তিনি। নব্বই দশকের আগেই রণজিৎ গুহ নৃতত্ত্ব পড়াতে ক্যানবেরায় যান। সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীর কুশীলব চরিত্র থেকে অবসর নেন। ধীরে ধীরে ভাষাদর্শন নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েন। বিষয়মাধ্যম হিসেবে উঠে এল বাংলা ভাষা, ভাবনায় এলেন রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ বা সমর সেন। প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব, হাইডেগারের প্রপঞ্চদর্শন ও হেগেলের ভাববাদ ততদিনে তার প্রিয় বিষয়। নতুন শতকে একে তিনি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অবসরে কাটাতে চলে যান। তাঁর লেখা ‘আ রুল অফ প্রপার্টি’, ‘ইলিমেন্টারি অ্যাসপেক্টস অব পেসেন্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’, ‘হিস্ট্রি অ্যাট দ্য লিমিট অফ ওয়ার্ল্ড-হিস্ট্রি’, ‘আন ইন্ডিয়ান হিস্টিরিওগ্রাফি অব ইন্ডিয়া: আ নাইন্টিথ সেঞ্চুরি’, ‘ডমিন্যান্স উইথআউট হেজেমোনি: হিস্ট্রি অ্যান্ড পাওয়ার ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’, ‘দ্য স্মল ভয়েস অব হিস্ট্রি’,  ‘রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা’, ‘প্রেম না প্রতারণা’, ‘কবির নাম ও সর্বনাম’ এবং ‘ছয় ঋতুর গান’ থেকে যাবে এই পৃথিবীর ইতিহাসের অংশ হয়ে।

কিন্তু, যাঁদের জন্য রণজিৎ গুহ আজীবন কথা বলেছেন, সেই নিচুতলার মানুষদের কাছে কি তাঁর আওয়াজ পৌঁছেছে? কী করে পৌঁছবে? তার পথ তো ভণ্ড দেশনায়ক, মিথ্যা শিক্ষার কারিগরেরা চোখে ঠুলি পরিয়ে, মেরুদণ্ড ভেঙে বন্ধ করে রেখেছেন। যে অপ্রচলিত পথের সন্ধানী, সে ছাড়া আর কেউ তাঁর খোঁজ করবে না এখন, হতাশাজনক হলেও এটাই বাস্তব। চিন্ময় গুহ বলেন, “রণজিৎ গুহ কোনওদিনই প্রচলিত পথের সন্ধান দেন না, তাঁর লেখা নতুন করে ভাবতে শেখায়, সর্বজনগ্রাহ্য বিচারপদ্ধতির বাইরে গিয়ে, প্রচলিত চিন্তার পটচিত্র ভেঙে, আদিকল্পের জট ছাড়িয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে চায়। গভীর ঘনত্বে ভরা এইসব সমাজৈতিহাসিক, আস্তিত্বিক জিজ্ঞাসার মীমাংসা সহজ নয়। আপাত কাঠিন্যের বাধা অতিক্রম করে মূল প্রতিপাদ্যকে বোঝার জন্য রচনাগুলি বারবার পাঠ করতে হয়। এ বিচিত্র পাঠসমূহ অদীক্ষিত পাঠককে চমকে দেয়, এবং অনেকসময়ই তাকে হোঁচট খেতে খেতে পু্রোনো চিন্তাকে বর্জন করতে হয়।”

নিম্নবর্গের কথা প্রখ্যাত এই ইতিহাসবিদের কতটা জুড়ে আছে, তার সাক্ষী হিসেবে পরিশেষে উল্লেখ করবো একটি চিঠির কথা। একবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-কে উপন্যাসের বিষয়বস্তু নির্বাচনের পরামর্শ দিয়ে রণজিৎ গুহ একটি চিঠিতে লিখছেন, ‘সেদিন তোমার টেলিফোনের পর শম্বুকের কাহিনি নিয়ে দুয়েকটা কথা মনে এল, লিখে জানাচ্ছি। এ বিষয়ে উপন্যাসের সম্ভাবনা প্রচুর। প্রাচীনেরা—বাল্মীকি, ভবভূতি, কৃত্তিবাস—ঘটনাকে রামায়ণের সামগ্রিক কাঠামোয় দেখেছেন আদিকাণ্ড ও উত্তরকাণ্ড মিলিয়ে। ফলে, শূদ্রহত্যার যে বিশেষ তাৎপর্য তা শেষ পর্যন্ত চাপা পড়ে গেছে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার হুল্লোড়ে। উত্তরামচরিতের শেষ অঙ্কই তার প্রমাণ।’

তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘শম্বুকের তপস্যা যে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও দ্বিজ-শাসনের প্রতিবাদী সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে তাকে ঠিক শূদ্র-বিপ্লব বলা যায় কি না ভেবে দেখা দরকার। কারণ বিপ্লব শব্দটা আধুনিকতার নানা অনুসঙ্গে এতই লিপ্ত হয়ে আছে যে শুনলেই পাঠক হয়তো মনে মনে অক্টোবর বিপ্লবের আদর্শে সমাজ বদলাবার প্রোগ্রাম হাৎড়াতে শুরু করতে পারে। অথচ প্রাচীন গ্রিসের দাস-সমাজে স্পার্টাকাসের বিদ্রোহের মতোই এক্ষেত্রেও নিম্নবর্গের চেষ্টায় নতুন সমাজ গড়ার চেয়ে পুরোনোটার মধ্যেই অধস্তনের দিক থেকে সমান অধিকারের কামনাই বেশি প্রকট বলে মনে হয়। সেজন্যেই এমনকি ভবভূতির মতো প্রতিবাদীকেও মেনে নিতে হয় যে এই নৃশংসতাই যেন ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও রামরাজত্যের দৈব নির্বন্ধ ও শুভ নিয়তি—ঠিক যেমনটি হওয়ার উচিত ছিল। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের মতো ঘটনাটাকে একটা স্বাভাবিকতার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।’

চিঠিতে বারবার যে কথাটা জোর দিয়ে বলেছিলেন তা হল, রাষ্ট্র-সংকট, প্রায়শই যা ঘটে ঠিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ে। যেমনটা আমরা পুরাণ-কাহিনিতেও দেখি। রামরাজত্বের কাঠামোর বাইরে শূদ্রের তপস্যা তো সত্যিই ঘোর সংকটের নিশানা। অযোধ্যার সিংহাসনে খড়ম-পূজার দিন শেষ হয়ে আসে। রাম সত্যি-সত্যিই রাজা হয়ে বসেন। এতকালের অ-রাজকতার পরে তাঁর পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিক রাজত্ব আবার কায়েম হয়। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পালা-বদলের মুহূর্তে সব কিছুই সম্ভব, কিছুই সঠিক বলা যায় না। সীতার সতীত্ব নিয়ে নানা গুজব, ব্রাহ্মণ-সন্তানের অকাল মৃত্যু, এমনকি স্বয়ং রামের বিচার-বিবেচনাও কতটা নির্ভরযোগ্য যে বিষয়ে জল্পনা—সব মিলিয়ে সেই অনিশ্চয়তার ছায়া পড়ে এই দিনগুলির বর্ণনায়।

আজকের পরিপ্রেক্ষিতে রণজিৎ গুহ'র বিশ্লেষণ কতখানি প্রযোজ্য তা বিবেচক-পাঠককে নতুন করে বুঝিয়ে দেওয়া কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। ইতিহাস সত্য-মিথ্যা, সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতি, ভালো-মন্দ সব মিলিয়ে অতীতের একটা সম্ভাব্য ডাইমেনশন-এ নিয়ে চলে। অতীত যেহেতু অনেকাংশে বর্তমানের নিয়ামক, তার পর্যবেক্ষণ সুচিন্তিত ও যুক্তিযুক্ত হওয়া প্রয়োজন পড়ে; রণজিৎবাবুর মতো ইতিহাসবিদরা এই কাজটিই দায়িত্ব নিয়ে করে গিয়েছেন। আর রাষ্ট্রের ক্ষমতাধারীরা দায়িত্ব নিয়ে স্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে তাঁদের শ্রমে জল ঢেলে দিয়েছেন বারবার। কোনও নির্দিষ্ট জাতি, বর্ণ বা শ্রেণী নয়, আমরা সবাই আজ নীচুতলার মানুষ। ক্রমাগত শোষণে অনেককাল আগেই আমাদের 'মানবচৈতন্য' ষড়যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। একদল রাজনীতিক, ক্ষমতাশালী, প্রভাবশালী, বিত্তবানরা যেভাবে ইতিহাস বিকৃত করে চলে, তাতে বারবার কানে বাজে রণজিৎ গুহ'র একটি সতর্কবার্তা—‘আমরা ইতিহাসবিদ্যার একটা সংকটের মধ্যে আছি’

তথ্যসূত্রঃ

নিম্নবর্গের ইতিহাস, সম্পাদনা গৌতম ভদ্র

সুনীলকে লেখা চিঠি

ক্লান্তিহীন মেধাচর্চা: আত্মানুসন্ধানের দর্পণ, চিন্ময় গুহ

দেশ রূপান্তর

Developed by DXDasia