কলেরা গবেষণায় নোবেলজয়ী রবার্ট কখের ভুল শুধরে দিয়েছিলেন এই বাঙালি বিজ্ঞানী

তাঁর গবেষণা এখনও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি

এক সময়ে আমাদের দেশে কলেরার প্রকোপ খুব বেশি ছিল। কলেরার জন্য দায়ী এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। দূষিত জল বা খাবারের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। যে সব জায়গায় পরিষ্কার জল সরবরাহ  সঠিক নিকাশী ব্যবস্থা নেই, সেখানে কলেরা হয় বেশি। আধুনিক অণুজীববিদ্যার অন্যতম প্রধান দিশারী জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কখ আবিষ্কার করেন এই রোগের জীবাণু। কলেরা নিয়ে গবেষণা করতে তিনি ভারতে এসেছিলেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, কলকাতাতেও এসেছিলেন কখ। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, ভিব্রিও কলেরি নামে এক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণেই কলেরা রোগ হয়ে থাকে। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়া কীভাবে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তা নিয়ে কখের দেওয়া তত্ত্ব ছিল ভুল। সেই ভুল পরবর্তীকালে শুধরিয়ে দিয়েছিলেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী – শম্ভুনাথ দে।

১৯১৫ সালে শম্ভুনাথের জন্ম হয়েছিল হুগলি জেলার এক গ্রামে। অভাব অনটনের মধ্যেই বেড়ে উঠছিলেন তিনি। ছোটোবেলায় তাঁর প্রেরণা ছিলেন কাকা। কাকার উৎসাহেই শম্ভুনাথ স্কুলে ভর্তি হন। গ্রামের স্কুল থেকে ডিস্টিংশন নিয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে হুগলি মহসিন কলেজে পড়ার বৃত্তি অর্জন করেন। স্কলারশিপ পেয়ে ১৯৩৫ সালে  ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে। তখন কলকাতার এক ধনী ব্যবসায়ী কেসি শেঠ তাঁকে আর্থিক সাহায্য করতেন। মেডিকেল কলেজে শম্ভুনাথ হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক-অধ্যাপকদের প্রিয়পাত্র। প্যাথোলজি বিভাগের ব্যাকটেরিওলজির অধ্যাপক মণীন্দ্রনাথ দে নিজের মেয়ে তরুবালার সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেন। ১৯৩৯ সালে এমবি এবং ১৯৪২ সালে ক্রান্তীয় চিকিৎসাবিদ্যায় ডিপ্লোমা লাভ করেন শম্ভুনাথ। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইউসিএল মেডিকেল স্কুল থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৪৯ সালে।

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জোশুয়া লেডারবার্গ বারবার নোবেল কমিটিতে শম্ভুনাথের নাম উত্থাপন করেছেন পুরস্কারের জন্য। কোনো অজ্ঞাত কারণে নোবেল পাননি শম্ভুনাথ দে।

কলকাতায় নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজের গবেষণাগার এবং বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রোটিন ল্যাবরেটরিতে কলেরা নিয়ে গবেষণা করেন শম্ভুনাথ। পরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসেন, ভিব্রিও কলেরি জীবাণুর টক্সিন অন্ত্রের মিউকাস থেকে জল বের করে দেয়। যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি বারবার জলের মতো মলত্যাগ করতে থাকে। শরীর থেকে প্রচুর জল এবং খনিজ লবণ বের হওয়ায় রোগী মৃত্যু দিকে এগিয়ে যায়। শম্ভুনাথ দে’র এই গবেষণা বিজ্ঞানীমহলে এখনও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। উপযুক্ত সাহায্যও মেলেনি। তাঁর অনেক গবেষণাই অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে তাই।

রবার্ট কখ নোবেল পেয়েছিলেন ১৯০৫ সালে। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জোশুয়া লেডারবার্গ বারবার নোবেল কমিটিতে শম্ভুনাথের নাম উত্থাপন করেছেন পুরস্কারের জন্য। কোনো অজ্ঞাত কারণে নোবেল পাননি শম্ভুনাথ দে। ১৯৭৮ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাঁকে কলেরা ও ডাইরিয়ার ওপর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়ে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে তিনি বলেন, “I have been dead since the early 1960’s, I have been exhumed by the Nobel Symposium Committee and these two days with you make me feel that I am coming to life again.” ১৯৮৫ সালে শম্ভুনাথ দে প্রয়াত হন। এখন কলেরা নিরাময়ের চিকিৎসা সহজলভ্য, যার পিছনে এই মহান বাঙালি বিজ্ঞানীর অবদান ভোলার নয়।

তথ্যঋণ – অতনু চক্রবর্তী, অনুভব বেরা, Get Bengal

Developed by DXDasia