শীত আসতেই ডাক পাঠাচ্ছে লোক-মেলারা

মেদিনীপুর, পুরুলিয়া থেকে সুন্দরবন— শীতের উৎসব দোরগোড়ায়

রং-বেরঙের সুতোর টানে মসলন্দ বুনছেন মহিলা মাদুর-শিল্পী। কিংবা, পড়ে আসা কমলা রোদ গায়ে মেখে আসরে নেমেছে ছৌ-ঝুমুরের দল। লাল-মাটি আর শাল রাজার দেশ পুরুলিয়ায় মুখোশ শিল্পীরা পসরা সাজিয়েছেন অসুর-দুর্গা মুখোশের। আর, সুদূর সুন্দরবনে হাড় কাঁপানো নোনা ঠান্ডার মধ্যেই জমে উঠেছে বনবিবির পালা। বাংলায় শীতকাল চলে এল। পাশাপাশি চলে এল রং-বাহারি সব মেলার-উৎসবের মরসুম। জেলায় জেলায় এবার শুরু হবে নানা লৌকিক মেলার উৎসব। হাজার-হাজার শিল্পী, মুখোশ-মাদুর-হস্তশিল্পের পসরা, সঙ্গে সন্ধে-রাত জুড়ে গান-ঝুমুর-নাচের আসর। প্রতিটা মেলাতেই গাঁথা বাংলার নানাবিধ লোক-ঐতিহ্যের শিকড় আর মাটির গন্ধ। সে মাটি কোথাও লালচে ঝুরোঝুরো, কোথাও এঁটেল আবার কোথাও বা শুকনো পলি। 

এমনিতে এখন কলকাতায় বসেও বাংলার নানা কোণের হস্তশিল্প, শিল্পী, গান-নাচের আসর দেখা যায় দিব্বি। কিন্তু, লোকশিল্পীদের ডেরায় গিয়ে, সেই মেলার স্বাদ নেওয়া একদমই এক আলাদা জাতের ব্যাপার। শহুরে ঘেরাটোপে সেই ম্যাজিকেরা ধরা দেয় না কিছুতেই। এই মায়াবী শীতেও মেলার আসর পেতে হাতছানি দিচ্ছে বিভিন্ন জেলা। মাত্র দিন দুয়েকের ছুটিতেই ঘুরে আসা যায়। এই লেখায় হদিশ থাকল তেমনই চারটি উৎসবের।

পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং। এখানেই সারতা গ্রামে বসছে মাদুর উৎসবের আসর। ৭-৯ ডিসেম্বর। পশ্চিম মেদিনীপুর এমনিতেই মাদুরের দেশ। বাংলা ভাষা তার শৈশব ছেড়ে কৈশোরে পা রাখার আগে থেকেই অধুনা পশ্চিম মেদিনীপুরের মানুষরা বুনতে শিখে গেছিলেন মাদুর। এখনো মাদুরকাঠির চাষ ও বুননই এই অঞ্চলের মানুষদের অন্যতম প্রধান জীবিকা। মাদুর মূলত বোনেন মেয়েরা। মসলন্দ বা মতরঞ্চি এখানকার ট্রেডমার্ক মাদুর, স্থানীয় ভাষায় মশনা। এই মাদুরের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। সরিতার মাদুর উৎসব শুরু হয়েছিল গত বছর। আয়োজক পশ্চিম মেদিনীপুর সারতা মাদুর বয়ণ শিল্পী কল্যাণ সমিতি। সঙ্গে সহায়তা করছে পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ। এখানে এলে শিল্পীদের হাতে বোনা টাটকা মসলন্দ বা মতরঞ্চি কিনতে তো পারবেনই, পাশাপাশি সহজেই উঁকি দিতে পারবেন শিল্পীজগতের অন্দরমহলেও। খুব কাছ থেকে দেখতে পাবেন মাদুর তৈরি হওয়ার খুঁটিনাটি। যদি আরো উৎসাহী হন, তাহলে মাদুরে বোনা মোটিফের আড়ালের গপ্পগুলিও হয়তো ধরা দেবে আপনার কাছে। একটা গোটা গ্রাম, গ্রামের জীবন, মাদুরশিল্পের সম্ভার আর উৎসবের আবহে নানা অনুষ্ঠান আপনাকে ঘিরে থাকবে দুটো দিন। থাকার ব্যবস্থা আছে গ্রামেই। সব মিলিয়ে মন্দ যে লাগবে না, বলাই বাহুল্য।

ডিসেম্বরের ১৪-১৬ তারিখ ছৌ-মুখোশের মেলা বসছে পুরুলিয়ার চড়িদায়। অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে ছৌ-মুখোশের গ্রাম এই চড়িদা। লোকসংস্কৃতির শিকড়ের গন্ধ লেগে আছে ছৌ নাচের গায়ে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতিও মিলেছে আগেই। এই নাচেরই অন্যতম প্রধান উপকরণ মুখোশ। আর, সেই মুখোশেরই আঁতুরঘর হল চড়িদা। ‘ছৌ-মুখোশ শিল্পী সংঘের’ আয়োজনে এবং পশ্চিমবঙ্গ খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের সহায়তায় এখানে বসছে মেলার আসর। মুখোশশিল্পীদের জীবনযাপন, মুখোশ বানানোর শৈলীকে বড়ো কাছ থেকে দেখার সুযোগ এই মেলা। অযোধ্যা পাহাড়ের মন-ভুলিয়ে দেওয়া ল্যান্ডস্কেপ, ঘন হয়ে আসা শীতে ডুমো হলুদ আলোর নিচে মুখোশ তৈরিতে নিমগ্ন শিল্পী, গ্রামীণ মেলার রহস্যময়ী পরিবেশ—সবটা মিলিয়ে ঘোর লেগে যাওয়ার ভরপুর আয়োজন এই মেলায়।

পুরুলিয়ারই ঝালদা-২ ব্লকের বামনিয়া গ্রামে বসবে ছৌ-ঝুমুর উৎসবের আসর। ২২-২৮ ডিসেম্বর, এক সপ্তাহ ধরে চলবে এই মেলা। প্রায় ৫০০০ শিল্পী ছৌ ঝুমুর নিয়ে  চর্চা করেন পুরুলিয়ায়। ছৌ-নাচ সঙ্গে পুরুলিয়ার নিজস্ব ঝুমুরের যুগলবন্দি। লাল মাটি আর শালরাজার দেশের নানা গপ্প, পুরাণ, যাপনের অনুষঙ্গ হাত ধরাধরি করে হাঁটে ছৌ-ঝুমুরে। এই উৎসবে প্রতিদিন ৫টি করে ছৌয়ের দল অংশ নেবে। মানুষের ঢল নামে এই উৎসবে। দিনে গড়ে হাজার দশেক মানুষ জড়ো হন। আসর জমে বিকেল ৩টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। ছৌ-ঝুমুরের অপার্থিব পরিবেশ, গ্রাম্য মেলার পসরা, রং, স্থানীয় খাবার, দোকান-পাট মিলিয়ে অভিজ্ঞতাটি চিরকালীন হয়ে উঠবে নিশ্চিত। থাকতে চাইলে পুরুলিয়াতেই নিতে পারেন হোটেল। পুরুলিয়া থেকে বাসে বা গাড়িতে বামনিয়া ঘন্টাখানেকের পথ। 

টাঁড় পাহাড় আর লালমাটির নেশা কাটিয়ে যদি ভাটির দেশে মুখ ফেরাতে ইচ্ছে করে, তাহলে আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে ‘সুন্দরবন লোক উৎসব’। গোসাবার ‘পাখিরালয়ে’ ২৮-২০ ডিসেম্বরে বসবে এই মন-মাতানো উৎসবের আসর। সুন্দরবন আঠারো ভাটির দেশ। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আদিমতা, অসংখ্য নদী-খাঁড়ি, নোনা বাতাসের মধ্যেই মিশে আছে লোকমানুষদের জীবনচর্যার নানা মণি-মুক্তো। এখানে খেয়ালি নদীর স্রোতে ভেসে বেড়ায় ভাটিয়ালির সুর, বনবিবির পালায় গাঁথা হয়ে থাকে বাঘের থাবা এড়িয়ে বয়ে চলা জীবনসংগ্রামের নানা রং। সুন্দরবনের ঝুমুরের স্বাদ এক্কেবারেই আলাদা। সুন্দরবনে ২২টি বনবিবি পালার দল, ১৭টি ঝুমুর নাচের দল আর শতাধিক ভাটিয়ালি শিল্পী আছেন। এরা সবাই একজোট হবেন এই উৎসবে। সুন্দরবনের প্রকৃতি, আদিমতা, নোনা হাওয়ার সঙ্গে ভাটিয়ালি-বনবিবি পালার গান বা ঝুমুরের সুর এক অন্য পৃথিবীতে নিয়ে যাবে আপনাকে। বছরটা শেষ হয়ে আসবে। নাগরিক ক্লান্তিতে আর কিছুতেই ফিরতে ইচ্ছে করবে না তখন। 

ডিসেম্বর দোরগোড়ায়। সামান্য ক’দিনের শীতও চলে এল বলে। ব্যস্ত শহরে ধুঁকতে ধুঁকতে সামান্য অক্সিজেনের লোভেও ছুটে যাওয়া যায় এইসব মেলায়। ঢেউ খেলানো টাঁড় পাহাড়ের দেশে বা সুন্দরবনে। না-জানা গপ্পেরা ধরা দেবে, দূষণের ভার অন্তত কিছুদিন তাড়িয়ে ফিরবে না ফুসফুসকে। তাহলে আর কী? চলুন, ঘুরে আসাই যাক।

Developed by DXDasia