চার্চিলের নীতি কীভাবে বিধ্বস্ত করে দেয় বাংলাকে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎজি সরকারের হাতে যত ইহুদীর মৃত্যু ঘটে, তার চেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৭৭০ এবং ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে। যেহেতু তাঁদের স্মরণে কোনও বিশেষ দিন নেই, তাই আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবসেই তাঁদের স্মরণ করাটা জরুরি। কারণ ভারতে ব্রিটিশ শাসকদলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তালিকায় ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ওপরে সম্ভবত আর কিছু নেই। এই দুর্ভিক্ষের কারণ অনাবৃষ্টি বা ফসল নষ্ট হওয়া নয়, এর কারণ ইংল্যান্ডে উইনস্টন চার্চিলের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ সরকারের চূড়ান্ত এবং ইচ্ছাকৃত ব্যর্থতা।
বছর দুই আগে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলে এই তত্ত্বের। আইআইটি গান্ধীনগরের এই গবেষণার কেন্দ্রে ছিল ১৮৭৩ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে ঘটে যাওয়া ছ’টি বড় দুর্ভিক্ষ। একমাত্র বাংলার ৪৩-এর দুর্ভিক্ষের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, অনাবৃষ্টি অথবা ফসলের ব্যর্থতা নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এশীয় শক্তি দ্বারা আক্রমণের ভয়, এবং “অপুষ্টি, অনাহার, ও ম্যালেরিয়া” ছিল কারণ।
অনেকেই হয়তো বলবেন, এ তো পুরনো কথা। সেই ১৯৮১ সালে অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, বাংলার মানুষের পেট ভরার মতো খাদ্য সরকারের কাছে ১৯৪৩-এ মজুত ছিল, এবং ২০১৭ সালে প্রকাশিত ‘Inglorious Empire: What the British Did to India’ বইটিতে শশী থারুর লেখেন, চার্চিল জেনেশুনেই অভুক্ত ভারতীয়দের মুখের খাবার চালান করে দেন ভরপেট খাওয়া ব্রিটিশ সৈন্যদলের দিকে, এমনকি গ্রীস ও ইউগোস্লাভিয়ার মানুষের জন্য ইউরোপে জমতে থাকা খাদ্যভাণ্ডারের দিকেও।
ফল, ৬ কোটির জনসংখ্যায় মৃত প্রায় ৩০ লক্ষ। শুধুমাত্র অনাহারে নয়, অপুষ্টি, গণ অভিপ্রয়াণ বা মাইগ্রেশন, চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, এবং ম্যালেরিয়ার মতো মারাত্মক ব্যাধিও কারণ। বলা যেতেই পারে, বাংলার সামাজিক জীবনে যে উথালপাথাল সেসময় ঘটেছিল, তার রেশ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি আজও। একের পর এক ছোট ছোট ক্ষেত বিক্রি করে দিয়ে শহরের দিকে পাড়ি দিয়েছিলেন পুরুষেরা, মহিলা এবং শিশুরা হয়ে গিয়েছিলেন পরিযায়ী, খাবারের খোঁজে ক্রমাগত ঘুরতেন এ শহর থেকে ও শহরে।
বাংলার কৃষিক্ষেত্রে দুর্দশা ঘনিয়ে আসছিল অনেক বছর ধরেই, প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম কারণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫) শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে। সেকথা অজানা ছিল না ব্রিটিশ প্রশাসনের। অথচ যুদ্ধের সময় সেই প্রশাসনই সিদ্ধান্ত নেয়, জাপান যদি বাংলা হয়ে ভারত আক্রমণ করে, তবে জাপানি ফৌজ যাতে খাদ্য না পায়, তাই নষ্ট করে দেওয়া হবে বাংলার শস্যভাণ্ডার। অথবা বাংলায় চালের আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হবে, কারণ ইউরোপে যুদ্ধকালীন খাদ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা বেশি প্রয়োজন।
বাংলার মানুষের কপালে যে চরম দুর্দিন আসছে, তা রোখার কোনোরকম প্রচেষ্টা হয়নি, এমন কিন্তু নয়। দুর্ভিক্ষের আগের বছর, অর্থাৎ ১৯৪২-এর ডিসেম্বর থেকে শুরু করে নথিপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, একাধিক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী, যেমন বাংলার গভর্নর জন হারবার্ট, ভারতের ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো, ভারতের সেক্রেটারি অফ স্টেট লিও আমেরি, ভারতে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ক্লড অকিনলেক, এবং খোদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুপ্রিম কম্যান্ডার লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন পর্যন্ত ক্রমাগত সুপারিশ করে যান, ভারতে খাদ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হোক। মাসের পর মাস তাঁদের আর্জি হয় বাতিল করা হয়, নাহয় প্রয়োজনের তুলনায় নামমাত্র আমদানি অনুমোদন করা হয়।
‘Churchill’s Secret War: The British Empire and the Ravaging of India During World War II’ বইটিতে মধুশ্রী মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ১৯৪৩-এর অগাস্ট মাসে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া থেকে আটা যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা, মধপ্রাচ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় – অর্থাৎ ভারত বাদে ভারত মহাসাগরের প্রায় সব অঞ্চলেই। যেন ভারতকে ইচ্ছে করে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।
তাই বলছিলাম, আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবসে একবার ফিরে দেখাই যায় সেই ৩০ লক্ষ মৃত্যুর দিকে, যার মূলে ছিল সরকারের নির্মম অবহেলা, ঔদ্ধত্য, এবং জাতি বিদ্বেষ। এবং শেষে মনে করাই যায় বাংলায় এই বিপুল পরিমাণ মৃত্যুর খবর শোনার পর চার্চিলের উক্তি: “I hate Indians. Beastly people with a beastly religion. The famine was their own fault for breeding like rabbits (ভারতীয়দের আমি ঘৃণা করি। যেমন অসহ্য ওরা, তেমনই অসহ্য ওদের ধর্ম। খরগোশের মতো বংশবৃদ্ধি করলে দুর্ভিক্ষ হবেই।”