
মাদার টেরিজা পৌঁছে গেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে, মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা করেছেন দুই হাত দিয়ে
এই মহাপৃথিবীর বিপুল কর্মকাণ্ডের ভার হাতে তুলে নিতে পারেন ক’জন! একজন পেরেছিলেন অনেক বছর আগে। যিনি ঈশ্বরের মতো। আদ্যন্ত নাস্তিক মানুষও তাঁকে ঈশ্বর ভাবতেন। কারণ তিনি আলোর পথযাত্রী। তিনি মাদার টেরিজা।
এই একটা মানুষ একা একা তিলোত্তমা কলকাতার বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অনাথ শিশুকে পরমযত্নে কোলে তুলে নিচ্ছেন, আস্তাকুঁড়ে পড়ে থাকা বাচ্চাকে আশ্রয় দিচ্ছেন। তাঁর হাত জোড় করা। একটু ঝুঁকে অলিতে-গলিতে হেঁটে যাচ্ছেন তিনি। মানবতা সম্পর্কে আপাত ধ্যানধারণা বদলে দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান? ও সব ছোটো কথা। বাবা-মা ছেড়ে, দেশ ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে স্বেচ্ছায় নিশ্চিন্তে দারিদ্র্যের শহর কলকাতায় চলে আসছেন মাদার। তারপর পৌঁছে যাচ্ছেন গ্রাম থেকে গ্রামে, মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবা করছেন দুই হাত দিয়ে। মাদারের মুখে হাসি। মাদারের চোখে জল। যাঁরা তাঁকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন, টেরিজার আদরের স্পর্শ।
তাঁদেরই একজন আশিস নন্দী লিখেছেন, “কলকাতায় দারিদ্র্য বেশি। অত্যাচার, অবিচারের মধ্যে গিয়ে ওই প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবনযাত্রাকে ছোঁয়া— এটা এর আগে কেউ করেনি। মানুষ তা বুঝেওছিল। তাই মাদারকে মানুষ আলাদাভাবে শ্রদ্ধা, সম্মান জানিয়েছে। কোথাও একটা বোধশক্তি এ ব্যাপারে কাজ করছিল। ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসেব করেননি মাদার। ভাবেননি, তাঁর এই কাজের মাধ্যমে সমাজ কতটা পাল্টাবে। এরও তো একটা আলাদা মূল্য আছে!”
স্রোতকে সঙ্গে নিয়েই স্রোতের বিপরীতে হাঁটা – মাদার টেরিজা যা চেয়েছিলেন, তা মনপ্রাণ দিয়ে করে দেখিয়েছিলেন। আসলে ওসব চ্যারিটি-ট্যারিটি তুচ্ছ কথা। ব্যক্তিমানুষ ঠিক থাকলে স্বার্থহীনভাবে কাজ করা যায়, তা মাদার আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন।
তিনি জন্মেছিলেন পূর্ব ইউরোপে। কিন্তু, তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগ অংশই কেটেছে ভারতে, বিশেষ করে কলকাতায়। কল্লোলিনীর বুকে তিনি গড়ে তুলেছেন ধর্মীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’। আরও বেশ কিছু সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তিনি স্থাপন করেছেন। ১৯৭৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে। খ্রিস্টধর্ম প্রচারে মাদার টেরিজার অবদান ভোলার নয়। ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস তাঁকে ‘সন্ত’ উপাধি প্রদান করেন। মরণোত্তর এই উপাধি লাভের পর ক্যাথলিক গির্জায় তিনি ‘কলকাতার সন্ত টেরিজা’ নামে আখ্যায়িত হন। ৯১ বছর আগে ১৯২৯ সালে ৭ জানুয়ারি দরিদ্র এবং অসহায় মানুষদের সেবা করার উদ্দেশ্য নিয়ে কলকাতায় প্রথম পা রেখেছিলেন বিশ্বমানবতার মূর্ত প্রতীক মাদার টেরিজা।
তাঁর সংস্পর্শে আসা আরও একজন, তমালকান্তি মুখোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন, “১৯৭৮ সালে প্রথমবার মাদারের হাত স্পর্শ করে মনে হয়েছিল, ঈশ্বর আর কোথাও নেই। আছে শুধু এই স্পর্শে। আর তারপর? তারপর আমাকে ব্যাপটাইজড হতে হয়নি। আমাকে সন্ন্যাসী হতে হয়নি। আমাকে খ্রিস্টান হতে হয়নি। আমাকে শুধু মানুষ হতে হয়েছিল— চার পাশের জরা, ব্যাধি আর অনাথ শৈশবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।”
উদ্ধৃতি ঋণঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
