যোগ দেবেন পশ্চিমবঙ্গ-সহ অন্যান্য রাজ্যের কৃষকরা
হাইব্রিড বীজ কিনলে প্রচুর রাসায়নিক সার, বিষ, প্রচুর ভৌম জলের প্রয়োজন হবে এবং তার সঙ্গে পাম্পসেট, পাইপ এগুলোও বিক্রি হবে প্রচুর। ষাট থেকে আশির দশকে রাসায়নিক সার, বিষ ও বীজ এভাবেই বাজার তৈরি করেছিল। মোটামুটি এইভাবে বাংলার কৃষিজমির মাটি নষ্ট হতে থাকলো আর কয়েক দশকেই প্রায় লুপ্ত হয়ে গেল দেশি ধানের জাতগুলি, দেশি বীজ। এভাবেই ক্রমশ নষ্ট হয়েছে আমাদের পরিবেশ ও যাপনের সুস্থতা। তবে, হাইব্রিড চাষ বা কৃত্রিম পদ্ধতিতে চাষের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এখন সচেতনতা অনেক বেড়েছে। অনেক উদ্যোক্তাই এখন জৈব চাষের সাহায্যে প্রাকৃতিক কৃষি বা Organic Farming-এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। বলা যায়, নতুন ভাবে জন্ম নিচ্ছে কৃষি আন্দোলন। দেশীয় বীজ সংরক্ষণে তৈরি হচ্ছে ছোটো ছোটো সংগঠন। জৈব পদ্ধতিতে চাষের পাশাপাশি এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন তাঁরা। গতবছর ১৫০০-এর বেশি ফসল বৈচিত্র্য নিয়ে উত্তর দিনাজপুর রায়গঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বীজ উৎসব ও জৈব কৃষি মেলা (Raiganj Seed Festival & Organic Food Mela)। জৈব কৃষি নিয়ে এত বড়ো মাপের মেলা আগে হয়নি। এবছর বাঁকুড়া শহরে এই উৎসব তথা মেলার আয়োজন করছে, ফোরাম ফর ইন্ডিজেনাস এগ্রিকালচার বা ফিয়াম (F.I.A.M.) এবং পাঁচাল সুস্থায়ী কৃষি উদ্যোগ সমিতি।
বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া-র প্রস্তরখণ্ডময় ঊষর ভূমিকে সুফলা করার লক্ষ্যে বাঁকুড়ার গোগড়া গ্রামে কৃষি খামার তৈরি করেছিলেন সুলেখা কালির জনক সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত। এই মেলায় স্মরণ করা হবে তাঁকে।

কৃষি মেলা? এ আর নতুন কী, সবাই জানে! কিন্তু, সবাই যেটা জানে না, তা হল প্রচলিত কৃষি মেলায় যে বড়ো বড়ো ফল, সবজির প্রদর্শনী হয়ে থাকে, সেগুলির বেশিরভাগই রাসায়নিক সার দিয়ে উৎপাদিত, হাইব্রিড। অন্যদিকে, যেসব কৃষক বর্তমানে জৈব উপায়ে দেশজ বীজ চাষ করছেন, তাঁদের চাষজাত ফসল ও বীজের প্রদর্শন অথবা প্রাপ্য সম্মান জানানোর উদ্যোগ সাধারণত নেওয়া হয় না। এই মেলা কি সেই ঘাটতিই পূর্ণ করবে?
গত বছর, এই বীজ মেলা প্রসঙ্গে কৃষি-গবেষক ডঃ অনুপম পাল বলেছিলেন, কলকাতায় আগে কিছু বীজ মেলা হয়েছিল ১০/১২ বছর আগে। এই উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে সব জেলায় বীজ মেলা করা উৎসাহ বাড়বে। ফিয়াম-এর তরফে চিন্ময় দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “এই মেলাতে যে সকল কৃষক ও কৃষক গোষ্ঠী আসবেন, তাঁরা কোনও রকমের রাসায়নিক সার, কীটনাশক ব্যবহার না করেই নানা ধরনের ফসলের জাত সংরক্ষণ করছেন। মেলাতে প্রদর্শিত হবে তাঁদের উৎপাদিত ফসল ও অন্যান্য পণ্য। সঙ্গে থাকবে মধু। অন্য রাজ্যের কৃষকরাও আসবেন। প্রখ্যাত রসায়নবিদ সতীশ দাশগুপ্ত, যিনি শুকনো অঞ্চল নিয়ে কাজ করেছিলেন, তাঁকে নিয়ে কোনও আলোচনা হয় না। আমরা ভেবেছি এবছর সতীশ দাশগুপ্ত মঞ্চ করব। দু’টো পুরস্কার থাকবে, রিচারিয়া এবং ভাবিলভ অ্যাওয়ার্ড”।
প্রসঙ্গত, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র, সুলেখা কালির জনক সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত রসায়নবিদ্যায় গবেষণা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে, সুদীর্ঘ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এক বিস্ময়কর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ৮৬ বছর বয়সে বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়ার প্রস্তরখণ্ডময় ঊষর ভূমিকে সুফলা করার লক্ষ্যে বাঁকুড়ার গোগড়া গ্রামে নতুন কর্মক্ষেত্র স্থাপন করেন। উদ্দেশ্য, প্রকৃতিকে কাজে লাগাবেন মানুষের কল্যাণে। এখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চিরপতিত কাঁকুড়ে জমিকে উর্বর সুফলা করার এক অবিশ্বাস্য সাধনায় লিপ্ত হলেন, সফলও হলেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই বাঁকুড়ার গোগড়া গ্রামে তৈরি হয় তাঁর কৃষি খামার। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মান সূচক ডি.এসসি উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও আজীবন গঠনমূলক সেবাকার্য ও পল্লি উন্নয়নে বৈজ্ঞানিক প্রয়োগ-পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য ১৯৭৮ সালে তাঁকে যমুনালাল বাজাজ পুরস্কার দেওয়া হয়।
যেসব কৃষক বর্তমানে জৈব উপায়ে দেশজ বীজ চাষ করছেন, তাঁদের চাষজাত ফসল ও বীজের প্রদর্শন অথবা প্রাপ্য সম্মান জানানো হয় না। এই মেলা কি সেই ঘাটতিই পূর্ণ করবে?
