১৫০০-এর বেশি ফসল বৈচিত্র্য নিয়ে বাংলায় এই প্রথম বীজ উৎসব ও জৈব কৃষি মেলা

রায়গঞ্জ শহরের অদূরে হাতিয়া হাইস্কুলে আয়োজিত হয়েছে মেলা

ফিয়াম-এর কৃষকবন্ধুর সঙ্গে ডঃ অনুপম পাল

হাইব্রিড বীজ কিনলে প্রচুর রাসায়নিক সার, বিষ, প্রচুর ভৌম জলের প্রয়োজন হবে এবং তার সঙ্গে পাম্পসেট, পাইপ এগুলোও প্রচুর বিক্রি হবে। এটা একটা প্যাকেজ। ষাট থেকে আশির দশকে ‘কোম্পানী’র রাসায়নিক সার, বিষ ও বীজ এভাবেই বাজার তৈরি করেছিল। মোটামুটি এইভাবে বাংলার কৃষিজমির মাটি নষ্ট হতে থাকলো আর কয়েক দশকেই প্রায় লুপ্ত হয়ে গেলো দেশি ধানের জাতগুলি, দেশি বীজ। এভাবে নষ্ট হয়েছে আমাদের পরিবেশ ও যাপনের সুস্থতা। তবে হাইব্রিড চাষ এবং এই ধরনের কৃত্রিম পদ্ধতিতে চাষের যে নেতিবাচক প্রভাব, তা নিয়ে এখন সচেতন হচ্ছে মানুষ। অনেক উদ্যোক্তাই এখন জৈব চাষের সাহায্যে প্রাকৃতিক কৃষি বা Organic Farming-এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। দেশীয় বীজ সংরক্ষণে ছোটো ছোটো সংগঠন তৈরি হচ্ছে। বলা যায় নতুন ভাবে জন্ম নিচ্ছে কৃষি আন্দোলন। বলা যেতে পারে, তারই ফলস্বরূপ ফিয়াম (F.I.A.M.)-এর উদ্যোগে রায়গঞ্জ শহরের অদূরে হাতিয়া হাইস্কুলে ২৫ ও ২৬ শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বীজ উৎসব ও জৈব কৃষি মেলা (Raiganj Seed Festival & Organic Food Mela)। সহযোগিতা করছেন ভারত বীজ স্বরাজ মঞ্চ, ভারত এগ্রো ইকোলজি এবং কিস্টোন ফাউন্ডেশন। এছাড়া আছে অনেক মানুষের ব্যক্তিগত সহযোগিতা।

২০০৭-এ কয়েকজন বন্ধু মিলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সন্ধান পায় ১৪টি দুষ্প্রাপ্য ধানের। প্রথমদিকে ওই ধানগুলোর সংরক্ষণ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। পরে কৃষকদের সংগঠিত করে বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে শুরু হয় জৈব চাষের লড়াই। পেট্রো-ক্যামিক্যাল নির্ভর পুঁজিবাদী প্রযুক্তির প্রভাবে ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া গ্রামীণ বাস্তুতন্ত্র, জলাশয়, জমির উর্বরতা, জল-জমি-জঙ্গলের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য-স্বাস্থ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ স্বনির্ভর অর্থনীতির বুনিয়াদ, কৃষকের বীজের অধিকার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে চলেছে রায়গঞ্জের ফোরাম ফর ইন্ডিজেনাস এগ্রিকালচারাল মুভমেন্ট (Forum for Indigenous Agricultural Movement)-ফিয়াম (F.I.A.M.)। বহুজাতিকের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বিগত কয়েক বছর ধরে জৈব কৃষি ও বীজ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য কাজ করে চলেছে। উত্তর দিনাজপুর জেলার সদর ব্লক রায়গঞ্জের হাতিয়াপালুই বাড়ি এবং সংলগ্ন ইটাহার ব্লকের ক্যাওটাল – এই তিনটি গ্রামে একশো বিঘারও বেশি জমিতে বহু কৃষক ফিয়ামের নেতৃত্বে জৈব চাষে নিযুক্ত আছেন। মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীরও সক্রিয় অংশগ্রহণ আছে।

ফিয়ামের উদ্যোগে আয়োজিত এই মেলায় অংশগ্রহণ করবেন প্রায় ১০০ জনের বেশি কৃষক। প্রদর্শিত হবে তাঁদের কৃষিজাত বিভিন্ন রকম দেশি ধান, সবজি, গম, মিলেট, লাউ, ডাল শস্য ও তৈলবীজের সম্ভার। অন্তত ৭০০ রকমের ধানের বীজ থাকছে। 

প্রচলিত কৃষি মেলায় রাসায়নিক সার দিয়ে উৎপাদিত বড়ো বড়ো মূলো, কচু, ফুলকপি, আলু, আখ ইত্যাদির প্রদর্শনী হয়ে থাকে। এটা ব্যতিক্রমী মেলা। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের মেলা বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে এটাই সাম্প্রতিক কালের মধ্যে প্রথম। বহু কৃষকই এখন দেশজ বীজ চাষ করছেন জৈব উপায়ে। কিন্তু তাঁদের চাষজাত বীজের প্রদর্শন এবং তাঁদেরকে প্রাপ্য সম্মান জানানোর সুযোগ সাধারণত হয় না। এই মেলায় সেই ঘাটতি পূর্ণ হবে। 

জৈব চাষের বিভিন্ন বেগুন

আসামের শ্রীমোহন বোরা, হরিয়ানার লালু সম্প্রীত, বিহারের অনিল সহদয়া, অন্ধ্রপ্রদেশের কুমান্না সম্বামূর্তি-রা রাজ্যের বাইরে থেকে এই বীজ উৎসবে আসবেন বলে জানিয়েছেন। এখানে দেশজ বিষমুক্ত চাল ও সবজির প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা হয়েছে। মেলায় পাওয়া যাবে দাঁদখানি, বালাম, বাঁশফুল চাল, পারিজাত চালের মুড়ি, বিগোরের বেগুন, কালো গম, কালাভাত ও মিলেটের আটা ইত্যাদি। তুলাইপাঞ্জি, রাধাতিলক ইত্যাদি চাল থাকছেই। তুলাইপাঞ্জি ও গোবিন্দ ভোগ চালে ভেজাল চেনানোরও ব্যবস্থা থাকবে। উপস্থিত থাকবেন ধান ও বীজ সংরক্ষক ‘পদ্মশ্রী’ মানবী সবরমতি। উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের বহু বিশিষ্ট বীজ সংরক্ষক এবং জৈব কৃষক। বাঁকুড়ার ভৈরব সাইনি (৪০০ রকমের বিভিন্ন  ফসলের বীজ সংরক্ষক ও গবেষক), গড়বেতার প্রদ্যুৎ সামন্ত (কালা ভাত চালের রেডি টু ইট খাবারের আবিষ্কর্তা), সুন্দরবনের পশ্চিম শ্রীধরকাটি জনকল্যাণ সংঘ, পাথরপ্রতিমার দুর্বাচটি সোশ্যাল একশন, নন্দীশ্বর ধান নির্বাচক নন্দীশ্বর নষ্কর, পিপিভিআরএ পুরস্কার প্রাপক অলক দাস, শৈলেনচণ্ডী, নিমাই মণ্ডল প্রমুখ। এছাড়া থাকবেন ভারত সরকারের জৈব কৃষি কেন্দ্রের প্রাক্তন অধিকর্তা ডঃ পরিতোষ ভট্টাচার্য। ভারত বীজ স্বরাজ মঞ্চের পক্ষে থাকবেন জেকব নেল্লীথানম, দেশজ ফসল ও জৈব কৃষি গবেষক সৌমিক ব্যানার্জি। এছাড়া থাকবেন প্রখ্যাত ধান সংরক্ষক ও জৈব কৃষি গবেষক ডঃ অনুপম পাল। ফিয়ামের তরফে চিন্ময় দাস।

“আমরা হিসেব করে দেখেছি এই মেলায় থাকবে ৭০০ রকমের শুধু ধানের বৈচিত্র্য, সঙ্গে অন্যান্য ফসল আছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০০-এর বেশি ফসল বৈচিত্র্য নিয়ে এই বীজ উৎসব ও জৈব কৃষি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য রাজ্য থেকে এমনকি বাংলাদেশ থেকেও কৃষকরা আসছেন। বীজ ও জৈব কৃষি নিয়ে এত বড়ো পরিসরে মেলা হয়নি সারা পশ্চিমবঙ্গে।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন চিন্ময়বাবু।

প্রচলিত কৃষি মেলায় রাসায়নিক সার দিয়ে উৎপাদিত বড়ো বড়ো মূলো, কচু, ফুলকপি, আলু, আখ ইত্যাদির প্রদর্শনী হয়ে থাকে। এটা ব্যতিক্রমী মেলা। পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের মেলা বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে এটাই সাম্প্রতিক কালের মধ্যে প্রথম।

ডঃ অনুপম পালের কথায়, “দারুন ঊদ্যেগ। শুভকামনা রইল। কলকাতায় আগে কিছু বীজ মেলা হয়েছিল‌ ১০/১২ বছর আগে।‌ ছোটোখাটো মেলাও হয়েছে। কৃষি মেলার কথা বলছি না। এই উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে সূচনা হল সব জেলায় বীজ মেলা করা উৎসাহ। কিন্ত এই ধরনের মেলা করার জন্য অর্থ সাহায্যে দরকার। অনেক সময় অন্তরায় হয়।”​

মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে কৃষিসভ্যতা ৫০০০ বছরের বেশি পুরোনো। দেশীয় পদ্ধতিতে চাষ ও প্রকৃতিকে সুস্থ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা আমাদের জানা ছিল। কিন্তু ৬০ দশকে সবুজ বিপ্লবের ধাক্কায় দেশীয় চাষ পদ্ধতি ভেঙে পড়ে, উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এসব আসে। এই আধুনিক চাষ ব্যবস্থায় প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাঞ্জাব। সেখানে ভাতিণ্ডা গ্রামের মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং সেই অভিশপ্ত জীবন তাঁরা বয়ে নিয়ে চলেছেন। তবে, ৯০ দশক থেকে আবার দেশীয় চাষ পদ্ধতিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে – যা আমরা সুস্থায়ী কৃষি আন্দোলন বলে চিনি। 

 

দক্ষিণ বঙ্গের দেশি ফসল চাষ ও বীজ সংরক্ষণ সংগঠন ‘পাথরপ্রতিমা রানার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা নীলাঞ্জন মিশ্র বঙ্গদর্শন.কম-এ ‘দেশি ধানের চাষ ও বীজ সংরক্ষণ : সমস্যাটা কোথায়, সমাধানই বা কী?’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছিলেন, বড়ো বড়ো মনোকালচার ফার্মে মাটির প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। বেঁচে আছে প্রান্তিক চাষিদের এই দুই চার বিঘা করে জমি। যেগুলির সম্ভাবনা ও বৈচিত্র্যৈ অনেক। এই সব জমি একত্রিত করে দেশি ধান মাছ শাকসব্জী পশুপালন সবটাই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে করা সম্ভব এবং গ্রামকে গ্রাম ধরে বর্তমান পুষ্টির অভাব, খাদ্য নিরাপত্তার অভাব, অর্থাভাব, স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনমন থেকে গ্রামগুলিকে রক্ষা করা সম্ভব। এতে দেশি বীজের সংরক্ষণও হবে আবার চাষও হবে। মৃতপ্রায় গ্রামীণ অর্থনীতি তার বল ফিরে পাবে। পুঁজিপতিরা খাবারের দিকে খুব মন দিয়েছেন। খাবার থেকে তাদের লাভ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এ কথাটি আসলে বিপদজনক। সমঝদার মানুষ তা বোঝে। পুঁজিপতিরা সমস্ত দেশি বীজের পেটেন্ট নিয়ে নেওয়ার আগে, সমস্ত জমি চুক্তিচাষের অন্তর্ভুক্ত করিয়ে নেওয়ার আগে, গ্রামে গ্রামে প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলে গ্রামের সমস্ত কিছু বাইরে নিয়ে চলে যাওয়ার আগে খুব দ্রুত আমাদেরকে মাঠে নেমে আসতে হবে।

সেই কাজটাই করছে ফিয়ামের মতো সংগঠনগুলো। মাঠে নেমে কাজ করছে। এভাবেই তৈরি হচ্ছে বাংলার চাষাবাদের নতুন বুনিয়াদী গল্প, জন্ম নিচ্ছে নতুন সবুজ বিপ্লব। দাঁত থাকতে থাকতেই দাঁতের মর্ম বোঝা ভালো, এই প্রবাদ কতটা বাস্তবসম্মত তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেলেও  মনে রেখে চলতে পারি না। ভুলে গেলে চলবে না দেশি বীজের অধিকার চাষীর অধিকার, রাসায়নিকবিহীন চাষ ও ফসল বৈচিত্র্যই আমাদের খাদ্য সুরক্ষা।

ছবিঋণ: ফিয়াম

Developed by DXDasia