মাঠ থেকে রান্নাঘর : বিষহীন, সুস্থ যাপনের চলমান উদ্যোগ

দ্বিতীয় বছরে পা রাখলো এই বিকল্প-মেলা

শিল্পী হিরণ মিত্রের করা মাঠ থেকে রান্নাঘর-এর লোগো

মাঠ থেকে রান্নাঘর – ছোট্ট বাক্যটিই অনেক কথা বলে দিচ্ছে। এ কথা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা কাটিয়ে আমরা ভাববার সময় পাই না- কী খাচ্ছি, কী পরছি, কী মাখছি। সরাসরি উৎপাদকদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয় না। তাঁদের জীবনের শরিক হওয়া, তাঁদের বিপন্নতার কথা শোনা হয়ে ওঠে না। রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন বলেছিলেন, খাদ্যে ভেজাল মেশানো সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য সমাজবিরোধী কাজ। ভেজালের বহু পুরোনো ইতিহাস আছে। আমরা যদি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে, কর্পোরেট মুনাফালোভী বাজারের হাতে নিজেদের সঁপে দিই, বিষাক্ত জীবন গ্রাস করতে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। এর থেকে মুক্তির একমাত্র পথ সচেতনতা এবং উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া। যে কাজটাই গত কয়েক বছর ধরে করে চলেছে নেচারমেটস, পাথরপ্রতিমা রানার্স, মধুবন স্বনির্ভর মৌপালক গোষ্ঠী, পৌষ্টিক লাইফ, ভূমিকা এবং মহাত্মা গান্ধী গ্রামোদ্যোগ সেবা সংস্থান ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন। তাঁদের বিকল্প উদ্যোগে এই নিয়ে চতুর্থবার আয়োজিত হচ্ছে – “মাঠ থেকে রান্নাঘর”। অভিনব এই মেলা আর পাঁচটা মেলার মত প্রদর্শন আর বিকিকিনির মেলা নয়। আক্ষরিক অর্থেই মাঠ থেকে অর্থাৎ সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে উৎপাদিত ফসল আপনার রান্নাঘরে পৌঁছে দিচ্ছে এই মেলা। শুধু রাসায়নিকমুক্ত প্রাকৃতিক বা অর্গানিক খাবার নয়, অর্গানিক বস্ত্র, ভেষজ প্রসাধন ইত্যাদি নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার যৌথ প্ল্যাটফর্ম, যৌথ প্রয়াস।

নিজেরা সুস্থ থাকতে ও পৃথিবীকে সুস্থ রাখতে কিছু সুঅভ্যাস গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা জরুরি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের প্রভাবে মাটি ও প্রকৃতির ভয়ঙ্কর ক্ষতি তো হচ্ছেই সেইসঙ্গে জমিতে দেওয়া ঐ রাসায়নিক মেশানো খাবার খেয়ে বিভিন্ন অসুখবিসুখ বেড়েই চলেছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাসায়নিক সার বিষের ব্যবহার আর ঘরে ঘরে নানারকম এর ক্যানসার ও বিবিধ মারণরোগ। এই মেলায় পাবেন পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত, সরাসরি কৃষক ও উৎপাদকের থেকে আনা কৃষিজ পণ্য ও খাদ্য। থাকছে সরাসরি উৎপাদক, কৃষক, তাঁতি, মৌপালক ও বিভিন্ন কারিগরদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ, মত বিনিময়ের সুযোগ। থাকছে বিলুপ্তপ্রায় আর্ট ফর্ম পুতুলনাচ প্রদর্শন এবং পুতুল তৈরির কর্মশালা। 

গত বছরের মেলায়

এই মেলায় পাবেন পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত, সরাসরি কৃষক ও উৎপাদকের থেকে আনা কৃষিজ পণ্য ও খাদ্য। থাকছে সরাসরি উৎপাদক, কৃষক, তাঁতি, মৌপালক ও বিভিন্ন কারিগরদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ, মত বিনিময়ের সুযোগ। থাকছে বিলুপ্তপ্রায় পুতুলনাচ প্রদর্শন।

“এই মেলা থেকে সংগ্রহ করা যাবে বাংলার বিলুপ্ত প্রায় নানাধরনের ঢেঁকিছাঁটা সেদ্ধচাল, আতপচাল, সুগন্ধী চাল, লালচাল (Red Rice), সুগন্ধী কালো চাল (Black Rice), জাঁতায় ভাঙা সবরকম ডাল, সামুদ্রিক লবণ, হিমালয়ান রক সল্ট বা পিংক সল্ট, কাঠের ঘানিতে পেষা খাঁটি সরষের তেল, নারকেল তেল, কুসুমবীজের তেল, কালোজিরা তেল, বাদাম তেল, উচ্চমানের গাওয়া ঘি, বিলোনা ঘি। বিভিন্ন ধরনের মিলেটের মধ্যে বাংলার শ্যামা, কাওন থাকছেই। ভিনরাজ্যের মিলেট ও মিলেটের আটা (বাজরা, রাগী ইত্যাদি ) কুট্টু, Whole Buckwheat, আটা, মিলেট কেক, কুকিজ। ভেজাল বিহীন খাঁটি স্বাদের খেজুর গুড় ও পাটালি, উচ্চমানের সব ধরনের ড্রাই ফ্রুটস। বিভিন্ন ধরনের মধুর সম্ভার তো থাকছেই সঙ্গে থাকছে মধু দিয়ে তৈরি  সরবত ও বিন্দুমাত্র চিনি বা গুড় ব্যবহার না করে মধু ও ছানা দিয়ে তৈরী অসামান্য সন্দেশ। প্রাকৃতিক ভাবে উৎপাদিত নানারকম টাটকা শাক সবজি, ঝোলের বড়ি, ভাজা বড়ি, গয়না বড়ি, রাসায়নিক প্রিজারভেটিভ মুক্ত  আচার ও জ্যাম, তালস্বত্ব, নিরাপদ ভাবে উৎপাদিত দেশি হাঁস মুরগীর ডিম।” বলেন, এই মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা-সদস্য মধুছন্দা ভট্টাচার্য।

গত বছরের মেলায়

নামী কর্পোরেট সংস্থার তৈরি দামী সাবান শ্যাম্পু মেখেও চুল পড়া বন্ধ করতে পারি না আমরা। কারন এইসব সুন্দর প্যাকেজিং করা সাবান শ্যাম্পুতে থাকে খুব ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি। আবার এই রাসায়নিক সাবান শ্যাম্পুর ব্যবহারে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের জলাশয়গুলি যেখানে আমাদেরই খাবার জন্য মাছ কাঁকড়া উৎপাদিত হয়৷ এখানে পাবেন হাতে তৈরি প্রাকৃতিক নির্যাস ও সুগন্ধী দিয়ে অত্যন্ত ভালো গুণমানের রাসায়নিকমুক্ত সাবান, শ্যাম্পু, বাসনমাজার, কাপড় কাচার সাবান, প্রাকৃতিক মৌমোম ও বিশুদ্ধ চন্দন, ল্যাভেন্ডার দিয়ে বানানো সুগন্ধি (Solid Perfume), বিভিন্ন রূপচর্চার সামগ্রী।

আজকাল রান্নাঘরে না চাইলেও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পারছি না আমরা। যতটা সম্ভব প্লাস্টিক এড়িয়ে চলাই ভালো। একদল কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়ে প্রকৃতিকে ভালো রাখবে পণ করেছে। তারা মাটি দিয়ে তৈরি করছে সুদৃশ্য থালা বাটি গ্লাস জলের বোতল। প্লাস্টিকের বোতলে জল ভরে ফ্রিজে রাখা আমাদের বদ অভ্যাস তৈরি করেছি আমরাই। একবার মাটির বোতলে জল রেখে খেয়ে দেখুন গরমে কি শান্তির আরাম দেবে। প্লাস্টিকের দাঁত মাজার ব্রাশ নয় বাঁশের তৈরি ব্রাশ, কাঠের  চিরুনি। 

আমরা যে জামাকাপড় পরি তাতেও প্লাস্টিকের মিশেল থাকে, এ বিষয়ে কতজন সচেতন? খুব দামি খাঁটি কটনের কাপড় বড়ো বড়ো শপিং মলে যেগুলো বিক্রি হয় সেগুলো Genetically Modified BT কার্পাস তুলো থেকে তৈরি সুতোয় বোনা। এই মেলায় পাবেন জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত দেশী কার্পাস তুলো থেকে তৈরি কাপড়। থাকছে হেম্প/গাঁজা গাছ থেকে তৈরি তন্তুর ফেব্রিক, তোয়ালে, পোশাক, রাসায়নিক নয় প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো (Natural Dye) ইকো প্রিন্টের পোষাকআশাক। পুরোনো জামা কাপড় ফেলে না দিয়ে তা দিয়ে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য নানারকম জিনিস। আর থাকছে বিকল্প যাপনের প্রচুর বই এর সম্ভার। থাকছে বিভিন্ন দেশি সবজি বীজ ও গাছের সম্ভার। 

এই মেলা আসলে এক লড়াই। কর্পোরেটের বিরুদ্ধে লড়াই। হাইব্রিড GMO বীজের বিরুদ্ধে লড়াই। রাসায়নিক সার কীটনাশকের বিরুদ্ধে লড়াই। মাটির নীচের সঞ্চিত সুপেয় জল বাঁচানোর লড়াই। প্রকৃতিকে যা ধ্বংস করছে তার বিরুদ্ধে লড়াই। প্রাকৃতিক যাপনের সঙ্গী হতে নিরাপদ জীবনে বাঁচতে এবারের “মাঠ থেকে রান্নাঘর” মেলার আয়োজন এই ঠিকানায়- 

বাঁশদ্রোনী শ্রীসংঘ ক্লাব প্রাঙ্গণ
১৩, আদিগঙ্গা রোড 
বাঁশদ্রোনী
কোলকাতা 700070
১৬ এবং ১৭ই ডিসেম্বর  বিকেল চারটে থেকে রাত নটা।

 

Post Tags
Developed by DXDasia