হস্তচালিত তাঁতশিল্প দিবস ও দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে হয়ে গেল বিশেষ প্রদর্শনীটি
অনেকেই হয়তো জানি না, কলকাতার বাজার থেকে আমরা যে জামাকাপড় কিনি, তার প্রায় ৯০ শতাংশ যন্ত্রচালিত (Powerloom) তাঁত, সিন্থেটিক সুতো দিয়ে তৈরি। অনেকেই জানি না তাঁতিদের পাইকারি হাটে, বিভিন্ন নামী বুটিকে হ্যান্ডলুম/খাদি বলে বিক্রি হয় পলিয়েস্টার মেশানো সুতোয়, মেশিনে বোনা কাপড়। খালি চোখে দেখে বোঝার উপায় থাকে না, কোনটা আসল/নকল। ‘দেশভাগের ৭৬ বছর পরেও দুই বাংলাকে জুড়ে রেখেছে টাঙ্গাইল-তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য’ শীর্ষক লেখার জন্য সম্প্রতি কথা বলেছিলাম ফুলিয়ার প্রবীণ তাঁতশিল্প সমবায় কর্মী ও লেখক হরিপদ বসাকের সঙ্গে। যে সময় কথা হচ্ছিল, তখন তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সেরে ফিরছিলেন—কীভাবে হস্তচালিত তাঁতকে বাঁচানো যাবে। শান্তিপুর, ফুলিয়া সহ বছরভোর বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁরা এই নিয়ে সভা-আলোচনার আয়োজন করে চলেছেন নিজেদের সাধ্য মতো। যে কথা তিনি বারবার বলছিলেন, তা হল হাতের তাঁতের ভুত-ভবিষৎ-বর্তমান বুঝতে গেলে তাঁতশিল্পীদের কাছে পৌঁছতে হবে, কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করতে হবে যাবতীয় প্রক্রিয়া। হরিপদবাবুর কথা মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া গেল কলকাতায় বসেই। সুযোগ করে দিল নেচারমেটস, পাথরপ্রতিমা রানার্স, মধুবন স্বনির্ভর মৌপালক গোষ্ঠী, পৌষ্টিক লাইফ, ভূমিকা এবং মহাত্মা গান্ধী গ্রামোদ্যোগ সেবা সংস্থান ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ‘মাঠ থেকে রান্নাঘর’। ৫ এবং ৬ ই অগাস্ট ‘মাঠ থেকে রান্নাঘর’ যাদবপুরের বিজয়গড় কলেজ প্রাঙ্গনে সংগঠিত করেছিল অভিনব হ্যান্ডলুম মেলা—“অঙ্গসাজ”। অভিনব এই মেলা আর পাঁচটা মেলার মত প্রদর্শন আর বিকিকিনির মেলা নয়। প্রাকৃতিক বা অর্গানিক বস্ত্র – অর্গানিক খাবার ইত্যাদি নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার যৌথ প্ল্যাটফর্ম, যৌথ প্রয়াস।

তাঁতিদের দ্বারা চরকা, তাঁত প্রদর্শন
শুধু পণ্য বিক্রি নয়, মেলার দুদিনই ছিল সচেতনতামূলক আলোচনা। মেলার শেষদিন বক্তব্য রাখছিলেন বাঁকুড়ার তাঁতিবন্ধু মিঠুন হেঁস। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, ‘পলিয়েস্টার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে আমাদের’। তিনি এবং তাঁর মা, শ্যামা হেঁস উপস্থিত ছিলেন তাঁদের সিল্ক-শাড়ির সম্ভার নিয়ে। মা সুতো তৈরি করেন, ছেলে তাঁত বোনেন। তাঁত বোনে মিঠুনবাবুর ভাই, মাসীর ছেলেরাও। এছাড়া অন্যান্য তাঁতিও আছেন। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে এই পরিবার এমনভাবে কাজ করে চলেছেন। অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, আসল হ্যান্ডলুম শাড়ির অনেক দাম, সাধারণের সাধ্যাতীত। ‘মাঠ থেকে রান্নাঘর’-এর আয়োজকদেরও এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। আয়োজকদের অন্যতম নীলাঞ্জন মিশ্র থেকে শুরু করে তাঁত-গবেষক হরিপদ বসাক এ ব্যাপারে বলেছেন, সুতো বানিয়ে যে শাড়িটা বুনতে সময় লাগে ৩৯-৪০ দিন। যে শাড়িটার দাম ৮,০০০ টাকা। হিসেব করে দেখলে দিনপিছু তাহলে ২০০ টাকা করে। প্রথমে যখন আমরা দাম শুনি, মনে হয় একটা শাড়ির এত দাম হতে পারে? কিন্তু কখনও কি উৎপাদককে জিজ্ঞেস করি এই শাড়ি কতদিন ধরে কেমন শ্রম করে বানাতে হয়? এটা আমরা খাওয়া বা পরা কোনো ক্ষেত্রেই করি না কারণ উৎপাদকদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মূলত টাকা দিয়ে বেচাকেনার। তাঁদের জীবনের শরিক হওয়া, তাঁদের বিপন্নতার কথা অন্তত একটু শোনা, আমাদের হয় না। সবসময় মাঝখানে মহাজন থাকে, কোনো বড়ো বিপণন সংস্থার সঙ্গে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চাইলেই পারা যায় না। তখন বলা হয়, জিনিস দিয়ে যাও কিন্তু ধারে দিয়ে যেতে হবে। এছাড়া সস্তায় নকল জিনিস ছেড়ে দাম দিয়ে খাঁটি জিনিস কিনতে চায় না কেউই, সচেতনার অভাব বলেই এই বিপত্তি। বাজার না তৈরি হলে দাম কমবে কী করে?

মিঠুন হেঁস ও তাঁর মা
মেলার আয়োজক ও মিঠুন হেঁস-রা এই উদ্যোগকে একটা আন্দোলন হিসেবেই দেখছেন। বিক্রি না হলেও মানুষের কাছে বিকল্প চিন্তাধারা, প্রাকৃতিক ভাবে জীবনযাপনের উপায় পৌঁছে দিতে চাইছেন তাঁরা। এতে পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে উপকৃত হবে মানবসমাজ। দড়ি, দ্য বন্ড-এর ন্যাচারাল ডাই এবং হস্তচালিত তাঁতে বোনা খাদি এবং সিল্কের কাপড়ের সম্ভার নিয়ে শান্তিনিকেতন থেকে এই উদ্যোগে সামিল হয়েছিলেন পারমিতা ভট্টাচার্য। বর্ধমানের কেতুগ্রামের তাঁত, বীরভূমের তাঁতিপাড়া, পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর, বিষ্ণুপুরের তসর-সিল্ক কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেন। আয়োজকরা তো এই প্রদর্শনীকে আন্দোলনের একটা অংশ হিসেবেই দেখছেন, আপনিও কী তাই? “অবশ্যই। খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে আমি চেষ্টা করি যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক, বিষমুক্ত খাবার খেতে। তাহলে, পোশাকের ক্ষেত্রে কেন তা অনুসরণ করবো না! পাওয়ারলুম বা পলিয়েস্টার সুতোয় বানানো পোশাক থেকে বিভিন্ন ত্বকের রোগ, এমনকী ক্যানসার পর্যন্ত হয়।”

পারমিতা ভট্টাচার্য
এই আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার হিসাবে এই মেলায় ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিবেশ বান্ধব সর্বোচ্চ শক্তিশালী ন্যাচারালি অর্গানিক, হেম্প বা গাঁজা গাছের ফাইবার থেকে প্রস্তুত ইয়ার্ন দিয়ে বাংলার মহিলা তাঁতিদের হাতে বোনা হেম্প-ফ্যাব্রিক এবং তা থেকে প্রস্তুত রেডিমেড গার্মেন্টস। “আমরা এই বাংলার প্রথম উৎপাদক, যারা গাঁজা গাছের ফাইবার, তার ইয়ার্ন তাকে বাংলার তাঁতে বুনে কমার্শিয়ালাইজ করার চেষ্টা করছে। আগামি ২০ বছরের মধ্যে হেম্প তার অসম্ভব গুনাবলী এবং বৈচিত্র্য’র কারনে টেক্সটাইল থেকে প্লাস্টিক, মেডিসিন থেকে পেপারের দুনিয়ায় মেজর স্টেক হোল্ডার হয়ে দাঁড়াবে।” বলছিলেন ‘হেম্প ফাইবার ফেব্রিকস’-এর দেবব্রত চক্রবর্তী।

হেম্প বা গাঁজা গাছের ফাইবার থেকে প্রস্তুত ইয়ার্ন দিয়ে বাংলার মহিলা তাঁতিদের হাতে বোনা হেম্প-ফ্যাব্রিক সামগ্রী দেখাচ্ছেন দেবব্রত চক্রবর্তী
পোশাক ছাড়াও মেলায় ছিল পরিবেশ সচেতনতা মূলক বইয়ের স্টল, খাবারের স্টল, দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী। “আমরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রচুর কথা বলছি, কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে কী করতে হবে তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমরা পুরোনো কাপড় এমনকী সরাসরি প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে আমরা বাজারের ব্যাগ, ফ্যাশনেবল ব্যাগ, ওয়াল হ্যাংগিং, স্কার্ফ, পোশাক ইত্যাদি দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারের সামগ্রী বানাচ্ছি।” বলছিলেন মেলায় অংশ নেওয়া জোকা’র জীবিকা ডেভলপমেন্ট সোসাইটির এক সদস্য।

রিসাইকেল্ড সামগ্রী
তাঁত প্রদর্শনী, তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলা, জৈব তুলো, হাতে বোনা কাপড়, রিসাইকেল্ড কাপড়, গাঁজা গাছ থেকে কাপড় সঙ্গে মধুর মিষ্টি, তালের বড়া, চপ-পেঁয়াজি (সবই জৈব) –সবকিছু নিয়ে এই অন্ধকার সময়ে কর্পোরেটমুখী একচেটিয়া আগ্রাসনের বিপরীতে দাঁড়ানো, পৃথিবীর জন্য স্বস্তি খোঁজার ছোট্ট প্রচেষ্টা—“অঙ্গসাজ” নিয়ে ভাববার আছে বৈকি! নিজে ভাবুন, অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিন।