ঢাকা গ্রন্থমেলায় বিশাল আকারে সেজে উঠেছে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর
‘লিটল ম্যাগাজিন’ অর্থাৎ সাহিত্য পত্রিকা বা সাহিত্যের ছোটো কাগজ হল শিল্প-সাহিত্যের আঁতুরঘর। কেননা, প্রায় সব সাহিত্যিকেরই সাহিত্য জীবনের প্রকাশ শুরু হয় এই ছোটো কাগজে লিখে। ‘ছোটো কাগজ বলে এর বিস্তৃতিকে সংকীর্ণ করে দেখার কোনো সুযোগ নেই৷ যুগে যুগে এই ‘ছোটো কাগজ’ তার সমকালকে উদ্ভাবনীশক্তি দ্বারা আবিষ্কার করেছে। সমকালীন মানুষের চিন্তা, ভাষা, কাজ, সামাজিকতা-সহ রাজনৈতিক সম্পর্ককে তুলে এনেছে জলের মতো স্বচ্ছ ক্যানভাসে। কথা বলেছে প্রত্যেক সময়ের সংকট সমাধানের লক্ষ্যে। সাহিত্যের ধারায় এনেছে বাঁকবদল।
লিটল ম্যাগাজিনের গোড়াপত্তন করেন রালফ ওয়াল্ডো ও মার্গারেট ফুলার, তাঁদের সম্পাদিত ‘দি ডায়াল’-এর মাধ্যমে। এরপর প্রকাশিত হয় ‘সেভয়’। ভিক্টোরিয়ান পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ‘সেভয়’ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী এক জোড়ালো কণ্ঠ। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এজরা পাউন্ড ও হেরিয়েট মনরো সম্পাদিত ‘পোয়েট্রি’ তখনকার সময়ে খুব প্রমিনেন্ট হয়ে ওঠে। ফলে, বিভিন্ন সময়ের প্রয়োজনে লিটল ম্যাগাজিন এই বঙ্গদেশেও তার প্রতিকৃতি খুঁজে পায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদর্শন’ বাংলার প্রথম (এই নিয়ে বিতর্ক আছে যদিও) লিটল ম্যাগাজিন হলেও মননশীল সাহিত্য ও তখনকার সময়ে বিকাশমান গদ্যের ধারা নিয়ে প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) এই বাংলায় বেশ খ্যাতি অর্জন করে। এরপর ‘কল্লোল’ (১৯২৩), ‘সওগাত’ (১৯২৬), ‘শিখা’ (১৯২৭), ‘কালি ও কলম’ (১৯২৭), ‘প্রগতি’ (১৯২৭), ‘পরিচয়’ (১৯৩১), ‘পূর্বাশা’ (১৯৩২), ‘কবিতা’ (১৯৩৫), ‘চতুরঙ্গ’ (১৯৩৮), ‘শনিবারের চিঠি’ (১৯২৪) ইত্যাদি পত্রিকা লিটল ম্যাগাজিনের জোয়ারকে ধারাবাহিকভাবে সচ্ছল রাখে।
একুশে গ্রন্থমেলা চত্বর ২০২০। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ান। ঢাকা।
এই ধারাবাহিকতায় ’৪৭, ’৫২ এবং ’৭১-এ আরও অনেক লিটল ম্যাগাজিন সময়ের প্রয়োজনে আওয়াজ তুলেছে। ষাটের দশকে বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ‘সপ্তক’ (১৯৬২), ‘বক্তব্য’ (১৯৬৩), ‘স্বাক্ষর’ (১৯৬৩), ‘স্যাড জেনারেশন’ (১৯৬৩), ‘যুগপৎ’ (১৯৬৩), ‘সাম্প্রতিক’ (১৯৬৪), ‘কালবেলা’ (১৯৬৫), ‘কণ্ঠস্বর’ (১৯৬৫)। ধারাবাহিকতার সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিন তার ব্যাপ্তি ও প্রসারের মাধ্যমে সাহিত্যের অঙ্গনে রাখতে শুরু করে অগ্রণী ভূমিকা। তবে পূর্বে লিটল ম্যাগাজিনের স্রোতধারা বেগবান হলেও আশির দশকের পরে আদর্শগত রাজনীতির পালাবদলের কারণে কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন
বিপ্লবের আরেক নাম শাহবাগ
বর্তমানে বাংলাদেশের সমকালীন ‘সাহিত্যের ছোটো কাগজ’গুলোর মধ্যে, ‘ফেস্টুন’, ‘শঙ্খচিল’, ‘ভিন্নচোখ’, ‘কবিতাপত্র’, ‘লিরিক’, ‘চন্দ্রবিন্দু’, ‘চার্বাক’-সহ আরও অনেক লিটলম্যাগাজিন সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা গ্রন্থমেলায় বিশাল আকারে সেজে ওঠে লিটল ম্যাগাজিনের চত্বর। সেখানে গান-বাজনা, লেখক-সাহিত্যিকের আড্ডা, কথায় জমে ওঠে চারপাশ। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে দুই বাংলার সাহিত্যিক-কবি-সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর নাম। ‘দেশ’ পত্রিকার ১৯৫৩ সালের মে সংখ্যায় ‘সাহিত্যপত্র’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেনঃ
“এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই- যদি না কোনো সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাতে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে চেয়ে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি- জল, পোকা, আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্য। যেসব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়- কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে; চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।”
একুশে গ্রন্থমেলা চত্বর ২০২০। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়ান। ঢাকা।
একুশে বইমেলা ঘিরে ঢাকার বাংলা আকাদেমি চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন প্রেমীদের যে ভিড় ও উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়, তা রীতিমতো চোখে পড়ার মতো। এতে বোঝা যায় লিটল ম্যাগাজিন এই একবিংশ শতাব্দীতেও মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। ব্যাকরণবিহীন এবং চেনা ছকের বাইরে হাঁটাই ছোটো কাগজের ধর্ম। সিস্টেম বা প্রতিষ্ঠানকে বারবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে ছোটো পত্রিকা। তা স্বাধীন বাংলাদেশেরই হোক বা পশ্চিমবঙ্গের। আসলে দুই বাংলা এক ও অদ্বিতীয়। সামান্য কাঁটাতার যেমন বাঙালিদের আলাদা করতে পারেনি, তেমনি সাহিত্য তরী নিয়ে লিটল ম্যাগাজিনগুলির চরিত্রও এক রয়ে গেছে। আসলে যেকোনো শিল্প ও সাহিত্যের বিভাজন হয় না। বেঁধে বেঁধে থাকাই লিটল ম্যাগাজিনের ধর্ম, লিটল ম্যাগাজিনের নিয়তি।
ছবি- হাসনাত শোয়েব