‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র মাঠে আজও উজ্জ্বল মুখ হুমায়ূন আহমেদ, মিসির আলীরা

ঢাকা বইমেলার ডায়েরি, লিখছেন বাংলাদেশের পীয়্যান মুগ্ধ নবী

শাহবাগ থেকে যে রাস্তাটা টিএসসির দিকে এগিয়ে গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে ভিড়টা যেন একটু বেশিই হয়। সকলের গন্তব্য তখন টিএসসি ছাড়িয়ে আরও খানিকটা দক্ষিণে বাংলা একাডেমির দিকে। সেখানে মেলা বসেছে, বইমেলা। পোশাকি নাম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’! ওই যে সেই বাহান্ন সালের একুশ তারিখ কতগুলো মানুষ মরে গেল শুধুমাত্র মায়ের ভাষায় কথা বলতে চেয়ে, তাঁদের স্মরণেই নামটা রাখা। বাংলা একাডেমিতে অবশ্য আর আগের মতো করে মেলা বসে না। গত কয়েক বছর ধরে উল্টোদিকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটাই সত্যিকারের মেলা। এবারেও তাই। তবে এ বছর মেলাটা অনেক বড়ো, বিস্তৃত। হাঁটা-চলার জায়গাটাও অনেক বেশি।

উদ্যানের মাঝামাঝি স্বাধীনতা জাদুঘরের সঙ্গে যে লেকমতন জলাশয়, সেটিকেও মেলার ভিতর নিয়ে আসায় আড্ডা দেওয়ার জায়গাও এবার কম না। উদ্যানে, অর্থাৎ মেলায় ঢুকতেই চোখ ঝলমল করে ওঠে। শুরুর দিকে স্টলগুলো কিছুটা বিবর্ণ হলেও বাঁ দিকে তাকালেই বড়ো বড়ো সব প্যাভিলিয়ন। এর মাঝে চোখে পড়ে যাবে হ্যাট পরা হুমায়ূন আহমেদকে, দাঁড়িয়ে আছেন অন্যপ্রকাশের মাথার উপর। কেউ হয়তো ভাবে, এরা যে আর কতদিন হুমায়ূন নিয়েই কাটাবে! অন্য কারো ভাবনায় কেবলই মুগ্ধতা! অন্যপ্রকাশের কাছাকাছি গেলে এই বিশ সালে এসেও শোনা যায় কেউ ‘হিমু সমগ্র’ চাইছে তো কেউ ‘মিসির আলী’। সারি বেঁধে অনেকগুলো বড়ো বড়ো প্যাভিলিয়ন। ঐতিহ্য, কথাপ্রকাশ, প্রথমা, পাঠক সমাবেশ, মাওলা ব্রাদার্স, সময়, অনন্যা… এরা সব বড়ো বড়ো প্রকাশনী। মাওলা ব্রাদার্সে গেলে হয়তো শোনা যায়, কেউ খোঁজ করছে শাহাদুজ্জামানের নতুন কোনো বই এল কিনা। নতুন বই না পেয়ে পুরোনোই দু-চারটে হয়তো কিনে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠতি চিন্তক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় ছফার বই খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে। এই শিক্ষার্থীর মতো অগণিত তরুণ-তরুণী ঘুরে বেড়াচ্ছে মেলাজুড়ে। একলা, দুজনে কিংবা দলবেঁধে, এরাই মেলাটার প্রাণ।

অন্যপ্রকাশ 

টিভি ক্যামেরা কিংবা অন্য কারো চোখ ফাঁকি দিয়ে সন্তপর্ণে প্রেমিক জুটি হেঁটে বেড়ায় স্টল থেকে স্টলে। এদের হাসি আর হুল্লোড়েই মেলা বেঁচে থাকে রাত নয়টা অব্দি। ভিড়টা যেন ফিকশনেই বেশি, ঠিক করে বললে উপন্যাসের দিকে। গল্পটাও কেউ কেউ পড়ে। কিন্তু কবিতা কি আর অত বিক্রি হয় আজকাল? প্রকাশকদের দেখা পাওয়া যায় এক কোণায় অঘোষিত স্মোকিং জোনে। প্রতিষ্ঠিত কিংবা উঠতি লেখক কবিদের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন দুরন্ত আলোচনা। নতুন প্রকাশকের কপালে আবার চিন্তার ভাঁজ, আজকে কটা কপি বিক্রি হল! এদিক সেদিক হুট করে একটা দল দাঁড়িয়ে পড়ে গ্রুপ ফটো তোলবার জন্য। অন্যদিকে বিভিন্ন স্টলে ‘ফেসবুক সেলিব্রেটি’দের প্রকাশিত বই নিয়েও ভিড়। ঠিকটাক সেলফিটা তোলার দিকেই যেন বেশি মনোযোগ। স্রোতের বিপরীতে যেতে চাওয়া কিংবা স্রোতের মাঝেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া মানুষেরা নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করে যান। চোখে পড়ে সুন্দর কমলা প্রচ্ছদে হাসনাত শোয়েবের বই ‘বিষাদের মা কান্তারা’। না গল্প, না কবিতা, না উপন্যাস! শোয়েব নিজেই ঠিক করে বলতে চান না, এগুলো নাকি পাঠকের স্বাধীনতা। পাশেই দেখা যায় মইন উদ্দিনের ‘রসুন চাষের ঘটনাবলী’! অদ্ভুতুড়ে উপন্যাস! ছোটো একটা স্টলে দেখা যায় মামুন হুসাইনের ‘নেক্রোপলিস’, সেলিম মোরশেদের ‘সাপলুডু’। কাজল শাহনেওয়াজের নতুন কবিতার বইও এই উড়কি থেকেই বেরিয়েছে। চমৎকার সব প্রচ্ছদ, দুর্দান্ত বাঁধাই! স্মার্ট বই! কিন্তু দামটা একটু বেশিই। শোনা গেল, পপ (নাকি রক!) গুরু আজম খানকে নিয়ে ব্যান্ড লিজেন্ড মাকসুদের বই এসেছে। একই মলাটে ইংরেজি আর বাংলায়! ব্যান্ডের কথা ভাবতে ভাবতেই আচমকা দেখতে পাই সুদর্শন এক ভদ্রলোক অটোগ্রাফ দিচ্ছেন! আরে, এ যে লতিফুল ইসলাম শিবলি! জেমসের কন্ঠে তার অসংখ্য অসাধারণ সব কবিতা গান হয়ে মানুষের মুখয়ে মুখে ফিরেছে। শিবলির নতুন বই এসেছে এবারের মেলায়। দুই তরুণকে দেখা গেল, শহিদুল জহিরের মতন নতুন কাউকে আবিষ্কারের তাড়া নিয়ে এ স্টল থেকে ও স্টলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাঁরাই জানায়, মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার সংকলন এসেছে ফের, সম্পাদনায় আহমদ মোস্তফা কামাল। মাহমুদুল হক নিয়ে ওর চেয়ে বেশি জানেই বা আর কে?

আওয়ামী যুবলীগ 

কবিদের কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে পাঠকের হাতে যাবার আশায়। প্রায়শই দেখা হয়ে যায় কবি হাসান রোবায়েতের সঙ্গে। নতুন বই কবে আসছে? শুনে তিনি স্মিতহাস্যে জানান, এই যে এল বলে! কবিতার আকালেও নাকি ভেটেরান কবি (লিরিসিস্টও বটে) মারজুক রাসেলের বই প্রকাশের পরই একের পর এক সংস্করণের সম্মুখীন! সাদাত হোসাইনের উপন্যাসও নাকি গত কয়েকবারের মতো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। এবারও তাঁর তিনটি বই চলে এসেছে মেলায়। রমনা কালী মন্দিরের সীমানা ঘেঁষে যে অংশটা, সেখানে অবশ্য আমার বয়সী কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ওটা তো বাচ্চাদের এলাকা, সিসিমপুর। সেদিকে রঙের বাহার। প্রাণের মেলা সবচাইতে বেশি প্রাণবন্ত তো ওখানটাতেই। সীমিত আয়ের বাবা-মা হয়তো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন বাচ্চার পছন্দের বইগুলো কিনে দিতে। কিন্তু কে জানে, ওদিকটাতেই হয়তো আরও একটা বই কিনতে না পেরে ছলছল চোখে মেলা থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের ইলিয়াস কিংবা জহির। মাইকে তখন জানানো হচ্ছে এদিনে মেলায় মোট কতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে। সেটা শুনতে শুনতে মেলা থেকে বেড়িয়ে সেই একই রাস্তা। তবে মেট্রোরেলের ছোবলে এদিকটা বদলে গেছে অনেকটাই।

তাম্রলিপি

পুরোনো দিনের মতো সেখানে আর সস্তা প্রিন্টের পাইরেটেড বই বিছিয়ে বসে থাকে না কেউ। ভাজাপোড়ার দোকানগুলোও কী করে যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে এতদিনে। তবু ফিরতি পথে অনেককেই টিএসসি হয়ে যেতে হয়। এক কাপ চা, একটা সিগারেট, আর এর ওর কেনা বই দেখা, মিলিয়ে নেওয়া! টুকটাক প্রিভিউ-রিভিউ! আর একেবারে শেষে ফিরতি বাস বা রিকশায় বসেই নতুন একটা বই মেলে ধরা চোখের সামনে… তরতর করে চোখ এঁকেবেঁকে যায় বইয়ের পাতায়। ফেব্রুয়ারির রাতগুলোতে আমাদের বই পড়ার তাড়াটা একটু বেশিই থাকে যেন!

Developed by DXDasia