জায়গাটি এককালে প্রাচীন রাঢ়দেশের অংশ ছিল
প্রত্ন নিদর্শন, নামোসলদা
বাঁকুড়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে মূল্যবান সব প্রত্ন-নিদর্শন। বাঁকুড়ায় জয়পুরের কাছেই সলদা বা নামোসলদা গ্রামে মাটির নিচ থেকে একাধিক আদি মধ্যযুগের পাথরের মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। অতীতে জায়গাটি সুপ্রসিদ্ধ একটি জনপদ ছিল। যা প্রাচীন রাঢ়দেশের অংশ। গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর স্বয়ং রাঢ় সংলগ্ন অরণ্যভূমিতে এসেছিলেন। বৌদ্ধ শ্রমণদের কাহিনিতে রাঢ়-অধিবাসীদের বর্ণনা পাওয়া যায়। ‘আচারঙ্গসূত্র’ ও ‘তেলপত্ত জাতকে’ এখানকার সমন্ধে বিভিন্ন কথা লিপিবদ্ধ করা আছে।

নামোসলদা গ্রাম, বাঁকুড়া
অতীতে জায়গাটি সুপ্রসিদ্ধ একটি জনপদ ছিল। যা প্রাচীন রাঢ়দেশের অংশ। গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীর স্বয়ং রাঢ় সংলগ্ন অরণ্যভূমিতে এসেছিলেন। বৌদ্ধ শ্রমণদের কাহিনিতে রাঢ়-অধিবাসীদের বর্ণনা পাওয়া যায়।
প্রত্ন গবেষকরা দাবী করেন, দ্বারকেশ্বর নদের অববাহিকা বহু প্রাচীন। অতীতে নদীর তীরে বহু প্রাচীন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত জৈন ধর্মাবলম্বী বহু ব্যবসায়ীরা দ্বারকেশ্বর নদ ধরে বানিজ্য করতেন। একাধিক জৈন ধর্মের দেউল নদীর পাড় ধরে নির্মাণ হয়। যার নিদর্শন আজও খুঁজে পাওয়া যায়। বহু হিন্দু ধর্মের দেবদেউল গড়ে ওঠে নদীর তীর ধরে। নদীর ধার থেকে বিভিন্ন সময়ে বালির নিচে প্রাচীন সব হিন্দু ও জৈন ধর্মের মূর্তি পাওয়া যায়।
নামোসলদায় একসময়ে এখানে অনেকগুলো দেব-দেবীর মন্দির গড়ে উঠেছিল। তখন গ্রামগুলো সামন্ত রাজাদের অধীনে ছিল। নামোসলদা গ্রামে আজও সামন্তপাড়া নামে একটি জায়গা আছে। মল্ল রাজাদের সঙ্গেও সামন্ত রাজাদের মাঝেমধ্যে বিবাদ হতো। বিশেষত, ১২০৩ থেকে ১২০৪-এর মধ্যে তুর্কি আক্রমণে এখানকার একাধিক মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রত্ন নিদর্শন, নামোসলদা
নামোসলদায় পুকুর খননের সময় উদ্ধার হয়েছে বহু প্রাচীন সব নিদর্শন। একাদশ ও দ্বাদশ শতকের সব প্রস্তর মূর্তি স্থানীয় অঞ্চল থেকে পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও প্রাচীন অষ্টমাতৃকাগণের বারাহী ও দ্বিভূজা কালিকা মূর্তি স্থানীয় একটি মন্দিরে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ের মূর্তি ও নানারকম নিদর্শন নামোসলদা গ্রামে ছড়িয়ে আছে। পুরাণের অন্তর্গত বারাহী দেবীর মূর্তিটি সুবিশাল। সপ্তমাতৃকার এক দেবী বারাহী। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে যিনি ধারণ করেন। আর পাশে আছে দ্বিভূজা কালিকা প্রস্তর মূর্তি। ১৯৮৬-১৯৮৭ সালের মধ্যে এই দুইটি মূর্তি পাওয়া যায়। লেখক ও গবেষক অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বইয়ে লিখেছেন এই গ্রামের ডোমদীঘির ঢিবি খোঁড়াখুঁড়ি করলে বহু প্রত্নবস্তু পাওয়া যাবে।
সপ্তমাতৃকার এক দেবী বারাহী। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে যিনি ধারণ করেন। আর পাশে আছে দ্বিভূজা কালিকা প্রস্তর মূর্তি। ১৯৮৬-১৯৮৭ সালের মধ্যে এই দুইটি মূর্তি পাওয়া যায়। লেখক ও গবেষক অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বইয়ে লিখেছেন এই গ্রামের ডোমদীঘির ঢিবি খোঁড়াখুঁড়ি করলে বহু প্রত্নবস্তু পাওয়া যাবে।

বারাহী ও কালিকা মূর্তি
এই মূর্তি দুইটি দেখে ঠিক তার উল্টো পথ ধরে খানিকটা এগোলে পাওয়া যাবে গোকুলনগরের কাছে গ্রামে গন্ধেশ্বর শিব ঠাকুরের মন্দির। নামোসলদা গ্রামে বহু পুরনো গাছপালা দ্বারা আচ্ছাদিত জায়গাটি। চারপাশে গাছের নিচে মানতের উদ্দেশ্যে রাখা মাটির ঘোড়া ও হাতির মূর্তি। বলা হয় যে, এটি বাংলার সর্ববৃহৎ এক শিবলিঙ্গ। একাদশ দ্বাদশ শতকের এই শিবলিঙ্গ। কাছেই আছে আর এক বৃহৎ শিবলিঙ্গ। যার নাম ভুবনেশ্বর। গ্রামে এই দুই মন্দিরের বিশাল শিবলিঙ্গ অত্যন্ত জাগ্রত।
শোনা যায়, বর্গিদের আক্রমণে মূল মন্দিরগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় নতুন মন্দির নির্মিত হয়। বিশাল শিবলিঙ্গ দু’টি সেখানেই স্থাপন করা হয়। দুইটি মন্দির নিয়ে অনেক প্রচলিত লোকবিশ্বাস সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে আছে। মন্দিরের আশেপাশে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে, যা ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গন্ধেশ্বর শিব ঠাকুরের মন্দির
প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন নিদর্শন সলদা বা নামোসলদায় নতুন করে উদঘাটিত হতে পারে। পুরোপুরি উন্মোচিত হলে প্রাচীন সমাজের জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, জ্ঞান ও নানা অজানা অধ্যায় জানা সম্ভব।
________________
তথ্য ঋণ: অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, ডেভিড ম্যাককাচিয়ন, স্থানীয় সূত্র