শতাধিক বছর ধরে বিকনার সব ক’টি পরিবার ডোকরাকে পৌঁছে দিচ্ছে বিশ্বের দরবারে

ডোকরার সূক্ষ্ম জালের কাজ বিকনা গ্রামকে বিখ্যাত করেছে

ডোকরা শিল্পের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। আমাদের বাংলাতেও রয়েছে ডোকরা শিল্পের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। বাঁকুড়া জেলায় মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুরের কাছে বিকনা সারা রাজ্যে ডোকরা গ্রাম নামে পরিচিত। আরও একটি বিখ্যাত ডোকরা গ্রামের কথা প্রায়ই উঠে আসে, যার নাম দরিয়াপুর। তবে বিকনার বিশেষত্ব হল জাল বা নেটের সূক্ষ্ম কাজ, যেটা দরিয়াপুরে বিরল।

চল্লিশের বেশি পরিবার বিকনা গ্রামে বাস করে। সব ক’টি পরিবারেই ডোকরা শিল্পের চর্চা রয়েছে। ঠিক কবে যে এই গ্রামে ডোকরার কাজ শুরু হয়েছিল, তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। তবে একটা মত প্রচলিত আছে যে ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামের বাসিন্দারা ডোকরা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত ডোকরা শিল্পের নিদর্শন, যেমন, হাতি, ঘোড়া, দেবদেবীর মূর্তি বানানো তে যেমন এখানকার শিল্পীরা দক্ষ, একই ভাবে এখনকার ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গয়না, অ্যাশট্রে, ঘর সাজানোর জিনিসপত্রও খুব সাবলীলভাবে এঁরা তৈরি করে থাকেন। 

বিকনার ডোকরা শিল্পের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে। এখানকার বেশ কিছু মানুষ তাঁদের সৃজনশীলতার জন্য জাতীয় এবং রাজ্যস্তরের নানা সম্মাননা লাভ করেছেন। প্রয়াত ডোকরা শিল্পী যুদ্ধ কর্মকার ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি এই গ্রামের গর্ব।

 

 

ডোকরার কাজ হয় এক জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি অনুসরণ করে। মোমের ওপর নকশা তুলে বালি এবং মাটির আস্তরণ দেওয়া হয়।। প্রথমে লোনা মাটি, তারপর লোটা মাটির স্তর থাকে। এবার পিতল গলিয়ে সেটি একটা ফুটো দিয়ে ঢেলে দেওয়া হয় মাটির ছাঁচে। সবার শেষে মাটির ছাঁচটিকে বিশেষ পদ্ধতিতে ভেঙে দিয়ে পিতলের শিল্পবস্তুটি বের করে আনা হয়। গ্রামের পুরুষ ও মেয়েরা হাতে হাত লাগিয়ে ডোকরা শিল্পে অংশ নেন।

বিকনার ডোকরা শিল্পের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশে-বিদেশে। এখানকার বেশ কিছু মানুষ তাঁদের সৃজনশীলতার জন্য জাতীয় এবং রাজ্যস্তরের নানা সম্মাননা লাভ করেছেন। প্রয়াত ডোকরা শিল্পী যুদ্ধ কর্মকার ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি এই গ্রামের গর্ব।

ডোকরার কাজে যে পিতল আর কয়লা দরকার, তা নিয়ে মাঝখানে অনেকটাই সমস্যায় পড়েছিলেন বিকনার শিল্পীরা। এগুলোর দাম যেভাবে বাড়ছে, যেই অনুযায়ী তাঁরা শিল্পসামগ্রী বিক্রি করে লাভ পাচ্ছিলেন না। মূলধনের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হত তাঁদের। ব্যাংক ঋণ দিতে চাইত না। বাধ্য হয়ে মহাজনদের থেকে কড়া সুদে টাকা ধার নিতে হত। সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছিল এখানকার বাসিন্দাদের। এখন রাজ্য সরকার তাঁদের আর্থিক সাহায্য করে, বিপুল পরিমাণে কাজের বরাতও দেয়। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে ওয়ার্কশপ, দোকান, গেস্টহাউজও গড়ে উঠেছে। এতে লাভবান হয়েছেন বিকনার শিল্পীরা। আগে কয়লার ভাটিতে পিতল গলানো হত। তাতে বিপুল ক্ষতি হত পরিবেশের। শিল্পীরাও অসুস্থ হয়ে পড়তেন। এখন বিকনা গ্রামে পিতল গলানোর কাজে ইলেকট্রিক চুল্লির ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা পরিবেশ-বান্ধব। বহু যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়েছে এই নতুন ইলেকট্রিক চুল্লির মাধ্যমে। 
 

Developed by DXDasia