৩৫ বছর পর সেলুলয়েডে আবার রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’

অপর্ণা সেনের ‘ঘরে বাইরে আজ’ মুক্তি পাচ্ছে আগামী ১৫ নভেম্বর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যসটি লিখেছেন ১৯১৬ সালে। আজ থেকে প্রায় ১০৩ বছর আগে। নিখিলেশ, বিমলা, সন্দীপ এই তিনটি চরিত্র এবং সেই সময়ের ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে ঘটনাপ্রবাহ বর্ণিত রয়েছে পাতার পর পাতা। সত্যজিৎ রায় ১৯৮৪ সালে ‘ঘরে বাইরে’ ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে। ঘরে বাইরে সত্যজিতের ২৪তম বাংলা ছবি। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বহু মিল এবং তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। এখনও মূল উপন্যসটি পাঠ করলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে উগ্র জাতীয়তাবাদ। বিমলা সে যুগের একজন গৃহবন্দী নারী। তাঁর স্বামী নিখিলেশ ছিলেন উদার শিক্ষিত জমিদার। নিখিলেশের ছাত্রকালীন বন্ধু সন্দীপ স্বদেশি আন্দোলনের কর্মী। নিখিলেশ বিমলাকে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে চান। সেই সঙ্গে ইংরেজদের আদপকায়দা, ভাষা, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। যাতে বিমলা একজন স্বাধীন মুক্তমনের নারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। সন্দীপ আর নিখিলেশের মধ্যে আদর্শগত কোনো মিল নেই। কিন্তু তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট। সেইসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিখিলেশকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে থাকলেও ‘বন্দে-মাতরম’ মন্ত্রের উগ্র জাতীয়তাবাদ হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে।

কথাগুলো প্রথমেই বলে নেওয়ার একটি অন্যতম কারণ, বর্তমানে ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে এবং আপামর জনমানসে ধর্মীয় জিগির ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। এই যে দ্বিজাতিতত্ত্বের মূল মন্ত্র, তা গিলে নিচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ঠিক এমনই এক টালমাটাল পরিস্থিতিতে সত্যজিৎ রায়ের হাতে গড়া আরেক অভিনেত্রী অপর্ণা সেন ঠিক করলেন ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসকে আবার সেলুলয়েডে নিয়ে আসবেন। অনুপ্রেরণা হলেও তা রবীন্দ্রনাথ বা সত্যজিৎ থেকে খানিক বেরিয়ে এসে ঠিক এখনকার সমস্যাই ধরতে চেয়েছেন তিনি।

অপর্ণা সেনের এই ছবির নাম ‘ঘরে বাইরে আজ’। ১৪২৬ সালের নববর্ষের দিন মুক্তি পেয়েছিল ছবির পোস্টার। ২০১৫ সালে তিনি ‘আরশিনগর’ বানিয়েছিলেন। খুব একটা সাফল্য পাননি দর্শক বা সমালোচক কারোর থেকেই। ২০১৭ সালে ফিরলেন ‘সোনাটা’ নিয়ে। বক্সঅফিস সাফল্য না পেলেও পুরোনো অপর্ণাকে অনেকদিন পর ফিরে পাওয়া গিয়েছিল ওই ছবিতে। সব মিলিয়ে একটি চমৎকার ছবি। সেইদিক দিয়ে বলতে গেলে আরশিনগর-ই অপর্ণা সেনের শেষ বাংলা ছবি। ২০১৯ সালে আবার ফিরছেন তিনি। কোনো রিমেক নয়, বরং আধুনিকতার ছোঁয়ায় মিশবে সন্দীপ, বিমলা, নিখিলেশের ত্রিকোণ সম্পর্ক। এই ছবিতে দেখা যাবে, স্বামী নিখিলেশের প্রতি অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও বিমলা আকৃষ্ট হয় বিপ্লবী সন্দীপের প্রতি। ত্রিকোণ প্রেমের টানাপোড়েন, রাজনৈতিক সংঘাত, বর্তমান অশান্ত পরিবেশ সবটাই থাকবে ছবিতে। আর সেই কারণেই ছবির এমন নাম ‘ঘরে বাইরে আজ’। ইঙ্গিত সেখানেই। কলকাতা ও বোলপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছবির শুটিং হয়েছে।

অপর্ণা সেন পরিচালিত এই ছবিতে নিখিলেশ, বিমলা ও সন্দীপের ভূমিকায় দেখা যাবে যথাক্রমে অনির্বাণ ভট্টাচার্য, তুহিনা দাস এবং যিশু সেনগুপ্তকে। ২২ বছর ধরে বামপন্থী রাজনীতির ছাত্র, পরে জাতীয়তাবাদী নেতা, এই চরিত্রে দেখা যাবে যিশুকে। অন্যদিকে, ‘এক যে ছিল রাজা’ বা ‘দৃষ্টিকোণ’-এ অল্প অভিনয়ে দেখা গেলেও বিমলা চরিত্রের মধ্যেই শীর্ষে আসতে চলেছে তুহিনা দাসের নাম। একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক সন্দীপ চরিত্রে অভিনয় করবেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। ‘আরশিনগর’-এর পর অপর্ণা সেনের সঙ্গে এটি অনির্বাণের দ্বিতীয় কাজ। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে সৌমিক হালদার, সঙ্গীত পরিচালনা করছেন নীল দত্ত। পয়লা বৈশাখের প্রাক্কালে নিজের ফেসবুক ওয়ালে ছবির পোস্টার পোস্ট করে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন অভিনেত্রী-পরিচালক অপর্ণা সেন। এ-ও জানিয়েছিলেন, ২১ জুন মুক্তি পাচ্ছে ‘ঘরে বাইরে আজ’। কিন্তু কিছু জটিলতার কারণে ছবি মুক্তি পিছিয়ে ১৫ নভেম্বর ঠিক করা হয়েছে। এই ছবির প্রতি দর্শকদের প্রত্যাশা স্বভাবতই তুঙ্গে।

Developed by DXDasia