All We Imagine as Light-এর অনু-প্রভা-পার্বতী : পায়েল কাপাডিয়ার মাতৃকল্প

এই ছবি নারীবাদী, কিন্তু কোনো স্লোগানিং নেই

বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ও তাত্ত্বিক জিল দ্যলোজ-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই সিনেমা-১-এ তিনি উল্লেখ করেন চিত্র পরিচালক পাওলো পাসোলিনির এক উক্তির, যা ষাটের দশকের এক বিখ্যাত বক্তৃতায় উঠে আসে। এই উক্তির ভিতরে ছিল গভীর প্রশ্ন – চলচ্চিত্রের ভাষা আসলে কেমন? তাতে পাসোলিনি নিজেই উত্তর দেন, সেই ভাষা আদতে কাব্যের ভাষা। এই কাব্যময়তা কীভাবে নির্মাণ হচ্ছে? আইজেনস্টাইন-পুদভকিনের মতো পরিচালকেরা সর্বদাই চেষ্টা করেছেন চলচ্চিত্রকে থিয়েটার-গদ্য-কবিতা ইত্যাদি মাধ্যম থেকে আলাদা করে দেখার, বোঝার ও নির্মাণ করার। অর্থাৎ ফিল্মের যে কাব্যময়তা, তা হল আসলে ছবির পর ছবি জুড়ে এক প্রকার অনুভূতির নির্মাণ। সেই অনুভুতি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এমন কৌশল আমরা প্রত্যক্ষ করেছি মণি কৌল, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, কিয়েসলোস্কির ছবিতে। এবং এই কৌশলের ধারক ও বাহক হল সময়।

পায়েল কাপাডিয়া (Payal Kapadia)-র বহুল চর্চিত ছায়াছবি অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট (All We Imagine as Light) এই সমস্ত গুণের পরিপন্থী। এই আলোচনার মূলে পায়েল কাপাডিয়ার বাস্তবতা নির্মাণের আঙ্গিক, একঘেয়ে জীবন চরিতের সাংগেতিক প্রয়োগ এবং নারীবাদী রাজনীতি ও শ্রমজীবী নারী জীবনের অসামান্য এক চরিতমানস। এই মুহূর্তে নারীবাদী ছবি সারা বিশ্বে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নারীরা যেভাবে জায়গা করে নিচ্ছেন, তার আঁচ ধীরে ধীরে দেশীয় তথা ভারতীয় ফিল্মেও দেখা যাচ্ছে। অল উই ইম্যাজিন…-এর মতো ন্যারেটিভ ভীষণ ভাবেই ভারতীয়, আবার অন্যদিকে ভীষণ ভাবে আন্তর্জাতিকও।

বর্ষাকালের এই থিমকে পায়েল ধরেছেন অদ্ভুত মায়াবী নীল রঙে। সারা ছবি জুড়ে নীল রং ঘুরেফিরে এসেছে। তার সঙ্গে পরিচালক সংযোজন করেন মারিয়াম গেব্রুর বিখ্যাত মিউজিকাল পিস এমাহয় সেগুর প্রয়োগ।

সাধারণত আন্তর্জাতিক মানের ছবি মানেই ধরে নেওয়া হয় যে সেখানে অত্যন্ত সুন্দর শৈল্পিক শট থাকবে, যাকে ওপেনিং শট বলে চিহ্নিত করা যাবে। কিন্তু পায়েলের এই সিনেমা শুরু হয় খুবই মামুলি একটি ফলো শট দিয়ে। আমরা দেখতে পাই মুম্বাই শহরের একটা অংশ। ফ্রেম যত এগোতে থাকে ততই আমরা দেখি শ্রমিক শ্রেণির মানুষরা ফোকাসড হচ্ছেন। এরপরেই শোনা যায়, কিছু অপরিচিত ব্যক্তির উক্তি বা বক্তব্য; তারা কেউ বম্বে শহরের বাসিন্দা নয়, বাইরে থেকে এসেছে। যেন আজও এই শহরের আগন্তুক। পায়েল কাপাডিয়া সহজ সরল কিছু জীবনের নিবিড় গহীন সুখ ও দুঃখকেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ছবির পাত্রপাত্রীরা আসলে সকলেই মুম্বাই শহরে এসেছে বাইরে থেকে। শুরুর শটটা সেখানে বলে দিতে চায়, দর্শক আসলে একটি তথ্যচিত্র দেখতে চলেছেন। এখানে কিছুই বানিয়ে তোলা নয়। কাজেই গল্পের গরু এখানে গাছে উঠবে না। বরং অনাবিল জীবনযাপন ঠিক যেমন হয় তেমন ভাবে বাস্তবিক আখ্যান রচনা করা হয়েছে এবং তার পথ কাব্যিক।

 

এই ছবির মুখ্য নায়িকা হলেন প্রভা (অভিনয়ে কানি কুশ্রুতি) বলে একজন স্বাস্থ্যকর্মী, যাঁর স্বামী সঙ্গে থাকে না। প্রভার এই নিসঙ্গ জীবনের সঙ্গী তাঁর একমাত্র রুমমেট অনু (অভিনয়ে দিব্যা প্রভা)। প্রভার সঙ্গে একই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করে। এর পাশাপাশি আরও একজন রয়েছে, প্রভার আরেক সহকর্মী পার্বতী (অভিনয়ে ছায়া কদম)। মূলত প্রভার জীবনকে দেখতে গিয়েই আমরা অনু এবং প্রভার জীবনকে প্রত্যক্ষ করি। ঋত্বিক ঘটকের যে মাতৃকল্প আমরা ভারতীয় সিনেমাতে আর প্রায় খুঁজেই পেলাম না, সেই হারিয়ে যাওয়া চিন্তাই যেন আবার ঘিরে এল পায়েল কাপাডিয়ার ছবির আঙ্গিকে। বাণিজ্যিক ছবির ক্ষেত্রে শ্রমিক শ্রেণির গল্প প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। যে পরিমাণ নারী বিবর্জিত স্পেসে ভারতীয় সিনেমা প্রবাহিত হয় সেখানে শ্রমিক শ্রেণির মহিলাদের নিয়ে ন্যারেটিভ প্রায় দুষ্প্রাপ্য ধরে নেওয়া হয়েছিল। সেই মরা গাঙেই যেন প্লাবন নিয়ে এল পায়েল কাপাডিয়ার অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট (All We Imagine as Light by Payal Kapadia)। ছবির ঘটনাবলি মূলত ঘটে একটি বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে। আর শ্রাবণ কাটিয়ে ছবিটি চলে যায় মুম্বাই শহরের বাইরে। বর্ষাকালের এই থিমকে পায়েল ধরেছেন অদ্ভুত মায়াবী নীল রঙে। সারা ছবি জুড়ে নীল রং ঘুরেফিরে এসেছে। তার সঙ্গে পরিচালক সংযোজন করেন মারিয়াম গেব্রুর বিখ্যাত মিউজিকাল পিস এমাহয় সেগুর প্রয়োগ। শুধু পিসটি শুনলেই বোঝা যায়, সেখানে বারবার এক অদৃশ্য বৃত্তের সৃষ্টি হচ্ছে। এই অদৃশ্য বৃত্ত যেন প্রভার জীবনের গতানুগতিকতাকেই একরকম সংগীতময় করে তুলেছে, যা নারীত্বের চাঞ্চল্যকে প্রকাশ করে। প্রভা আসলে একা। স্বামী বিশেষ খোঁজখবর নেন না, কিন্তু ভালোবাসা প্রকাশের জন্য লাল রঙের একটি বাহারি রাইস কুকার উপহার পাঠায়। এ এক অদ্ভুত ট্রিটমেন্ট; ছবি বাস্তুবের কল্পনাতে থেকেও ছেঁড়া ছেঁড়া কাব্যের দিকে এগিয়ে যায়। অনুর বয়স অল্প, ব্যস্ত শহর মুম্বাইতে আছে এক গোপন প্রেমিক। প্রভা কানাঘুষো শুনতে পেয়েছে এই খবর, তাতে এই বিচ্ছেদ যেন আরও পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে, সেই গ্লানি ও যন্ত্রণাকে প্রশমিত করতে রাতের বর্ষার জল পরিষ্কার করতে করতে হঠাৎই জড়িয়ে ধরে সেই রাইস কুকারটিকে।

পায়েল কাপাডিয়ার এই ছবিতে নারী জীবনের তিনটি ধাপ চোখে পড়েছে। প্রেম, প্রেমিকের সঙ্গে বিয়োগ-ব্যথা এবং বৈধব্য ও সন্তান হীনতার গ্লানি। ছবির একদম শেষ ফ্রেমে এভাবেই পায়েল নির্মাণ করেন তাঁর মাদার আর্কিটাইপকে।

এই ছবির নারীবাদী গেজ (Feminist Gaze) খুবই গুরত্বপূর্ণ ও অভিনব হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক ফিল্মের বাজারে যে নারীবাদী ছবির একপ্রকার স্লোগানিং শুরু হয়েছিল তা কিছুটা হলেও বাড়াবাড়ি। কারণ চারুলতা, মেঘে ঢাকা তারা জাতীয় সিনেমায় নারী জীবনযাপনকে যে মুন্সিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল, তা কোনো মহিলা নির্দেশকের ফসল নয়। পায়েল কাপাডিয়া তাঁর গেজের মাধ্যমে সেই ধারণাকে নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করলেন কিছু দৃশ্যের মাধ্যমে। প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া যাক, এই ছবিটির পরিচালক যদি কোনো পুরুষ হতেন, তাহলে তিনি এবং  টেকনিশিয়ানরা চট করে সেইসব জায়গা ও মুহূর্তকে সেইভাবে দৃশ্যে প্রকাশ করতে পারতেন না, যেটা এখানে পায়েল কাপাডিয়ার জন্য এক প্রকার অ্যাডভান্টেজ। এছাড়া ছবির একদম শেষের একটি দৃশ্যে আমরা প্রভাকে দেখি সমুদ্র সৈকতের ধারে এক ঝোপে প্রস্রাব করতে। ক্লোজআপ শটের পরে মাস্টারে আমরা এই দৃশ্যকে দেখি। বহু ছবিতে পুরুষদের এমন দৃশ্য দেখলেও মেয়েদের এই বিষয়টাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ পরিচালক শ্লীলতা বজায় রাখতে চেয়েছেন এবং একপ্রকার সামাজিক মরালিটির দায় থেকে কখনোই এই ধরনের দৃশ্যের সাবলীল নির্মাণ করে উঠতে পারেননি। কিন্তু পায়েল কাপাডিয়া নারী জীবনের এই সহজ বিষয়গুলো অত্যন্ত জোড়ালো ভাবে তুলে ধরেছেন।

শেষ করা যাক ঋত্বিক ঘটকের “মাদার আর্কিটাইপ”-কে যেভাবে পায়েল কাপাডিয়া ব্যবহার করেছেন, তা দিয়ে। ভারতীয় সিনেমার মহাসমুদ্রে নারীবাদ বেশ বিরল বিষয়। শ্রমজীবী নারীদের নিয়ে কথা বলেছিলেন সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক। পায়েল কাপাডিয়ার এই ছবিতে নারী জীবনের তিনটি ধাপ চোখে পড়েছে। প্রেম, প্রেমিকের সঙ্গে বিয়োগ-ব্যথা এবং বৈধব্য ও সন্তান হীনতার গ্লানি। ছবির একদম শেষ ফ্রেমে এভাবেই পায়েল নির্মাণ করেন তাঁর মাদার আর্কিটাইপকে। প্রভা নিঃসন্তান বিবাহিত মহিলা, পার্বতীর স্বামী মারা গেছে ও ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র সংসার পেতেছে এবং এরই মাঝে অনু তার প্রাণের মানুষ খুঁজছে। এই তিন চরিত্র যেন তিন মাতৃমূর্তির প্রতিভূ। তাঁরা অনন্তকাল ধরে সমস্ত ভার সঙ্গে করে জীবনপ্রবাহে বয়ে চলেছেন একাই। এই বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেটুকু খুশি, যেটুকু নিঃশ্বাস দরকার তাই যেন এই সিনেমার কল্পিত আলো।

কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪-এ পুরস্কার গ্রহণের ছবি

_____ 

ছবি: অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট | চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: পায়েল কাপাডিয়া | অভিনয়: কানি কুশ্রুতি, দিভ্যা প্রাভা, ছায়া কদম | দেশ: ভারত-ফ্রান্স | পুরস্কার: গ্র্যান্ড প্রিক্স (কান চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৪), সেরা ছবি (সিডনি চলচ্চিত্র উৎসব), সিলভার হুগো জুরি প্রাইজ (শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব), জুরি গ্র্যান্ড প্রাইজ (এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডস)

Developed by DXDasia