কল্যাণীতে মার্কিন যুদ্ধঘাঁটি

বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে পরিকল্পিত শহরের ইতিকথা

নিউটাউনের পরিধি বেড়েই চলেছে ক্রমশ। বাইরের লোকেদের কাছে অনেকটা গোলকধাঁধার মতো। ঘোরানো-পেঁচানো রাস্তা নিয়ে সল্টলেক হয়ে উঠেছে বৃহত্তর কলকাতার অংশ। পূর্ব এবং দক্ষিণ – দু'দিকেই বাড়ছে উপনগরী। একদিকে নিউ টাউন এবং সল্টলেক, সরকারিভাবে যা বিধাননগর। অন্যদিকে গড়িয়া, রাজপুর সোনারপুর, বারুইপুর। হাওড়াকেও তার মধ্যে আনার কথা চলছে। সড়ক আর রেলপথে দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাইয়ের সঙ্গে যোগযোগ বড়ো সুবিধে।  

বিধাননগরের সঙ্গেই গড়ে উঠেছিল কল্যাণী। আর্থিকভাবে কলকাতার সবথেকে সফল উপনগরী হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যেই। এখন দু'টি ব্যাপারে উন্নতি করেছে দ্রুত। প্রথমটি এইমস। কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যেক রাজ্যে এইমস গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। কল্যাণীতে জমি দেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। কয়েকশো মানুষের রোজগার ছাড়াও প্রত্যেক বছর লাখ লাখ মানুষের চিকিৎসা হয়। সব মিলিয়ে উপকৃত হয় গোটা রাজ্যের অনেকগুলো পরিবার।

কল্যাণী এইমস

দ্বিতীয়টি হল বিমানবন্দর। দমদমের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চাপ অতিরিক্ত বেড়েছে। তা কমাতে রাজ্য সরকার কল্যাণীতে এয়ারপোর্ট গড়তে চায়। ১৫০০ থেকে ৫০০০ একরের মতো জমি বরাদ্দ হয়। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক – দু'রকম উড়ানই শুরু হওয়ার কথা। কাজ দ্রুত করতে কেএমডিএ-র অধীনে আসে কল্যাণী। কলকাতার পিন কোড পায়। ৩০ মিনিটের মধ্যে রেলপথে কলকাতা পৌঁছনোর বন্দোবস্ত হবে অদূর ভবিষ্যতে। মেট্রোও চালু হতে পারে।

ইউএসএএএফ ছাউনি 

কল্যাণীর ইতিহাস জানতে গেলে পাড়ি দিতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। জাপান বোমা ফেলেছে আমেরিকার পার্ল হারবারে। যুদ্ধে ব্রিটেন-ফ্রান্সের সঙ্গী হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারত তাদের নিরাপদ ঘাঁটি। মার্কিন এয়ার ফোর্স ইউএসএএএফ এক রোমহর্ষক অভিযান শুরু করল – 'দ্য হাম্প'। জাপানের সঙ্গে লড়তে হিমালয়ের কাছাকাছি অনেকগুলো ছোটো ছোটো বেস তৈরি হল। এপ্রিল ১৯৪২ থেকে নভেম্বর ১৯৪৫ পর্যন্ত ভারতে ১,৫৬,৯৯৭টি ফ্লাইটে ১.৫ মিলিয়ন ফ্লাইং আওয়ারে ৭,৭৬,৫৩২ টন মালপত্র আর ৩৩,৪০০ জন  মানুষ আনা-নেওয়া হয়। হারাতে হয় ৪১টি বিমান এবং  ১,৩১৪ জন মানুষকে। যুদ্ধের পর ৪৭,০০০ জন বাড়ি ফেরেন। এখনও সেই অঞ্চলে মার্কিন সরকার নিহত ব্যক্তিদের সন্ধান জারি রেখেছে।

যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন রবার্ট ম্যাকনামারা। গ্র্যান্ড হোটেল থেকে অপারেশন চালাতেন। পরে রাষ্ট্রপতি কেনেডির আমলে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব হন। বিশ্ব ব্যাংকের সভাপতিও হয়েছিলেন। ক্যাথে পেসিফিক এয়ারলাইনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে চার সমান্তরাল এয়ারস্ট্রিপের গুগল আর্থ ছবি

ইউএসএএএফ-এর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ছিল রুজভেল্ট নগর। ল্যান্ডিং স্ট্রিপ ছিল চারটে। বজবজ থেকে প্লেনের জ্বালানি ভরা হত। টিনের অস্থায়ী বাড়িঘর বানিয়ে ছোটো শহর গড়ে তোলা হয়েছিল। যার ধ্বংসাবশেষ আজও পাওয়া যায়। বিধানচন্দ্র রায় ১৯৫০ সালে কংগ্রেস বৈঠকের জন্য জায়গার খোঁজ করছিলেন। তখন রুজভেল্ট নগর হয়ে উঠল কল্যাণী। বিধানচন্দ্রের হাত ধরে পরিকল্পিত শহরের যাত্রা শুরু হল। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইএসইআর, বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ব্রেওয়ারিস, ডাবর – গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক প্রতিষ্ঠান।

কল্যাণী এখন জমজমাট শহর। সময় করে একবার গিয়ে পুরোনো রুজভেল্ট নগর ঘুরে আসুন। শহরটির ইতিহাস যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছে কেএমডিএ। 
 

Developed by DXDasia