হাজার ঘাত-প্রতিঘাতের পরেও শেষে উত্তম-সুচিত্রার মিলন অনিবার্য হয়ে পড়ে
১৯৬১ সালে যে চারটি প্রধান বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছিল সেগুলি হল সত্যজিৎ রায়ের ‘তিনকন্যা’, তপন সিনহার ‘ঝিন্দের বন্দি’, ঋত্বিক ঘটকের ‘কোমল গান্ধার’ এবং অজয় করের ‘সপ্তপদী’। এদের মধ্যে সপ্তপদীই যে বাণিজ্যিক ভাবে সবচেয়ে বেশি সফল, তা বলাই বাহুল্য। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অজয় করের সপ্তপদী ছবিটি একটি কালচারাল ন্যারেটিভ যা জাতিগত এবং উপনিবেশোত্তর চেতনার জটিল ছায়াগুলিকে স্পর্শ করে। সপ্তপদী ছবিতে শেক্সপিয়ারের ওথেলোর নাট্যায়নের দৃশ্যটি চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে বাঙালি দর্শকের মনে। ওথেলো উত্তম এবং ডেসডিমোনা সুচিত্রা পর্দায় যে অনাবিল মুগ্ধতার সৃষ্টি করেছিলন তা এক বিস্ময়। কিন্ত প্রশ্ন জাগে যে পরিচালক ওথেলোকেই বেছে নিলেন কেন? ওথেলো নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যের পঞ্চম অঙ্কই কেন প্রতিস্থাপিত হল এই ছবিতে?
ছবির বাহান্ন মিনিটের মাথায় শুরু হয় এই নাট্যায়ন। আমরা দেখতে পাই মোমবাতি হাতে নিয়ে ওথেলোর মঞ্চে প্রবেশ। উৎপল দত্তের অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বরে ঠোঁট মেলাতে মেলাতে, এক্সপ্রেশনে, বিভঙ্গে কলকাতার উত্তম ক্রমশ হয়ে উঠছেন ভেনিসের ওথেলো।
রীনা ব্রাউন ও কৃষ্ণেন্দুর মধ্যে প্রেম প্রথম প্রকাশ পায় ওথেলোর মঞ্চে। আরও স্পষ্ট করে বললে, কৃষ্ণেন্দুর প্রতি রীনা ব্রাউনের যে তিক্ত মনোভাব ছবির শুরু থেকেই ভীষণ ভাবে ছিলো, তার বদল ঘটতে থাকে এই অভিনয়ের দৃশ্য থেকেই। ছবির বাহান্ন মিনিটের মাথায় শুরু হয় এই নাট্যায়ন। আমরা দেখতে পাই মোমবাতি হাতে নিয়ে ওথেলোর মঞ্চে প্রবেশ। উৎপল দত্তের অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বরে ঠোঁট মেলাতে মেলাতে, এক্সপ্রেশনে, বিভঙ্গে কলকাতার উত্তম ক্রমশ হয়ে উঠছেন ভেনিসের ওথেলো।
“It is the cause, it is the cause, my soul.
Let me not name it to you, you chaste stars”
শয্যায় নিদ্রিতা ডেসডিমোনা। ঘরের অলৌকিক আলো-ছায়ার সমুদ্রে ডেসডিমোনার অপ্রতিম সৌন্দর্য লীণ হয়ে আছে। হাওয়ার দাপটের সঙ্গে ভেসে আসছে ওথেলোর দৃপ্ত আর্তস্বর,
“yet she must die, else she’ll betray more men.
Put out the light, and then put out the light.”
ধ্বনি, দৃশ্য ও সংলাপের প্রয়োগ অবলীলায় যেন একটি পারফর্মেটিভ স্পেস তৈরি করে দিচ্ছে। হোমি কে. ভাবা তাঁর ‘Of Mimicry and Man’ প্রবন্ধে বলেন, “Mimicry is at once resemblance and menace.” অর্থাৎ, উপনিবেশিত ব্যক্তি যখন উপনিবেশকের ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিনীতির অনুকরণ করে, তখন তা শুধুমাত্র চিত্র নয়, বরং তা এক বিদ্রোহও বটে। কৃষ্ণেন্দুর শুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ, শেক্সপিয়রীয় ভঙ্গিতে সংলাপ বলা—এই সবই তার গ্রহণযোগ্যতাকে নিশ্চিত করে। রীনা, যিনি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, তাঁর প্রেমিক হিসেবে কৃষ্ণেন্দু তখনই সফল হন, যখন তিনি শ্বেতাঙ্গ সাংস্কৃতিক কাঠামোয় খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। এটি তাই প্রবল ভাবে একটি উপনিবেশোত্তর সাংস্কৃতিক সংকেত।
এই নাটকে ওথেলো একজন আফ্রিকান মুর, যিনি ভেনিসের উচ্চবর্ণ, শ্বেতাঙ্গ নারীর প্রেমে পড়েন। তিনি সর্বদা ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর ভালোবাসা সন্দেহ ও ঈর্ষার জালে ছিন্নভিন্ন হয়। একইভাবে সপ্তপদী-তে কৃষ্ণেন্দু একজন হিন্দু, রীনা একজন খ্রিস্টান অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান—তাঁদের প্রেম সমাজে নিষিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য নয়। এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থে বলেন, “The Orient is not only adjacent to Europe; it is also the place of Europe’s greatest and richest and oldest colonies, the source of its civilizations and languages, its cultural contestant, and one of its deepest and most recurring images of the Other.”

রীনা, যিনি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, তাঁর প্রেমিক হিসেবে কৃষ্ণেন্দু তখনই সফল হন, যখন তিনি শ্বেতাঙ্গ সাংস্কৃতিক কাঠামোয় খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। এটি তাই প্রবল ভাবে একটি উপনিবেশোত্তর সাংস্কৃতিক সংকেত।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রীনা, যদিও ভারতীয় প্রেক্ষিতে এক প্রান্তিক নারী, তবু তাঁর ভেতর এক উপনিবেশক মানসিকতা কাজ করে, যেখানে কৃষ্ণেন্দু ‘অপর’। অথচ মঞ্চে শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে কৃষ্ণেন্দু তাঁর ‘অপরতা’কে চমৎকার পারফর্মেন্স দিয়ে মুছে ফেলেন যাকে এক ধরণের ‘postcolonial performance of assimilation’ বলা যায়।
রীনার আকর্ষণ মূলত কৃষ্ণেন্দুর ‘নাট্য কৃষ্ণেন্দু’-র প্রতি, প্রকৃত ‘বাঙালি কৃষ্ণেন্দু’-র প্রতি নয়। তাঁর প্রেম তৈরি হয় কৃষ্ণেন্দুর ওথেলোর চরিত্রাভিনয়ের সময়, যেখানে সে এক সুশৃঙ্খল, শেক্সপিয়ার-পড়া, উচ্চারণ-শুদ্ধ ‘ইংরেজিয়ানা’ পরিবেশনে নিজেকে মেলে ধরে। এই প্রবণতাকে বোঝাতে Frantz Fanon তাঁর Black Skin, White Masks গ্রন্থে বলেন, ‘To speak a language is to take on a world, a culture.’ অর্থাৎ, কৃষ্ণেন্দু যখন ইংরেজি উচ্চারণে শেক্সপিয়র নাটক করে, সে কেবল ভাষা নয়, সে গ্রহণ করছে একটি সংস্কৃতি, একটি দৃষ্টিভঙ্গি—যা উপনিবেশিক উত্তরাধিকার বয়ে আনে। রীনা যেসময় কৃষ্ণেন্দুর প্রেমে পড়ে, সে সময় সে আসলে এক ‘ঐচ্ছিক ইংরেজ’ হয়ে ওঠা পুরুষকে ভালোবেসে ফেলে। এটি তার cultural fetishism—যা ব্রিটিশ শাসনের আবেশেই জন্ম নিয়েছে।
এটা বলা যেতেই পারে যে এই দশ মিনিটের দৃশ্য গোটা সিনেমার একপ্রকার ভারকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। যদিও ছবিটি শেষ অবধি কেবল একটি প্রেমের ছবিই হয়ে উঠতে চায়, যে কারণে হাজার ঘাত-প্রতিঘাতের পরেও শেষে উত্তম-সুচিত্রার মিলন অনিবার্য হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও প্রায় চৌষট্টি বছর আগে তৈরি একটি বাণিজ্যিক বাংলা ছবি এতটা সপ্রতিভ ভাবে এক ভিন্ন স্বরের খোঁজ করল, পরিচালক হিসেবে অজয় করকে বাঙালির সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া এরপরেও অন্যায় নয় কি?