
আলোকচিত্রী- নিমাই ঘোষ
উত্তমকুমারের ছবি তোলার সৌভাগ্য কখনও হয়নি আমার। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমি কখনই ওঁর ‘ডাই-হার্ট ফ্যান’ ছিলাম না, কিন্তু খুবই ভালোবাসতাম। ‘ডাই-হার্ট ফ্যান’ ছিলাম না কারণ, ছোটোবেলায় উত্তমকুমারের ছবি খুব একটা দেখতাম না বা দেখার সুযোগ হয়নি। বাবা (নিমাই ঘোষ) চাইতেন পড়াশোনা শেষ করে তারপর যেন এসবের সঙ্গে যুক্ত হই। উত্তমকুমার মারা যাবার পরেই ওঁর ছবির জগতের সঙ্গে আমার মূল পরিচয় হয়।
আলোকচিত্রী- নিমাই ঘোষ
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমার প্রয়াত হলেন। আমি সেদিন ছাদের ঘরে খুব মন দিয়ে পড়ছিলাম, পরের দিনই পরীক্ষা। হঠাৎ শুনলাম উনি মারা গেছেন। সে এক হইহই রইরই ব্যাপার। সেদিন আর মন দিয়ে পড়তে পারলাম না। পরীক্ষাও খুব একটা ভালো হয়নি।
১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমার প্রয়াত হলেন। আমি সেদিন ছাদের ঘরে খুব মন দিয়ে পড়ছিলাম, পরের দিনই পরীক্ষা। হঠাৎ শুনলাম উনি মারা গেছেন। সে এক হইহই রইরই ব্যাপার। সেদিন আর মন দিয়ে পড়তে পারলাম না। পরীক্ষাও খুব একটা ভালো হয়নি। বাঙালির প্রেম, অহংকার, আবেগ চলে যাচ্ছেন এ ধরাভূম ছেড়ে, অন্য কোনো কাজে কি আর মন বসে!
জীবিতাবস্থায় উত্তমকুমারকে আমি দুইবার দেখেছি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তখন সবে কলেজ। একদিন পূর্ণ সিনেমা হলের উপরে বসন্ত কেবিন থেকে আমরা বন্ধুরা মিলে ওঁকে দেখলাম। আজও মনে আছে, দেখলাম ঘিয়ে রঙা প্যান্ট আর টকটকে লাল রঙের হাফহাতা শার্ট পরে সাদা অ্যামব্যাসাডর থেকে নেমে এলেন তিনি। কী অপূর্ব সেই উত্তমকুমারের চেহারা। সেদিন ওঁর একটা ছবি মুক্তি পেয়েছিল। দেখলাম, মুহূর্তের মধ্যে ভিড়। লোকে গিজগিজ করছে চারপাশ। আর সকলে ‘গুরু-গুরু’ বলে চিৎকার করছে। উত্তমকুমারকে নিয়ে জনতার উল্লাস যে কত তীব্র হতে পারে, সেদিন স্বচক্ষে অনুভব করেছিলাম।
আর একবার ওঁকে দেখি ওই পূর্ণ সিনেমার পিছন দিকেই। আমার বাড়ি কালীঘাট রোডে। একদিন গলি থেকে বেরিয়েই দেখলাম ইউ.কে-র গাড়িটা বেরিয়ে যাচ্ছে। উনি বসেছিলেন গাড়ির বাঁদিকে। মুখের সামনে একটা বই ধরে রাখা, হয়তো মুখটা আড়াল করতেই ওভাবে পড়ছিলেন বা পড়ার ভান করছিলেন। ওনাকে চাক্ষুষ করার এই দুটো স্মৃতি এখনও অক্ষত রয়েছে।
আলোকচিত্রী- নিমাই ঘোষ
আমার বাবা নিমাই ঘোষের তোলা উত্তমকুমারের একটা সাদা-কালো ছবি আছে। ছবিতে উনি যে পাঞ্জাবিটা পরেছিলেন সেটা ছিল সবুজ রঙের। প্রচণ্ড গ্ল্যামারাস একটা ছবি। চোখে মুখে আলো ধাক্কা খাচ্ছে, কারণ তখন উনি সদ্য ঘুম থেকে উঠেছেন। আর একটা ছবি আছে, যেখানে ইউ.কে হাতে কুকুর নিয়ে ছিলেন। ওই ছবিটা তোলার সময় উনি বাবাকে বলেছিলেন, “নিমাইবাবু, শুনেছি আপনার হাতে ম্যাজিক আছে! কই দেখান তো কেমন ম্যাজিক জানেন আপনি।” তখনই বাবা ওই ছবিটা তুলেছিলেন।
টালিগঞ্জে কাজ করার সুবাদেই বাবার সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়। তারপর বহু বহু বছর যোগাযোগ ছিল। বাবাকে খুব ভালোবাসতেন ইউ.কে। কত কত গল্প বাবা বাড়ি এসে আমাদের বলতেন। বাবা কিন্তু সব ছবির নেগেটিভই খুব যত্ন করে রেখে দিতেন, উত্তমকুমারের তো বটেই। বাবার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল উত্তমকুমারের ছবি নিয়ে একটা বই করবেন। এবং বেঁচে থাকাকালীন উনি সেটা করে দেখিয়েছিলেন। উত্তমকুমারকে নিয়ে ফটোগ্রাফির অ্যালবাম কিন্তু নিমাই ঘোষই প্রথম করেছিলেন, তার আগে আর কেউ করেননি।
আমার বাবা নিমাই ঘোষের তোলা উত্তমকুমারের একটা সাদা-কালো ছবি আছে। ছবিতে উনি যে পাঞ্জাবিটা পরেছিলেন সেটা ছিল সবুজ রঙের। প্রচণ্ড গ্ল্যামারাস একটা ছবি। চোখে মুখে আলো ধাক্কা খাচ্ছে, কারণ তখন উনি সদ্য ঘুম থেকে উঠেছেন।
আলোকচিত্রী- নিমাই ঘোষ
আমার মনে হয়, উত্তমকুমারের রিপ্লেসমেন্ট হয়নি এখনও। সেই হাসি, সেই উচ্চতা, সেই অভিনয়, দর্শকদের মাত করে দেওয়া – আর কোনও বাঙালি অভিনেতা তৈরি করতে পারেননি হয়তো। তাই আজও বাঙালি উত্তমকুমারকে নিয়ে এত আবেগপ্রবণ। বাঙালি যতদিন বাঁচবে, মহানায়ককে বুকে নিয়েই বাঁচবে। এই উৎসবের কোনো শেষ নেই।
___________________
ছবি: নিমাই ঘোষ | সৌজন্যে: সাত্যকি ঘোষ
বঙ্গদর্শন.কম-এর অনুমতি ছাড়া ছবিগুলি অন্যত্র ব্যবহৃত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে

