শিলিগুড়ি মহকুমা ও কার্শিয়াং পাহাড়ের এইডসে আক্রান্ত প্রায় দু’শো পরিবার
মনুষ্যজীবনের সবচেয়ে মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় হল মৃত্যু। মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম এমনকি বিজ্ঞানও। মৃত্যু স্থান-কাল ভেদে সব মানুষকে ভাবায় এবং সত্যিকারার্থে পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া ভার, যারা মৃত্যু নিয়ে একবারও ভাবেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দার্শনিক ঢঙে সমগ্র জীবনব্যাপী মৃত্যুর নানাদিক নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন। তাঁর এই মৃত্যুচিন্তা নানারকম দ্বান্দ্বিকতায় পরিপূর্ণ। ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতে তিনি মৃত্যুকে বলছেন, “মরণ রে/ শ্যাম তোঁহারই নাম। চির বিসরল যব নিরদয় মাধব/ তুঁহু ন ভইবি মোয় বাম/ আকুল রাধা–রিঝ অতি জরজর,/ ঝরই নয়ন– দউ অনুক্ষণ ঝরঝর/ তুঁহু মম মাধব, তুঁহু মম দোসর,/ তুঁহু মম তাপ ঘুচাও।/ মরণ তু আও রে আও।।” মরণ শ্যামের মত উদার, প্রেমিকের মত বন্ধু যিনি বিরহাতুর রাধার পথ প্রদর্শক এবং ক্ষুব্ধ, ঝঞ্ঝাপূর্ণ বিজন পথে অভিসারের প্রেমিকাকে প্রণয়ক্ষণের সাহস সঞ্চারক। মৃত্যুর আগে ভাবতে হবে জন্ম নিয়ে। কারণ জন্ম আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে মৃত্যুর স্বাদ দিতে। শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গের অবতারণার কারণ রবীন্দ্রনাথেই আমাদের জন্ম, আবার রবীন্দ্রনাথেই আমাদের মৃত্যু।
শিলিগুড়ি মহকুমা ও কার্শিয়াং পাহাড়ের এইডসে আক্রান্ত প্রায় দু’শো পরিবার। মারনব্যাধি হিসাবে চিহ্নিত এইচআইভি বা এইডসের সঙ্গে লড়াই করে অনেক ভালোও আছেন। আক্রান্তদের পরিবারে প্রায় ছ’শো জন সদস্য রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওয়েস্টবেঙ্গল ভলান্টারি হেলথ অ্যাসোসিয়েশন ওই দু’শো জনের ওপর কাজ করে। সংস্থার অন্যতম কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট সমাজসেবী তরুণ মাইতি জানান, পাঁচ বছরে যেসব এইডস আক্রান্তকে নিয়ে তাঁরা কাজ করেছেন, তার মধ্যে মারা গিয়েছে মাত্র তিনজন। অথচ তাঁরা যখন কাজ শুরু করেন, তখন এঁরা সকলেই মৃত্যু ভয়ে তটস্থ থাকতেন। সবসময় ভয় পাচ্ছিলেন, এই বুঝি মৃত্যু গ্রাস করল। সবসময় হতাশ হয়ে থাকতেন, কারও সঙ্গে ঠিকমতো মেলামেশাও করতে পারছিলেন না। সবসময় শিশু-সন্তান নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকতেন, তাঁদের শরীরের মারনব্যাধির কথা হয়তো কেও জেনে ফেলল, এই বুঝি তাঁদের ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হল!
সেই ভয়ানক অবস্থা কাটিয়ে তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ এখন হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করছেন। কেউ জৈব কৃষির চাষবাস করছেন, কেউ আবার চা বাগানে কাজ করছেন। কেউবা রুটি তৈরি করে বিক্রি করছেন। মৃত্যু সবার জীবনেই এগিয়ে আসছে। জন্ম এবং মৃত্যু একমাত্র এই দু’টি শব্দ আপেক্ষিক নয়। কিন্তু তাই বলে কি মৃত্যুভয়ে বসে থাকব আমরা? ওষুধ বা এআরটি গ্রহণ, জীবনযাপনে শৃঙ্খলা মেনে চলা, কাউন্সেলিং করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়া- এরকম বেশ কিছু সূত্র মেনে তাঁরা এখন অনেক ভালো আছেন।
স্পর্শকাতর এলাকা শিলিগুড়ি মহকুমা ও পাহাড়। একপাশে নেপাল আরেক পাশে বাংলাদেশ ও বিহার। তারপর আবার উত্তরপূর্ব ভারতের গেটওয়ে শহর। ফলে বাইরে থেকে পণ্যবোঝাই গাড়ি সহ অন্যান্য লোকের আনাগোনা লেগেই থাকে। শৃঙ্খলাবিহীন যৌন জীবনের জেরে এইডস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি তাই ২০১৪ সালে এখানকার এইডস আক্রান্তদের ওপর প্রকল্প গ্রহণ করে। সেই প্রকল্পের কাজ করতে মাঠে নামে ওয়েস্টবেঙ্গল ভলান্টারি হেলথ এসোসিয়েশন। সংস্থার সদস্যরা আক্রান্তদের চিহ্নিত করে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তাঁরা আক্রান্তদের মধ্যে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা- যেমন লজ্জা, ঘৃণা দূর করে তাঁদের মনে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কাজ করেন। তারপর নিয়মিত এআরটি সেন্টারে পাঠানো, অধিকার বিষয়ে সচেতন করা, কিছু স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া, সবার সঙ্গে মেলামেশা করা, যাঁরা এইচআইভি পজিটিভ নিয়ে কাজ করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মতো কাজ চালিয়ে যাওয়া, এমনকি সচেতনতার বিভিন্ন শিবিরে অংশ নেওয়ার মতো পরামর্শ দেওয়া হয় প্রতিদিন। স্বেচ্ছাসেবী তরুনবাবুর কথায়, “ওঁদের মধ্যে একটু আত্মবিশ্বাস বাড়লে যোগ্যতা অনুযায়ী স্বনির্ভরতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধীরে ধীরে ওঁরা বিভিন্নভাবে স্বনির্ভর হতে থাকে। বোঝানো হতে থাকে যে এটা কোনও অসুখ নয়। ব্লাড সুগার হলে যেমন নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, তেমনই এক্ষেত্রেও নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে বা এআরটি নিতে হবে।
এই এইডস আক্রান্তদের মূল স্রোতে ফেরাতে শুধু স্বনির্ভরতার উদ্যোগই নয়, তাঁদের নিয়ে খেলাধূলা এবং পিকনিকেরও আয়োজন করা হয়। পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক সেই সংস্থা ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা খরচ করে। ইউএন এইডস ২০০৯ সালে শিলিগুড়ির এই অন্যরকম কাজের তারিফ করে স্বীকৃতিও দেয়। আমেরিকান লাইব্রেরিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ফিলিপিন্সে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী তরুণবাবু তাঁদের এই কাজের কথা জানালে সেখান থেকেও প্রশংসা আসে। শিলিগুড়ি ও কার্শিয়াং নিয়ে ওই কাজের ফলস্বরূপ মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি ওয়েস্টবেঙ্গল ভলান্টারি হেলথ এসোসিয়েশনকে দিয়ে সম্প্রতি জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকে আবার এইচআইভি বা এইডস আক্রান্তদের নিয়ে কাজ শুরু করার পরামর্শ দেয়। তার ভিত্তিতে রাজগঞ্জ ব্লকে দেড়শো জন পরিবার নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মাতৃদিবসের দিন ডাবগ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে এইডস আক্রান্ত পরিবার ও অন্যান্য সাধারণ পিছিয়ে পড়া পরিবারের মধ্যে তরুণবাবুরা সত্তরটি গাছের চারা বিলি করেন। তাতে ৩৫ জন এইডস আক্রান্তের পরিবার উপস্থিত ছিল। রাজগঞ্জ ব্লকে তাঁরা এইডস আক্রান্ত পরিবারগুলোকে মূল স্রোতে ফেরাতে পুষ্টিকর নিউট্রিমিক্স তৈরি করা, মাছ চাষ, জৈব কৃষি, প্রাণী পালনের মতো প্রকল্প হাতে নিচ্ছেন। সবুজ পরিবেশ এবং বৃক্ষরোপণের প্রতি প্রাথমিকভাবে উৎসাহও দেওয়া হচ্ছে।
“তুঁহু মম মাধব, তুঁহু মম দোসর,/ তুঁহু মম তাপ ঘুচাও/ মরণ তু আও রে আও”- এই অমোঘ সত্যিকে আর ভয় পান না কেউ। মৃত্যু যে যে কারোর জীবনে যখন খুশি আসতে পারে, এই সহজ সত্যিটা মেনে নিয়ে তাঁরা প্রত্যেকে মূলস্রোতে ফিরতে চাইছেন। আর তাঁদের পাশে থাকছেন অসংখ্য মানুষ।
(প্রচ্ছদের ছবি প্রতীকী)