কোন্নগরে অবনীন্দ্রনাথের বাগানবাড়ি : যেখানে তিনি প্রথম কুঁড়েঘর আঁকতে শিখেছিলেন

প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এই বাড়ির দরজা

সাদা রঙের একতলা ভবন। খড়খড়ি দেওয়া জানলা, উঁচু উঁচু খিলান, আর কড়ি-বর্গার সাবেকি ছাদ। বাড়ির সামনে দিয়ে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে সোজা গঙ্গা পর্যন্ত। ডানদিকের ঘরে জানলার ঠিক পাশটিতে বসে এক মনে ছবি আঁকছেন কিশোর অবনীন্দ্রনাথ। আবার কখনও নদীর দিকে তাকিয়ে একমনে বুনে চলেছেন কল্পনা।

মূল ফটক

দীর্ঘ সময় ধরে জীর্ণদশায় পড়ে থাকার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগ এবং কোন্নগর পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে ২০২০ সালের ৫ মার্চ নতুন করে সেজে উঠেছে গঙ্গার ধারে এই প্রাচীন স্মৃতি সৌধটি। “আমরা কিন্তু রীতিমতো লড়াই করে এই বাড়ি লাখোটিয়াদের থেকে উদ্ধার করেছি। কোর্ট কেস চলেছে বহুদিন। নাহলে হয়তো দেখতেন এতদিনে এখানেও কোনো এক প্রোমোটার এসে পেল্লাই ফ্ল্যাট তুলে দিয়েছেন। আর সেই ফ্ল্যাটের নিচে অচিরেই কবর পেয়েছে এই এতো এতো স্মৃতি”, বললেন কোন্নগর পৌরসভার (Konnagar Municipality) কর্মচারী শুকদেব ঘোষাল।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি 

এই বাগান বাড়িটির প্রতিটি ইঁট সাক্ষী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Abanindranath Thakur) ছোটোবেলার। এখানে বসে তাঁর চিত্র শিল্পের শুরু। ১৯৪৪ সালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ গ্রন্থে উল্লিখিত আছে, তিনি এই বাগানবাড়িতে বসেই জীবনে প্রথম কুঁড়েঘর আঁকতে শেখেন। এমনকি রবি ঠাকুরের জীবনস্মৃতিতেও এই বাড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। অবনীন্দ্রনাথ নিজের জীবনীমূলক গ্রন্থে বলেছিলেন,

“কোন্নগরে কি আনন্দেই কাটাতুম।…

সেই সেবার কোন্নগরে আমি কুঁড়েঘর আঁকতে শিখি।…”

(- জোড়াসাঁকোর ধারে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।)

২০১৭ সালে হেরিটেজ তকমা পায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগানবাড়িটি। মাথাপিছু ১০ টাকা করে টিকিটের বিনিময়ে এ বাড়িটির মধ্যে আপনি খুঁজে পাবেন শান্তিনিকেতনের পরিবেশ।

১৮৭০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাগানবাড়িটি নির্মাণ করেন। পিতার উত্তরাধিকার সূত্রেই পরবর্তী কালে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়ির মালিক হন। অবন ঠাকুরের চিঠিপত্র এবং স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, তাঁর পিতা গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়ি নির্মাণের উদ্দেশ্যে সেই সময় প্রচুর অর্থব্যয় করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাড়ির অন্দরসজ্জা এবং আসবাবপত্রের মধ্যে ছিল অসাধারণ শৈল্পিক নৈপুণ্য। বাগান বাড়ির রাজকীয়তা এবং প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ থাকায় শিশু সাহিত্যিকের মনে হতো তিনি যেন অন্যরকম জগতে তাঁর শৈশব কাটিয়ে ছিলেন। তাঁর লেখনী থেকে এ-ও জানা যায়, এই বাগান বাড়িতে নাকি সপ্তাহান্তে জমজমাট আসর বসতো গুণীজনদের।

বাগান ঘেরা বাড়ি

সোম থেকে রবি, প্রতিদিন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এই বাড়ির দরজা। সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। মাথাপিছু ১০ টাকা করে টিকিটের বিনিময়ে এ বাড়িটির মধ্যে আপনি খুঁজে পাবেন শান্তিনিকেতনের মতো পরিবেশ। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, বেল সহ নানারকম বাহারি ফল ও ফুলের ভরপুর আমেজ।

‘জোড়াসাঁকোর ধারে’-তে একবার তিনি লিখছেন, “রাত জেগে দেখেছি চেয়ে, কাঁঠালতলায় যেন সত্যি কাঠবেড়ালির বিয়ে হচ্ছে, খুদে খুদে আলোর মশাল জ্বালিয়ে এলো তাঁদের বরযাত্রী বরকে নিয়ে, মহা হৈ চৈ, বাদ্যভান্ড, দৌড়াদৌড়ি, হুলুস্থুলু ব্যাপার। সব দেখেছি কল্পনায়। কাঠালতলায় যে জোনাকি পোকা জ্বলছে তখন তা জ্ঞান নেই।” এ কল্পনা অবন ঠাকুর করেছিলেন হুগলির এই বাগানবাড়িতে বসে। অবন ঠাকুরের আর দোষ কি! এই পরিবেশে কল্পনাও যে হয়ে যায় ঘোর বাস্তব। তাঁর এই লেখনি কাঁঠালবাগানে এখনও সংরক্ষণ করা রয়েছে।

কাঁঠাল তলা 

২০১৭ সালে বাগান বাড়িটি হেরিটেজ তকমা পাওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষের আনাগোনা হয় এখানে। ছুটির দিনে সেই সংখ্যাটা প্রায় ৩০০ ছড়িয়ে যায়। এই বাগানবাড়ির দায়িত্বে থাকা অপর একজন কর্মচারী অমিত চ্যাটার্জি জানান, “মাত্র কয়েকদিনের এই পথচলায় জনপ্রিয়তার নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ সরকারে পর্যটন মানচিত্রে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগান বাড়িটি প্রথম স্থান দখল করেছে।”

মূল ভবনের ভিতরে রয়েছে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা বিভিন্ন ছবির রেপ্লিকা। এছাড়াও রয়েছে তাঁর নিজের আঁকা আত্মপ্রতিকৃতি। রয়েছে তাঁর অনন্য সৃষ্টি কাটুমকুটুমের নিদর্শনও। ভবন বাঁদিকের রাস্তা দিয়ে বেরোলেই চোখে পড়ে প্রাচীন একটি স্নানাগার। প্রধান কর্মকর্তা শুকদেববাবু জানান, “এখানেই সেকালে ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা স্নান করতেন। এখন এই জলে বেশ কিছু কচ্ছপের বাস।” শুকদেববাবু আরও খানিকটা ঘুরিয়ে দেখান। বাগানের কোন গাছটির কতো বয়স, কোথায় বিষধর সাপের আস্তানা, কোন সময় কোন পরিযায়ী পাখির আনাগোনা হয় অথবা কোথায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর বসে ইত্যাদি সব কিছুই একজন দক্ষ গাইডের মতো বুঝিয়ে দিলেন। লক্ষ্য করলাম কী অসাধারণ দক্ষতায় তিনি মুখে শব্দ করে জলে থাকা রঙিন মাছেদের এক জায়গায় জড়ো করছেন। “সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে একটি দিন করে আমাদের ছুটি থাকে। কিন্তু আমি এমন ভাবেই জড়িয়ে গিয়েছি এই বাগানের প্রতিটি গাছ এবং প্রাণীদের সঙ্গে যে ছুটির দিনগুলোতেও চলে আসি”, বললেন শুকদেব ঘোষাল।

স্নানাগার

শুকদেববাবুর এই জড়িয়ে পড়া যে কেবল কথার কথা নয়, তা ওই কয়েক মুহূর্তেই বেশ ঠাহর করতে পারলাম। কখন যেন আমিও জড়িয়ে পড়েছি মাদার গাছের আঁধার আর গঙ্গার স্নিগ্ধ হাওয়ার সঙ্গে। প্রায় ১৩ বিঘা জমির উপর নির্মিত এই বাগান বাড়িটি যেন আস্ত একটা সময়ের দলিল। যে দলিলে কেবল হিন্দুদের নাম খোদাই আছে তা নয়, রয়েছে ইসলাম দস্তাবেজও। এই বাগানের দক্ষিণ পূর্ব কোণে আজও টিকে রয়েছে সৈয়দ পীর বাবার মাজার। অপূর্ব এ সহাবস্থান। বিভেদের মাঝে যেন মহা মিলনের বার্তা।

পীর বাবার মাজার 

কলকাতা থেকে সহজেই আসা যায় হুগলি জেলার কোন্নগর ২ নম্বর  মীর পাড়া লেনে অবস্থিত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগান বাড়িটিতে। হাওড়া থেকে লোকাল ট্রেনে ষষ্ঠ স্টেশন কোন্নগর। স্টেশন থেকে মিলবে টোটো অথবা রিক্সা। এছাড়াও সড়কপথে জিটি রোডের ওপর মীর পাড়া বাস স্টপেজে নামলে চোখে পড়বে সেই পুরোনো গলি। গলিতে ঢোকার মুখেই রয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি। যেন স্বয়ং পাহারা দিচ্ছেন তাঁর প্রিয় বাগানবাড়িটি। যে বাড়ির অন্দরে কান পাতলে মেলে এক অন্যরকম নিস্তব্ধতা। মেলে কবীর সুমনের বিখ্যাত গানের কলি – “ছলাৎছল ছলাৎছল ছলাৎছল…ঘাটের কাছে গল্প বলে নদীর জল…”

 

ছবি – কঙ্কনা মুখার্জী

Developed by DXDasia