একটি সার্থক বাংলা থিয়েটার
ম্যাজিক রিয়্যালিজম-এর সঙ্গে বাঙালির পরিচয় বহু আগে থেকেই, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে কঙ্কাবতীর আমল থেকে। এছাড়া দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, গগণেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ এবং তার পরবর্তীতে আরও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাহিত্যে ও শিল্পে বাস্তবের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলেছে অবাস্তব দুনিয়া, কখনও সৃষ্টি হয়েছে রূপকথার আবহ, আবার কখনও সৃষ্টি হয়েছে স্বপ্নরাজ্য। তবে রূপকথার আবহের সঙ্গে যদি পলিটিক্যাল স্যাটায়ার মিশে যায়, তাহলে যে বিষয়টা তৈরি হয়, সেটিরই প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাংলা থিয়েটার প্রযোজনা খোক্কস।
এক ছাতার তলায় নির্দেশক ও সিনোগ্রাফার হিসাবে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়, প্রোটাগনিস্ট হিসাবে দেবশঙ্কর হালদার, সুরকার হিসাবে রূপম ইসলাম এবং অভিনেতা ও গীতিকার হিসাবে অনির্বাণ ভট্টাচার্য (সাংবাদিক) এবং কার্টুনিস্ট হিসাবে সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায় এলে যে কী ফলাফল হতে পারে সেটি খোক্কস দেখলে বোঝা যায়, বা বলা ভালো একমাত্র খোক্কস দেখলেই বোঝা যায়।
‘খোক্কস’ প্রযোজনাটি বিরল অনেকগুলি কারণে। প্রথমত, নাটকটির প্রাথমিক কাঠামো খুবই চিরাচরিত। কোনো এক দেশের মানুষ এক খোক্কসের জ্বালায় চারশো বছর ধরে অতিষ্ট, বহিরাগত হিরো এসে খোক্কসকে পরাজিত করবে ও রাজ্যের মেয়েদের সুরক্ষিত করবে, আপাতভাবে গল্পের কাঠামো এইটাই। তবে প্লটে ট্যুইস্ট আসে যখন দেখা যায় রাষ্ট্রশক্তি খোক্কসের পক্ষে, তারা খোক্কসকে পরাস্ত না করতে চেয়ে তাকে তোয়াজ করে চলে, জনগণও হাজার বিপত্তির পরেও খোক্কসপন্থী। এবার কী করে সেই বহিরাগত স্বপনকুমার খোক্কসকে হারাবে, রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী ও তার ছেলে রূপকুমারের কী অবস্থান হবে খোক্কসের মৃত্যুর আগে এবং পরে, মণিমালা আর স্বপনকুমারের আবার দেখা হবে কিনা, এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখতে হবে খোক্কস।

নাটকের আখ্যান কাঠামো নিয়ে এর থেকে বেশি কথা বলা উচিত নয়, তাই আপনাদের অন্য একটা গল্প বলি। ধরুন আপনি একটি মেয়েকে ভালোবাসেন। মেয়েটির নাম ধরা যাক চাঁপা। চাঁপাকে রোজ গলির মোড়ে ফোন্টুস টোন টিটকিরি করে। চাঁপার আরও এক প্রেমিক আছে, ধরে নিলাম তার নাম পরাগ। এবার পরাগ ফোন্টুসের পিছন পিছন ঘোরে চাঁপাকে ফোন্টুসের মারফত পাওয়ার জন্য। একদিন চাঁপা ফোন্টুসের সব ঘটনা আপনাকে বলার পর আপনি ফোন্টুসের উপর দ্বিগুন চোটপাট করলেন, ফোন্টাস ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল। এবার আপনি যখন বিজয়গর্বে গর্বিত হয়ে ফিরে আসছেন, তখন দেখলেন পরাগ ততক্ষণে চাঁপার বাড়ির লোককে কনভিন্স করে ফেলেছে যে ফোন্টুসকে পরাগই পাড়াছাড়া করেছে, আপনি নন। পরাগের এই কথা চাঁপা বিশ্বাস না করলেও চাঁপার বাড়ির লোক পরাগের কথা বিশ্বাস করে আপনাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পরাগকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করেছে। একবার ভাবুন পরিস্থিতিটা। এবার ভাবতেই পারেন নাটক নিয়ে কথা বলতে এসে এইসব গল্প কেন শোনাচ্ছি। এর উত্তর পাবেন খোক্কস-এ।
এবার আসতে হচ্ছে খোক্কসের নাটককারের প্রসঙ্গে। নাটকের টিকিটে, ফ্লেক্সে, খোক্কসের নাটককারের নাম আমরা জানতে পারি না। একটু খোঁজাখুঁজির পর এবং নাটকের কার্টেন কল থেকে জানা যায় খোক্কস নাটকের মূলে আছে ইভাগনি শোরটস-এর ‘দ্য ড্রাগন’। তার বঙ্গীকরণ করেছেন অর্পিতা ঘোষ।
দেবশঙ্কর হালদারের অভিনয় ইদানীংকালে স্টুডিও টাইপ হয়ে যাওয়া নিয়ে অনেক দর্শক যে প্রশ্নটা তুলতেন, তাদের মুখে একটি সপাটে উত্তর ছুড়ে মেরেছেন দেবশঙ্কর। স্বপকুমার চরিত্রটিতে নিজেকে ভেঙে, আঙ্গিক ও বাচিক অভিনয়ের যে চূড়ান্ত পর্যায়টিতে নিয়ে গিয়েছেন তিনি এবং নিজের প্রথাগত ভঙ্গি ছেড়ে যে প্রয়োজনীয় ‘ক্যাওড়ামি’টি তিনি মঞ্চে করেছেন, সেটি অনেকদিন মনে থাকার মতো। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রে বুদ্ধদেব, অনির্বাণ, কোরক, অভ্র, নীলাভ, আশিক, ময়ূরছন্দা, জয়ন্ত-সহ প্রত্যেকেই যথাযথ।

খোক্কস দর্শককে একটা পরিপূর্ণ থিয়েটারের স্বাদ দেয়। তার প্রেজেন্টেশন, আলোর ব্যবহার, সমাজ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শুনতে থাকা কিছু ‘রিলস’ বিখ্যাত মিউজিক, সবটা ব্যবহার করে এত সরলভাবে কঠিন বাস্তব এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার কথা দেবেশ চট্টোপাধ্যায় তুলে ধরতে পেরেছেন মঞ্চে, তা কুর্নিশযোগ্য। এই নাটক আদ্যপান্ত খুবই স্টাইলাইজড। সে প্রতিটা বেল পড়ার সময়ে বিচিত্র শব্দ হোক, বেড়ালের সাজপোশাক হোক, উড়ন্ত কার্পেট হোক বা অদৃশ্য হওয়ার টুপি হোক। অনির্বাণের লেখায় ও রূপম ইসলামের সুরে যে গানগুলি নাটকে ব্যবহৃত হয়, সেগুলি শুনতে খুবই ভালো লাগে, তবে পিছনের স্ক্রিনে প্রোজেকশনে গানের কথাগুলো ফুটে উঠলেও, গানের সময় সব কথা কান পর্যন্ত এসে পৌঁছায়না বা শোনা যায় না। এই একটি ব্যাপারে আরও একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে হয়।
নাটকের মধ্যে পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা ঢোকাতে গিয়ে প্রযোজনার শিল্পগত মান অক্ষুণ্ন থাকছে কি না সেদিকেও নজর রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে শিল্পগতভাবে এবং সার্বিক রাজনীতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার দিক থেকে, দেবেশ চট্টোপাধ্যায় নির্মিত এই ম্যাজিক রিয়ালিস্টিক পলিটিক্যাল স্যাটায়ার ‘খোক্কস’ সামগ্রিকভাবে সফল বলে মনে করা যায়।
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব।