
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন একজন মানুষ, যিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে, তা সত্ত্বেও সৃজনের যে ধারা তিনি তৈরি করেছেন, সেটা রবীন্দ্রনাথের প্রভাবকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছিল স্বতন্ত্র্। লেখায়, ছবি আঁকায়, বিচিত্র সব শিল্প সৃষ্টিতে, শিল্প সমালোচনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তী। ঋষির মতো প্রজ্ঞাবান সেই মানুষটার ছিল শিশুর মতো সরল এক মন। ছোটোবেলা থেকেই প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করতেন নতুন করে। পাখিদের প্রতি তাঁর আকর্ষণ গড়ে ওঠে অল্প বয়স থেকেই।
আরও পড়ুন
গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার কেন বাংলা আক্রমণ করতে ভয় পেয়েছিলেন?
ছোটোবেলায় তিনি প্রাণভরে দেখতেন, বাড়ির দক্ষিণদিকের বাগানে ছিল পোষা সারস, পুকুরে নেমে মাছ শিকার করত। পেখম মেলে ঘাসের ওপর চলাফেরা করত পোষা ময়ূর। বাড়ির দোতলায় দক্ষিণের বারান্দার পুবদিকে জাল ঘেরা এক মস্ত খাঁচার মধ্যে ছিল ছোটো ছোটো পোষা পাখির ঝাঁক। দেওয়ালে একটা হরিণের শিঙের ওপর বসে থাকত লালঝুঁটি এক কাকাতুয়া। টুনি বলে একটা ছেলে একবার একটা দামি পাখি উড়িয়ে দিয়ে পালায়। দোষটা পড়ে ছোট্ট অবন ঠাকুরের ঘাড়ে। তবে সেবার তিনি টুনির বিদ্যে ফাঁস করে দিয়ে রক্ষা পেয়ে যান।
আরও পড়ুন
সারা ভারতের মধ্যে প্রথম হাতি পোষ মেনেছিল এই বাংলায়
অবন ঠাকুরের ছোটো মেয়ে মারা গিয়েছিল প্লেগের সংক্রমণে। সেই শোকে ধাতস্থ হতে অবনীন্দ্রনাথ সপরিবারে জোড়াসাঁকো ছেড়ে চৌরঙ্গীর এক বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। শোকাহত স্ত্রী সুহাসিনী দেবীর মন ভোলানোর জন্য টিয়া, চন্দনা, ময়নার মতো অনেকগুলো পাখি কিনে এনেছিলেন সেই বাড়িতে। বাচ্চা পাখিদের মুসুর ডাল সেদ্ধ, ছাতুর মতো সব খাবার খাইয়ে বড়ো করতেন। ওড়ার বয়স হলে উড়িয়ে দিতেন আকাশে। কোনো পাখি অসুস্থ হয়ে পড়লে বইপত্র ঘেঁটে ওষুধ খাইয়ে তার পরিচর্যা করতেন। বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। যদি দেখতেন, পাখিটা আর বাঁচবে না, তখন পাখিটাকে নিয়ে তার মৃত্যু পর্যন্ত স্থিরভাবে বসে থাকতেন।
আরও পড়ুন
অতীশ দীপঙ্কর কেন তিব্বতে চলে গিয়েছিলেন?
কৃষ্ণলীলার ছবিগুলি যখন অবনীন্দ্রনাথ আঁকছেন, বাড়ির বাগানে তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন রকমারি সব পাখি। ওইসব পাখির সংস্পর্শ তাঁকে ছবির গভীরে ডুব দিতে সাহায্য করত।
তথ্যঋণ – আপন কথা, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর; বাবার কথা, উমা দেবী।