দার্জিলিংয়ের ম্যালে একদল পাহাড়ি মানুষের নেপালি গান উসকে দেয় স্মৃতি

মোহিনী লাগ লা হই…

দার্জিলিং চৌরাস্তার ম্যাল অর্থাৎ মানে হার্ট অফ দ্য টাউনে বসে একদল পাহাড়ি মানুষ নেপালি সারেঙ্গি বাজিয়ে গেয়ে চলেছেন একটি গান – মোহিনী লাগ লা হই…। দূরে বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। তাকে সাক্ষী রেখে দেশ-বিদেশ- শহর- গ্রাম, হাজার লোকের সমাগম হয়েছে ম্যালে। তাদের কানেও সকলের অলক্ষে ঢুকে যাচ্ছে সেই গানের রেশ। ভারত ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত এক গ্রাম থেকে আসা এই লোক-গায়ক গানের মধ্য দিয়ে ম্যালের বাজারে সপ্তাহে একদিন সবাইকে মাতিয়ে তোলেন। গান শুনতে শুনতে অনেকের মনে হতেই পারে প্রকৃতির যেমন কোনও বিভাজন হয় না, তেমনি মানুষের মনেরও কোনও সীমানা থাকে না। সীমানা থাকে না গানেও। এরকমই একটি গান হল এই ‘মোহিনী লাগ লা হই’। গায়কদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১৯৯১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘চিনো’ নামের একটি নেপালি সিনেমায় ব্যবহার হয়েছিল এই গান।

গানের দলের রাজেন দর্জি গানের অর্থ জিজ্ঞাসা করতে জানালেন, সেই নেপালি সিনেমা ‘চিনো’ আজও পাহাড়ি মানুষের মনে উঁচু-নিচু জাতি নির্বিশেষে ভালোবাসার ছবি হিসেবে সজীব হয়ে রয়েছে। সিনেমায় পাহাড়ি মানুষেরা দেখেছিল একদল শহুরে পড়ুয়ার গ্রামে আসা। কিন্তু শহুরে জীবনযাপন তাদের শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। আর সেই ছেলেরা গ্রামকেও তুচ্ছ মনে করত।

গানের দলের রাজেন দর্জি গানের অর্থ জিজ্ঞাসা করতে জানালেন, সেই নেপালি সিনেমা ‘চিনো’ আজও পাহাড়ি মানুষের মনে উঁচু-নিচু জাতি নির্বিশেষে ভালোবাসার ছবি হিসেবে সজীব হয়ে রয়েছে।

কিন্তু এই গানের মধ্যে দিয়ে সিনেমার নায়ক তুলে ধরেছেন প্রকৃতির অপরূপ রূপকে। গানের মধ্যে বলা হয়, গ্রাম নির্ভর পাহাড়ি প্রকৃতির মধ্যে আছে পবিত্রতা। গানে বলা হয়েছে উঁচু-নিচু পাথর বেয়ে চলা ঝরনা সাক্ষী দেয় পাহাড়িদের কঠিন কিন্তু সহজ সরল জীবন যাপনের। তেমনি এই ঝরনা কোনও দেশ সীমানা বিচার না করে বয়ে চলে আপন ছন্দে। এই গান আরও বলতে চায় যে তুষারে ঢাকা পাহাড় হল ধ্যান মগ্ন সন্ন্যাসী। সে সকলকে শিক্ষা দেয় মনের বিরোধ মুছে দিয়ে ধীর স্থির হওয়ার জন্যে। আসলে সেই গানে মুছে দেওয়া হয়েছিল শহর ও গ্রামের বিরোধ। সিনেমাও সেই ছন্দেই গড়ায়।

আজও পাহাড়ি মানুষেরা বিশ্বাস করেন জঙ্গলের গাছপালা হল জীবন রেখা। যা এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের মিলনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা সকলের কর্তব্য। রাজেনের কথার ইঙ্গিতে বোঝা গেল আজ এক অদ্ভুত সময়। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা কারণেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি গ্রামের সংস্কৃতির সঙ্গে সমতলের শহরের মানুষের দূরত্ব বেড়েছে। তাছাড়া পাহাড় ঘেরা গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গেও বেড়েছে সমতলের দূরত্ব। তাই এমন ভাবেই দার্জিলিং ও নেপালের মধ্যবর্তী মানেভঞ্জন থেকে আগত গ্রাম্য মানুষগুলি সমতল থেকে বেড়াতে আসা শহরের মানুষের কাছে গ্রাম ও শহরের মনের মিলনের গান শোনাচ্ছিলেন ম্যালের বাজারে বসে।

Developed by DXDasia