লক্ষ্মীদেবীর হাতে বানানো নকশাকাটা প্যারা : দার্জিলিংয়ে এক টুকরো রাজস্থান

লপচু বাজারে মিলবে এই মিষ্টি

রফ ঢাকা হিমালয়ের কোলে ছোট্ট জনপদ দার্জিলিং। সেখানে লামাহাট্টার কাছে ব্যস্ত বাজার লপচু। এই বাজারেই মেলে পাহাড়ি মানুষের প্রিয় মিষ্টি নকশা ছাপের প্যারা। যে ফুল ছাপের প্যারা সকলের অজান্তেই ধরে রেখেছে এক চিলতে রাজস্থান।

লক্ষ্মীদেবী, প্রায় বাহান্ন বছর আগে রাজস্থানের তুরু জেলার বসতবাটি ছেড়ে কাজের সূত্রে পাহাড়ে আসা স্বামীর সঙ্গে পৌঁছেছিলেন পাহাড় ঘেরা দার্জিলিংয়ের লপচুতে। বালু রাশি, ক্ষেতের সবজি চাষ, গৃহপালিত উট, গরু, বাছুরের সঙ্গে খেলাধুলো করে বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীদেবীর কাছে এই পাহাড় ঘেরা অঞ্চল যেন এক অন্য জগৎ। বরফ চাদরে ঢাকা পাহাড়, সংলগ্ন বন জঙ্গল আর কয়েকঘর লোকের বসতি নিয়েই সেদিনের লপচু, লামাহাট্টা আর কিছু জনপদ। সারাদিনে নানা কাজের পর সন্ধ্যা নামলেই চারদিক নিঝুম নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই লক্ষ্মীর চোখে ছবির মতো ভেসে ওঠে আত্মীয় পরিজনের মুখ। আর ঠিক তখনই দেশের সেই স্মৃতিকে সজীব করে আঁকড়ে ধরার জন্য দুধ জ্বাল দিয়ে বানাতে শুরু করলেন মিষ্টি প্যারা। স্মৃতিচারণ আর নিস্তব্ধতার একঘেয়েমি কাটানো দুই-ই হয় একসঙ্গে। আর রীতি অনুসারে পরিবারের সবার জন্যই বানাতে হয় প্যারা। এভাবেই নিজেকে একটু ব্যস্ত রাখার প্রয়াস। সেই ব্যস্ত রাখার হাত ধরেই লপচু, লামাহাট্টা অঞ্চলে পাহাড়ের কোলে শুরু হয়ে গেল রাজস্থানি ঘরোয়া মিঠাই বানানোর রেওয়াজ।

দেখতে দেখতে লক্ষ্মীদেবীর পাহাড়ি প্রতিবেশীদের মধ্যে নকশা কাটা প্যারার কদর বাড়তে থাকে। এই ফুল নকশার মিঠাই খেতে যেমন ভালো, আবার মুখে দিলেই গলে যায়। ক্ষীরের তৈরি, তাই বেশ কয়েকদিন রেখেও খাওয়া যায়।

সেই প্যারাতে লক্ষ্মীদেবী কাঠি দিয়ে ফুটিয়ে তুললেন রাজস্থানের মহিলাদের পরম্পরাগত বিন্দি ও উল্কির নকশা। তারপর বাড়িতে পাহাড়ি মানুষ যাঁরাই আসেন লক্ষ্মীদেবী মুখমিষ্টির জন্য তাঁদের হাতেও তুলে দিতেন নিজের হাতে বানানো নকশা কাটা রাজস্থানি কিসিমের প্যারা।

দেখতে দেখতে লক্ষ্মীদেবীর পাহাড়ি প্রতিবেশীদের মধ্যে নকশা কাটা প্যারার কদর বাড়তে থাকে। এই ফুল নকশার মিঠাই খেতে যেমন ভালো, আবার মুখে দিলেই গলে যায়। ক্ষীরের তৈরি, তাই বেশ কয়েকদিন রেখেও খাওয়া যায়। পাহাড়ি মানুষদের জানা ছিল না দুধের এমন ব্যবহারের রীতিনীতি। ধীরে ধীরে আশ-পাশের বাড়ি-গ্রাম সব জায়গাতেই লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে ফুল নকশার প্যারার সুনাম। দেখতে দেখতে লক্ষ্মীদেবীর কাছ থেকে পাহাড়ি স্থানীয় লোকজন এমন প্যারা নিতে থাকেন শুভ কাজ কিংবা পুজো-পার্বণের জন্য। টাকা দিয়ে প্যারার বায়না করেন পাহাড়ি মানুষেরা।

সেই শুরু। আজ সেই মিষ্টি লপচু বাজারের ‘টপ স্টার’ সুইট। পাহাড়ি মানুষ সেই প্যারাকে রাজস্থানের নয়, নিজেদের বলে আদর দিয়ে রাখেন। বলেন, “হামারে ইহাকা ফেমাস সুইট হ্যায়, খাকে দেখিয়ে…”।

লক্ষ্মীদেবীর পরিবারের আজকের প্রজন্ম অমর জৈনের থেকে জানা গেল পাহাড়ের মানুষের কাছে মিষ্টি বলতে শক্ত পাথরের মতো ‘লাল পাথর’ (মিষ্টির নাম) এবং ইয়াকের দুধের তৈরি মিল্ক চকোলেট। তবে এই সব মিষ্টি খুব শক্ত। আসলে এই অঞ্চলের মানুষ গরুর দুধের নরম মিষ্টি তৈরি করতে পারতেন না। একই সঙ্গে দুধের নানাবিধ ব্যবহারিক দিক তাঁদের কাছে অজানা ছিল। বেশিরভাগ বাড়িতেই দিনের শেষে অতিরিক্ত গরুর দুধ ফেলে দেওয়া হত। পাহাড়ি মানুষের কাছে গরুর দুধের চেয়ে গোবরের গুরুত্ব ছিল বেশি। কারণ চাষের জন্য গোবর সার হিসাবে কাজে লাগে। লক্ষ্মীদেবী ওই সময় বিভিন্ন বাড়ি থেকে অতিরিক্ত দুধ সংগ্রহ করা শুরু করলেন। তিনি পাহাড়ি মানুষদের অতিরিক্ত দুধ ফেলে দিতেও বারণ করলেন। এবার প্যারার চাহিদা বাড়তেই সেই অতিরিক্ত দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরি করতে শুরু করলেন নকশা কাটা প্যারা। এভাবেই পাহাড়ে শুরু হল নতুন এক ‘মিষ্টি’ রূপকথা। পথ চলতি মানুষের মধ্যেও এবার চাহিদা বাড়ে প্যারার। ধীরে ধীরে লপচুতে লক্ষ্মীদেবীর তৈরি এই প্যারা লপচুর প্যারা নামে পরিচিতি লাভ করল।

এখন এই প্যারা শুধু মিষ্টির পরিচিতি দেয় না। পরিবর্তে পশ্চিমের বালির দেশের সঙ্গে পাহাড়ের যোগসূত্র তৈরির কাহিনি বলে। আজকের আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে বলতেই হয়, এ হল আসলে লক্ষ্মীদেবীর মতো এক গৃহবধূর ঘরোয়া উদ্যোগ। এই উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘অমর স্মল ইন্ডাস্ট্রি’। স্থান লপচু বাজার, দার্জিলিং। যেখানে ফুল নকশার প্যারার মধ্যে আজও জেগে রয়েছে এক টুকরো রাজস্থান।
 

Developed by DXDasia