চলচ্চিত্র মানুষ ও আরও কিছু : ঋত্বিক ঘটকের জীবনের কড়চা

মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তাঁর চলচ্চিত্রদর্শন

ত্বিক ঘটক-এর কথা উঠলে তাঁরই পরিচালিত একটি ছবির একটি দৃশ্য প্রথমেই মনে পড়ে। ছবির নাম ‘কোমলগান্ধার’। বৃদ্ধ রিফিউজি রূপী ভৃগু মঞ্চে বারবার বলছে তার ফেলে আসা দেশের কথা, পদ্মা নদীর কথা, জীবনের অভ্যাসের কথা, আর জিজ্ঞেস করছে- ‛রিফিউজি হবো ক্যানে?’ অন্য একজন উত্তর দিচ্ছে- ‘খাতি পাবা বলে, ওইপারে যাও, বাস্তুহারা রিফিউজি হইয়া, বাবুরা নাম দেছে কাগজে…’। পিছনের পর্দায় ছায়ার মতন আবালবৃদ্ধবনিতা পথ বেয়ে নীচে নেমে যাচ্ছে। বাংলা ভেঙে গিয়েছে। এই ভাঙা বাংলার চিৎকার, বিক্ষোভ, রাগ, স্মৃতি আর আদর বুকে নিয়ে ঘুরেছেন ঋত্বিক, আজীবন।

ঋত্বিক ঘটকের বই চলচ্চিত্র মানুষ ও আরও কিছু জুড়েও রয়েছে সেই বাংলার কথা, তার স্মৃতি ও স্মৃতিভ্রংশ, তার শিল্প, রাজনীতি…. চলচ্চিত্র, আর সেসব নিয়ে ঋত্বিকের স্বগোতক্তি, জিজ্ঞাসা, খোঁজ। ‘কিছু খণ্ড চিন্তা : কিংবা কিছু উপলব্ধি’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি নিজের ছোটোবেলার কথা লিখছেন- “আমার দিন কাটিয়াছে পদ্মার ধারে, একটি দুঁদে ছেলের দিন। গহনার নৌকার মানুষদের দেখিয়াছি, যেন অন‍্য গ্রহের বাসিন্দা।… কিন্তু আমি ছোটোবেলার সেই রূপকথা- চোখে দেখিতে পাইতেছি না। সেটি হারাইয়াছি।…যাহা দেখিয়াছি, তাহা দেখাইতে পারিতেছি না।” এই হাহাকারের ভিতর দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় সেই প্রশ্ন, যা মানুষকে ভাবিয়ে এসেছে বহুকাল- দেশ মানে আসলে কী? দেশ মানে রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক একটি গঠন? দেশ মানে প্রশাসন? না কি দেশ মানে ভিটে, গাঁ, মায়ের গায়ের গন্ধ, উঠোনের ধারে চেনা গাছ? ‘কোমলগান্ধার’ ছবির উপরোক্ত দৃশ্যে ক‍্যামেরা জুম আউট করলে দেখা গেল মঞ্চের সামনে বসা দর্শকরা দৃশ্যটি উপভোগ করছেন। তাঁদের কারও মুখ দেখা যায় না। মনে হয়, সেই দর্শকের মধ্যে কোথাও আমরা বসে আছি, যারা সেই অবস্থার ভুক্তভোগী, কিন্তু নিজেদের মুখ দেখতে পাচ্ছি না, মন দেখতে পাচ্ছি না। 

বাংলা, তার বিষাদ আর সাধারণ মানুষের প্রেক্ষাপট ছড়িয়ে রয়েছে ঋত্বিক ঘটকের জীবন ও চলচ্চিত্র জুড়ে। তাঁর কথায়- “আমার ছবিগুলিতে আমি যত দূর পেরেছি চেষ্টা করেছি আমার দেশ ও আমার দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতনকে চিত্রিত করতে।” এ কথা শুধু দাবি নয়, সত্য, যে সত‍্যের হাত ধরে ভৃগু আর অনসূয়া রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ফেলে আসা দেশ দেখে, যে দেশে আর ফেরা যায় না। মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে মন্টুর ফ‍্যাক্টরি থেকে চিঠি এসেছে, মন্টুর আহত হওয়ার খবর নিয়ে। মন্টুর মৃত্যু হয়নি, শুধু আঘাত লেগেছে জানতে পেরে তার বাবা বলেন- “যন্ত্রে গ্রাস করিতে পারে নাই। This was expected। এটাই নিয়ম।” কোন নিয়ম? বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনজোড়া মহতি বিষাদ? যাকে বারবার বলে গেছেন ঋত্বিক? দু-হাতে মেখেছেন সর্বাঙ্গে, বোধে ও জীবনে। তিনি নিজের আত্মজীবনীতে লিখলেন- “রবি ঠাকুর একটা কবিতা লিখে গেছলেন- ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার মনে মনে’।…বিষ্ণু দে তার বহুবছর পরে এক কবিতার বই ছাপলেন যার নাম ‘কোমল গান্ধার’। রবীন্দ্রনাথের সেই যে একটি বর্ণনা, এক বিষাদাচ্ছন্ন ষোড়শী জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছে- বিষ্ণুবাবু তাকে equate করলেন সমগ্র বাংলাদেশের সঙ্গে। কিন্তু আমার বাংলা ভাঙা বাংলা। …গোড়ার কথা হচ্ছে- মিলন। যতদিন দুই বাংলা না মিলবে ততদিন ভাঙা বাংলার কপাল ভাঙাই থাকবে। এটুকুই কোমল গান্ধার-এর মূল বক্তব্য।…ওর মধ‍্যে অনেক ভালোবাসার কথা বলা ছিল।”

কোমল গান্ধার ছবির দৃশ্য

এই ভালোবাসাই তাঁর জীবনদর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানতেন- মানুষের সঙ্গে যোগ, মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের মধ‍্যে অনন্তকে প্রত্যক্ষ করা- এই হচ্ছে শিল্পীর সারাজীবনের কাম্য এবং সাধনা। তাই ‘সমাজে চলচ্চিত্র’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি দ্বিধাহীনভাবে লেখেন- “রবিবাবুর মতো লোক, যিনি অনেক বাজে লেখার মধ‍্যেও কিছু কিছু ভালো লেখা লিখেছিলেন তিনিও চেঁচিয়ে বলেছিলেন যে, শিল্পকে শিল্প হতে হলে প্রথমে সত‍্যনিষ্ঠ হতে হয়। তার পরে সৌন্দর্যনিষ্ঠ। শিল্পকে সুন্দর হতেই হবে, কিন্তু সত‍্যকে বর্জন করে নয়। সে সত‍্য সামাজিক সত‍্য। মানুষের অভাব, প্রয়োজন, অনটন-এর উপরে দাঁড়াতে হবে শিল্পীকে।”

 

প্রসঙ্গ চলচ্চিত্রে নগ্নতা:

চলচ্চিত্রে নগ্নতা বিষয়ে ঋত্বিক ঘটকের ধারণা ও মতামত ছিল স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন- “দেশে দেশে যুগে যুগে শ্লীলতার ধারণা বিভিন্ন আকার ধারণ করেছে। যে দেশে খাজুরাহো কোনারকের ফ্রিজ-গুলো মন্দিরের রূপ বৃদ্ধি করেছে সে দেশে মাত্র চুম্বনের প্রসঙ্গেই ঝড় উঠেছে। …যা সৎ, যা মানুষের অগ্রগতির সহায়ক এবং যা জীবনিশক্তি স্ফূরণে আকাশী- সেটাই হচ্ছে শ্লীল।…প্রকৃতপক্ষে, অশ্লীল হচ্ছে সেটাই যা মিথ‍্যের আশ্রয় গ্রহণ করে।”

সুবর্ণরেখা ছবির দৃশ্য

এবং সত‍্যজিৎ:

দুই পরিচালকের দ্বন্দ্বমূলক শ্রদ্ধার সম্পর্ককে কখনও আড়াল করেননি ঋত্বিক। সেই শ্রদ্ধা আরও স্পষ্ট হয়, যখন তিনি লেখেন- “আমি মনে করি ভারতবর্ষে ছবির মাধ‍্যমটাকে যদি কেউ বোঝে তবে তিনি হচ্ছেন একমাত্র সত‍্যজিৎ রায়।…’পথের পাঁচালি’-তে এমন কিছু নেই যা আমরা হাজার বার ভাবিনি এবং স্বপ্ন দেখিনি।” সেই তিনিই ‘সোনার কেল্লা’ বা ‘অভিযান’-এর মতন ছবিগুলিকে তীব্র ভর্ৎসনা করতে ছাড়েননি। আসলে তাঁর কাছে সর্বোচ্চ ছিল তাঁর জীবনবোধ, আদর্শ, সব খুইয়েও যার থেকে বিচ‍্যুত হননি ঋত্বিক।

মেঘে ঢাকা তারা ছবির দৃশ্য

 

সেই আদর্শ জুড়ে ছিল মানুষ- শ্রমিক, কৃষক, ছিন্নমূল, বেশ্যা, শিশু। সুবর্ণরেখা চলচ্চিত্র-এর ঈশ্বর চক্রবর্তী মদ্যপান করে বেশ্যালয়ে যাবার জন‍্য রওনা হয়ে এক রেফিউজি কলোনিতে নিজের মায়ের পেটের বোন সীতার সামনে গিয়ে হাজির হয়। এবং মেয়েটি আত্মহত‍্যা করে। এই দিক ভুল করা বাংলাকে তিনি চিৎকার করে সাবধান করেছেন ঋত্বিক। রিফিউজি ক‍্যাম্প, কলোনি হয়ে এখন পাড়া হয়েছে, কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার দুঃখবোধ, বেঁচে থাকার লড়াই আজও প্রায় একই। কৃষকের ছবি, শ্রমিকের ছবি মূলধারার বাংলায় আজও ক’টা হয়, যার কথা বলেছিলেন ঋত্বিক? সমাজে আজও ধর্ম খেয়ে ফেলে খিদেকে, আর ক্লান্ত মধ‍্যবিত্ত গা-বাঁচিয়ে রূপকথা হাতড়ায়। মূলধারার বেশিরভাগ ছবিতে তাঁরই কথা অনুযায়ী- “…তার মাঝখানে মেক-আপে এইসব সাজিয়ে গুজিয়ে গড়া মেয়ে আর কতগুলি কাল্পনিক চরিত্রের ছেলেগুলো এবং তাদের ভিত্তিতে এরা একটা স্বপ্নরাজ‍্য করে তুলল।” ঠিক এইখানেই ঋত্বিক ঘটকের ছবিগুলি আজও বড়ো প্রাসঙ্গিক, যাঁর ছবিতে বাংলার ঘাটে-আঘাটায় শুধু মানুষ, মানুষ আর মানুষ।

                                                                                            তথ্যসূত্রঃ চলচ্চিত্র মানুষ ও আরো কিছু- ঋত্বিক ঘটক

Developed by DXDasia