শঙ্খ ঘোষ : আজও বাঙালি জাতিসত্তার মূর্তমান প্রতীক

ছোট্ট একটা স্কুল। হলদেটে প্রচ্ছদ। মধ্যিখানে ছিমছাম স্কুলবাড়ি। দু’পাশে গাছ। সহজ। বইখানা খুলে দেখি—ক্লাসঘর রং করে, বাগান পরিপাটি সাজিয়ে, শুরু হয়ে গেছে রাত্রিবেলার ক্লাস। খোলা মাঠ। হাতে লম্বা পাঁচ-ব্যাটারির টর্চ। বিএসসি মাস্টারমশাই হাজির। ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকগুলো ক্লাস এইট। আকাশে টর্চের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাস্টারমশাই চেনাচ্ছেন—কোথায় ধ্রুবতারা! ওই যে উত্তরপুবে সপ্তর্ষি! অরুন্ধতি কোন সরলরেখা বরাবর ফুটে আছে সন্ধ্যায়! সেই মুহূর্তে, শঙ্খ ঘোষ (Shankha Ghosh) লিখছেন: “…টর্চের আলো যে আকাশ পর্যন্ত পৌঁছয় না, সেটুকু বোধ অবশ্য তখনও আমাদের ছিল। কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম, কী কাজ করে ওই টর্চ।” কী কাজ করে আসলে? যে দৃষ্টিগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে, নক্ষত্র অবধি পৌঁছতে পারছে না, তিরিশ সেকেন্ডের রিল স্ক্রোল করে অস্থির—সেই সমস্ত দৃষ্টিগুলোকে নতুন কোনও চোখ খুঁজে দেয়। টেনে দিতে পারে নক্ষত্র থেকে আশ্চর্য কোনও সরলরেখা। শেখায় আত্মমগ্নতা। শেখায় প্রতিরোধের আগুন। শেখায় মেরুদণ্ড। যদি বলি, বিএসসি মাস্টারমশাইয়ের হাতে যে ওই লম্বা পাঁচ-ব্যাটারির টর্চ তা আদতে শঙ্খ ঘোষ? তবে খুব ভুল বলা হয় কি?

শঙ্খ ঘোষ—শোনামাত্র যে ছবি ভেসে উঠেছে আমাদের চোখে, ধবধবে পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি, অমলিন জহর কোট, স্বল্পভাষী, উদাসীন কোনও প্রাজ্ঞ, পরিভাষায় বুদ্ধিজীবী—তা হয়েছে একটা মিম।

এভাবেই তৈরি হয়েছিল আমাদের চোখ। রাতের আকাশে যখন যখন আলো পড়েছিল, শঙ্খ ঘোষ জার্নালে লিখছেন: “মনে মনে বলি: অন্যের কাছে যে আচরণ আশা করো, তেমনিভাবে গড়ে তোলো নিজের চলাফেরা। তাই বলে এর উল্টোটা কিন্তু ঠিক নয়। যেমন আচরণ করতে চাও তুমি, ঠিক সেইটেই যেন আর আশা কোরো না অন্যদেরও কাছে। তেমন আশা করলেই আহত আর আক্রান্ত হবে মন…”। তখন বোধহয় চিনতে পেরেছিলাম ওই যে, অচেনা কোনও নক্ষত্র! টের পেয়েছিলাম, সেই নক্ষত্র আশেপাশে অথবা মনের ভেতরেই কোথাও ছিল। খুঁজে দেখা হয়নি কোনওদিন। খোঁজ শুরু হয় তখন! সেই লম্বা পাঁচ-ব্যাটারির টর্চের আলোয় কখনও খুঁজেছি শূন্যতা, কখনও খুঁজেছি সংশয়, কখনও নীরবতার চিৎকার, কখনও-বা রাষ্ট্রের প্রতি ছুড়ে দেওয়া একদলা ক্রোধ। খুঁজতে খুঁজতে ফিরে এসেছিলাম আপন আত্মার কাছে। বিস্ময় জাগে! টের পেয়েছিলাম, আনকোরা এক আলোর চোরাস্রোত বইতে শুরু করেছে শরীর জুড়ে।

অন্তর্দীপ্তি কী? বড়ো কঠিন শব্দ লেখা হল। এহেন শব্দ নিয়ে হালফিলে দারুণ ‘খিল্লি’ হয়। যেমন, শঙ্খ ঘোষ—শোনামাত্র যে ছবি ভেসে উঠেছে আমাদের চোখে, ধবধবে পাঞ্জাবি, সাদা ধুতি, অমলিন জহর কোট, স্বল্পভাষী, উদাসীন কোনও প্রাজ্ঞ, পরিভাষায় বুদ্ধিজীবী—তা হয়েছে একটা মিম। যদি শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবীর গুরুগম্ভীর মোড়কটুকু ভেঙে ফেলা যেত, বড়ো আনন্দ পেতাম। আসলে ভেঙে ফেলা হয়েছে বুদ্ধিজীবীর যাবতীয় ধ্যান, চিন্তা, এম্প্যাথি। ফলস্বরূপ আমাদের প্রত্যাশাগুলোর ভিউয়ারশিপ মিলিয়ানের গণ্ডি পেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি কলকাতা শহরেই, ওয়াও মোমোর একটি কারখানায় পঁচিশ জন শ্রমিক জ্যান্ত পুড়ে গেল। খুল্লামখুল্লা। যে ছেলেটার আচরণ পুরুষালি নয়, হিজড়ে বলে দেগে দিচ্ছি আর ভিডিও করছি শুধু। কারণ ভিউয়ারশিপ চাই। একজন চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে অবমাননা করে দেওয়া যায় কী অনায়াসেই। তারপরই, বোধ হয়, আমাদের সব সয়ে গেছে। যেন ‘মাইল, মাইল শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে’। যেহেতু টর্চের আলোও নিভে গেছে ততক্ষণে।

আমরা দেখছি কলকাতা শহরেই, ওয়াও মোমোর একটি কারখানায় পঁচিশ জন শ্রমিক জ্যান্ত পুড়ে গেল। খুল্লামখুল্লা। যে ছেলেটার আচরণ পুরুষালি নয়, হিজড়ে বলে দেগে দিচ্ছি আর ভিডিও করছি শুধু। কারণ ভিউয়ারশিপ চাই।

কিন্তু মশাই, সেই আলোয় বাঙালি কী হতে চেয়েছিল আর কতখানি বেঢপ হয়েছে—সেই উদ্দেশ্যে এ-লেখা ফেঁদে বসিনি মোটেই। মাথার ওপরে অ্যাবসোলিউট একজন আছেন, প্রেমে আছেন, প্রতিবাদে আছেন, কথায় অ-কথায় অভিভাবক-সুলভ ভর্ৎসনা ও প্রশ্রয়ের অফুরন্ত ভাণ্ডার যিনি, সর্বোপরি যেন একটি প্রতিষ্ঠান—এই বোধ আমাদের কেবলমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য, নিশ্চিন্তি আর সুখদেয়। অথচ শঙ্খ ঘোষ লিখছেন: “প্রতিষ্ঠানে থাকাটাই ভয়ের নয়, প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠাই ভয়ের।’’ পড়েছি। অথচ মজ্জাগত হয়নি। যথাযথ আত্তীকরণ হয়নি। রক্তে মেশেনি। বোধহয় আমাদের প্রতিবাদগুলো দাঁত-নখহীন হয়েছে তাই। অথচ যে মেরুদণ্ডের খোঁজে ঘরের এ-কোণ ও-কোণে হামাগুড়ি দিচ্ছিল অযুত-নিযুত! তা কি বলেছিল অপরাধের সম্মুখে, দুর্নীতির পাঁকজলে, সাম্প্রদায়িকতার বিষে নিজেকে আরও আরও বিকিয়ে দিতে? নিশ্চয়ই না! বলেছিল যে কোনও প্রান্তিক মানুষের মৃত্যুর ব্যাকগ্রাউণ্ডে রবীন্দ্রসংগীত চিপকে দেওয়া যায়? কবিতার মুহূর্ত যখন পড়ি, দেখতে পাই ষোলো বছরের একটি মেয়ের মুখ। কোচবিহারের খাদ্য আন্দোলনে, পুলিশ গুলি করেছিল। দেখতে পাই নকশাল আন্দোলনের আগুনে, তিমিরবরণ সিংহের পাল্টে যাওয়া আদল। এভাবেই তৈরি হয়েছিল আমাদের মন। মাথা। মেরুদণ্ড। শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন:

“দাহকাজ সাঙ্গ করে যে যার মতো ফিরে গেছে সবাই
গোটা পাড়া শুনশান
কাছেই শেয়াল ডাকছে
ঘরের পাশে লেগে থাকা রক্তদাগ মুছে নিতে নিতে
বিড়বিড় করছে দাওয়ায় বসে থাকা একলা বুড়ো
জেগে থাকাও
জেগে থাকাও একটা ধর্ম।’’

শঙ্খ ঘোষ যে ধর্মের কথা বলেছেন আর যে ধর্মের জয়ধ্বজা আমরা মেলে ধরেছি—দুইয়ের মধ্যে কোনও মিল নেই। দেখতে পেতাম, চতুর্দিকে কুৎসিত ‘আমি, আমি’। কেবল ‘আমি’-র আস্ফালন।

এইবারই প্রশ্ন উঠবে, সেই ধর্ম পালন করলাম কি? আদৌ করছি? এ-কথা অনস্বীকার্য যে, বাঙালি বড়ো ধার্মিক হয়েছে। নিষ্ঠাভরে প্রতি মঙ্গলবারেই হনুমানের পুজো করছে। কিন্তু এ-ধর্ম উগ্র হতে শিখিয়েছে। উল্লাস করতে শিখিয়েছে। যেন সংকুচিত করতে বলেছে বাঙালির আন্তর্জাতিক গণ্ডিখানা। যে কবিতা আমাদের বলেছিল, “তোমার কোনো ধর্ম নেই, শুধু/ শিকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরা ছাড়া”, সেই সমস্ত শিকড়গুলো উপড়ে ফেললাম তবে? সর্বক্ষণ, একটানা ইন্সটাগ্রাম রিলের মতো অবচেতনে কেউ বা কারা প্রচুর শব্দ করছে আর বলছে, সন্দেহ করো। ভালোবাসাকে। সহ-নাগরিককে। শ্রেণির নিরিখে, জাতের নিরিখে, বর্ণের নিরিখে, লিঙ্গের নিরিখে যে দুর্বল, তাকেই আঘাত করো আর ভিউয়ারশিপ বাড়িয়ে নাও। না-মানুষের দলে ভিড়িয়ে দাও একটা একটা ক্লিকে। অথচ শঙ্খ ঘোষ লিখছেন, নিঃশব্দের তর্জনী। বলছেন: “সুলভ, সুলভ, এত সুলভ বড়োবাজার! দিকদিগন্তে স্ফুলিঙ্গের মতো উৎক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া আজ এমন অকাতর ব’লেই আমরা ভেঙে পড়ছি বড়ো রাস্তার মাঝখানে। মজ্জার ভিতরে গর্ব কই, উপেক্ষা কই? মুখ ঘুরিয়ে উদাসীন স’রে-দাঁড়ানো কই? এখন আমরা দাম্ভিক কিন্তু গর্বিত নই, নির্জীব কিন্তু উদাসীন নই, লুব্ধ কিন্তু লিপ্ত নই…”

অর্থ হয়, আত্ম-সমালোচনা প্রয়োজন। সেই যে টর্চের আলো, টুকরো টুকরো অসংখ্য আলোর উৎস হয়ে ছড়িয়ে আছে সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তায়। গভীরভাবে। টর্চের মুখগুলো ঘুরিয়ে যদি নিজের ওপরেই আলো ফেলতে পারতাম কখনও, স্পষ্ট দেখতে পেতাম: শঙ্খ ঘোষ যে ধর্মের কথা বলেছেন আর যে ধর্মের জয়ধ্বজা আমরা মেলে ধরেছি—দুইয়ের মধ্যে কোনও মিল নেই। দেখতে পেতাম, চতুর্দিকে কুৎসিত ‘আমি, আমি’। কেবল ‘আমি’-র আস্ফালন। ১৯৯৬ সাল। শঙ্খ ঘোষের একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। শবের উপর শামিয়ানা। তিনি লিখছেন:

“লিখে যাই জলের অক্ষরে
আমার মেয়েরা আজও অবশ ভিক্ষার হাতে পড়ে আছে সব ঘরে ঘরে।”

এই যে ‘আমি’ এবং একুশ শতকের যে আমিত্ব—সম্পূর্ণ পৃথক। মনে হয় অহেতুক এত বলা যে, বাঙালি মেরুদণ্ডের আরেক নাম শঙ্খ ঘোষ। তাঁর কবিতাই তবু আওড়াবো। নীরবতারও অনুশীলন জরুরি। সেখানে কেউ কেউ অপূর্ব একা হয়ে যান। সেটাই প্রতিরোধ। মনে পড়ছে, “চণ্ডালকেই মুক্তি ভেবে খুঁচিয়ে দেব আগুন/ ফুলকি দেখে দেখে বলব আলোর কথা/ ভাবব ওই তো জয়ধ্বজা, শ্মশান, বড়ো ধুম লেগেছে হৃৎকমলে…”

ছোট্ট একটা স্কুল। রাত্রিবেলার ক্লাস চলছে। বিএসসি মাস্টারমশাই বলে চলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে যে তারাটা, সেখান থেকেও আলো এসে পৌঁছতে চার বছর সময় লাগে। তারপরই মনে হয়, বাঙালির বোধশক্তি আরও গভীর করে তোলেন শঙ্খ ঘোষ। লেখেন: “তারায় তারায় ভরা মস্ত ওই খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবতাম তখন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মাঝখানে আমরা তাহলে কতটুকু? কতই ছোট্ট? নিজেদের এই অণুত্বের বোধ নিয়ে একরাত্রির ক্লাসেই যেন অনেকখানি বড় হয়ে উঠতাম আমরা…”

এহেন বোধেরই আজ প্রয়োজন খুব।

__________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by
Developed by DXDasia