লেখক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার চটজলদি আকাঙ্ক্ষার কোনো ছাপই নেই শংকরের লেখায়

 

জকাল এসব সোনার পাথরবাটি মনে হতে পারে, কিন্তু শংকর যে সময় লেখালিখি শুরু করেছেন, বা বলা ভালো, লেখার গুণে ক্রম-উদীয়মান হয়ে উঠছেন, জমাটি খ্যাতি পাচ্ছেন একটু একটু করে, তখনও পর্যন্ত কিন্তু বাংলা প্রকাশনার জগতে লেখা ছিল রীতিমতো একটা পেশা। সে সময়ের বহু লেখকেরই একমাত্র জীবিকা ছিল লেখা। মানিক বলেছিলেন বটে, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়, তবু বাংলা প্রকাশনার দুনিয়ায় ‘ইন্ডাস্ট্রি’ শব্দটা যেদিন থেকেই ঢুকে পড়ার মতো সুবিধা করে নিতে পেরেছে, কিঞ্চিৎ হলেও তার দাক্ষিণ্য মিলত বিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে লিখতে-আসা লেখকদের। শংকর (সাহিত্যিক শংকর) একইসঙ্গে এই দলটায় পড়েন, আবার পড়েনও না। বই কাটতির সোজা হিসেবে তাঁর অবস্থান সবসময় সারির ওপরের দিকে থেকেছে, অথচ তিনি কোনোদিনই পেশায় লেখক ছিলেন না। জীবনের গোড়ার দিকে বিবিধ পেশা গ্রহণ করেছেন সময়ের দায়ে, শেষ অবধি থিতু হয়েছিলেন সিইএসসি-র চাকরিতে। এই যে লেখকদের দ্বিবিভাজনটা শুরুতেই করলাম, তা কিন্তু ঠিক বিরোধ তৈরি করার অভিপ্রায়ে নয়। একজন আদ্যোপান্ত বাণিজ্যসফল লেখক হয়েও ‘ফুলটাইম’ লেখকদের থেকে তাঁর এই যে আলাদা বাস, তার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব আছে কি না, সে কথাই ভাবনার সাবানজলে বুদ্‌বুদ ফুটিয়ে তুলছিল।

নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতার প্রতি আদ্যন্ত সততাই বরং ছিল তাঁর বরাবরের মূলধন। তাঁর প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখা ‘কত অজানারে’ থেকে শুরু করে একেবারে ‘ক্লেইম টু ফেম’ ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’ অথবা ‘জন-অরণ্য’ পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁর এই যাপিত জীবনটিরই প্রতিচ্ছায়া ঘুরে বেড়িয়েছে বরাবর।

 

কবীর সুমনের গান শুনতে শুরু করার একেবারে টাটকা যুগে যখন কানে বাজত “সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখা /কত কবি মরে গেল চুপিচুপি একা একা”, তখন এই পঙ্‌ক্তির মধ্যে ভরে থাকা নিবিড় শ্লেষ বাঙালি পাঠককে স্পর্শ করবে না, তা তো নয়! শংকরও তো লেখালিখির নিরিখে বিশাল বিপুল আয়তনের ক্লাবে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন, তবু উপার্জনের দায়ের সঙ্গে লেখালিখিকে জড়িয়ে না ফেলাই বোধহয় তাঁর অন্যতর এক স্বতন্ত্র লেখকস্বর তৈরি করে দিল! আর এর পালটা যুক্তিতে, এ কথা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে, তাঁর লেখালিখির দায় আসলে বিশুদ্ধ লেখকেরই দায়, নিজের যা কিছু দেখার আর তার মধ্যে যা কিছু বলার, সেটুকুকেই লিখতে চাওয়া, বলতে চাওয়া। এই সহজ দাবিটুকুই শংকরের লেখার চিরকালের প্রাণ। আবার এ কথাও সত্যি যে, অন্নসংস্থানের গুরুভার নিজের লেখালিখির ঘাড়ে চাপানোর প্রয়োজন না থাকার এই যে সুবিধা, তার বেপরোয়া উদ্‌যাপন কিন্তু কোনোদিন তাঁর লেখায় ছিল না। লিখে রোজগারের দায় নেই, তাই লেখক হিসেবে তাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা— এমন ঔদ্ধত্য কোনোদিন বাজেনি তাঁর কলমে। চিরকাল তাঁর লেখা বাংলা প্রকাশনাকে পুষ্টি জুগিয়েছে, পাঠককে দিয়েছে আয়েস আর আরামের লঘুভার অবকাশ। সেখানে স্বাধীন লেখকের ইগোর মেঘ কখনওই পুঞ্জীভূত হয়ে ঢেকে ফেলেনি পাঠকতোষ স্বাদু গদ্যের আকাশ।

সবচেয়ে বড়ো কথা, লেখক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার চটজলদি আকাঙ্ক্ষার কোনো ছাপই নেই তাঁর লেখায়। নিজের জীবন আর অভিজ্ঞতার প্রতি আদ্যন্ত সততাই বরং ছিল তাঁর বরাবরের মূলধন। তাঁর প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখা ‘কত অজানারে’ থেকে শুরু করে একেবারে ‘ক্লেইম টু ফেম’ ‘চৌরঙ্গী’, ‘সীমাবদ্ধ’ অথবা ‘জন-অরণ্য’ পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁর এই যাপিত জীবনটিরই প্রতিচ্ছায়া ঘুরে বেড়িয়েছে বরাবর। এই জন্যই, কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার বারওয়েল সাহেবের মুহুরি থাকাকালীন যেসব কাহিনির ঝুলি উপুড় হয়েছিল তাঁর কাছে, তারই রেখাপথটি ধরে গড়ে উঠেছিল তাঁর প্রথম অক্ষরপ্রকাশের দিনলিপি— কত অজানারে। ধারাবাহিক পত্রিকা প্রকাশ থেকে শুরু করে পুস্তকাকারে প্রকাশ পর্যন্ত এই যাত্রাপথের সঙ্গে ততদিনে নানা সূত্রে জড়িয়ে গেছে গৌরকিশোর ঘোষ, সাগরময় ঘোষ, বিমল মিত্র কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্রর মতো নাম। আবার এই লেখকই যখন উপন্যাস লিখতে বসেছেন, তখন সেই কাল্পনিক কাহিনি-আকৃতির মধ্যেও তিনি সেই আবহের গল্পই বলেছেন, যে গল্পের ভেতরে রয়ে গেছে তাঁর দেখা-জানা-চেনা-বোঝার জগৎ। স্পেন্স’জ হোটেল কিংবা গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের যে জীবন তিনি খুব কাছ থেকে নজর করেছেন, কর্পোরেট সংস্কৃতির মধ্যে নিজের মধ্যবিত্ত পরিচয় হাতড়ে-বেড়ানো সেই সব চরিত্রই আশ্চর্য সব দ্বন্দ্বের ভাষা নিয়ে উঠে এল চৌরঙ্গী-র স্যাটা বোস, সীমাবদ্ধ-র শ্যামলেন্দু, কিংবা জনঅরণ্য-র প্রদীপ মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে।

 

বাঙালি ঔপন্যাসিকরা যে এর আগে কখনও এমন বিলাসী পাঁচতারা জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখেননি, এ দাবি করলে অবশ্য অ্যানাক্রনিজম-এর দোষে আক্রান্ত হতে হয়। কিন্তু সেই সমস্ত উপন্যাস তার যাবতীয় সাহিত্যগুণ ও মর্যাদা বজায় রেখেও একটা একরৈখিক সীমাবদ্ধতায় আটকে পড়েছে বারবার। সেই দোষ শুধু উপন্যাস বা ঔপন্যাসিকের নয়, সেই দোষ আসলে জলহাওয়ার। রোম্যান্টিসিজমের অসুখে ভোগা চিরকাল বাঙালির প্রিয়তম নেশা এবং তাজা বয়সে শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে মগজ পাকানোর পাশাপাশি পরিণত বয়সে ‘তফাত যাও সব ঝুট হ্যায়’ বলে এক-একটি নির্বিরোধী অন্নপুষ্ট শ্রেণিশত্রুতে পরিণত হওয়ার ভবিতব্য থেকে নিজেকে সরাতে না পারা বাঙালির চিরকেলে অভ্যেস। তাই যতবার কর্পোরেট বা সেমিকর্পোরেট প্রেক্ষাপট উঠে আসে লেখকদের কলমে, তাঁদের চরিত্ররা হয় নিজের আজন্মলালিত সংস্কার ভেঙেচুরে গোগ্রাসে গিলে ফেলে চকচকে জীবনের মায়াবী সুরা, কিংবা নিজের শিকড়ে মূল্যবোধের শেষ পরশ বাঁচিয়ে রাখতে চেয়ে মাথা ঠুকে মরে কাচের দেওয়ালে। হয় হৃদয়হীন কর্পোরেট দানব, আর নয়তো প্রচণ্ড আদর্শবাদী বিপর্যস্ত নায়ক— এই বাইনারি-র ভাবালু বাঙালিয়ানা থেকে তাঁরা বেরোতে পারেন না। সেই নিরিখে শংকরই প্রথম, যিনি নিজের লেখার ভেতরে এই কর্পোরেট জীবনের স্বাভাবিক সত্যগুলিকে এতখানি বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে বুনে দিতে পারলেন। তারাশঙ্করের জলসাঘর-এ ক্ষয়িষ্ণু আভিজাত্যের গল্প কিংবা পথের পাঁচালী-তে অপুর গ্রামত্যাগের দৃশ্য পড়ে পাঠক যে হাহাকার টের পান বুকের ভেতরে, তার চাইতে চৌরঙ্গী উপন্যাসে হোটেল শাজাহান-এর ভেঙে যাওয়া বা শংকরের বহিষ্কৃত হয়ে চলে যাওয়ার যে বিষাদ-আস্বাদ, তার প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। যে পোড়ো বনেদিয়ানা বা ফেলে-আসা গ্রামদেশকে ঘিরে বাঙালি নস্টালজিক হয়ে হা-হুতাশ করতে অভ্যস্ত, তার সম্পূর্ণ বিপরীত সংস্কৃতিতে দাঁড়িয়ে-থাকা উন্নাসিক এক নগরজীবনকে বদলে যেতে দেখেও সেই পাঠকের বুক থেকেই দীর্ঘশ্বাস বের করে আনা বড়ো কম কথা ছিল না। কিন্তু শংকর তাঁর উপন্যাসের ঝাঁ-চকচকে আর প্রাণপণে অ-মধ্যবিত্ত হতে-চাওয়া চরিত্রগুলোকে না দাঁড় করিয়েছেন কাঠগড়ায়, না তুলেছেন হাততালির আসরে। তাদের রক্তমাংসের উপস্থিতি শংকরের লেখায় এত স্বাভাবিক যে, তাদের সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে, কিংবা হাসতে-কাঁদতে কোথাও এতটুকু অসুবিধে হয় না পাঠকের। কখনওই মনে হয় না এ অচেনা জীবন আমার নয়!

শংকর তাঁর উপন্যাসের ঝাঁ-চকচকে আর প্রাণপণে অ-মধ্যবিত্ত হতে-চাওয়া চরিত্রগুলোকে না দাঁড় করিয়েছেন কাঠগড়ায়, না তুলেছেন হাততালির আসরে। তাদের রক্তমাংসের উপস্থিতি শংকরের লেখায় এত স্বাভাবিক যে, তাদের সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে, কিংবা হাসতে-কাঁদতে কোথাও এতটুকু অসুবিধে হয় না পাঠকের। কখনওই মনে হয় না এ অচেনা জীবন আমার নয়

 

তবু তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ ছিলই। চেনা ছকের বাইরে বেরোতে না চাওয়ার আরোপিত সেই সব অভিযোগ, চেনা জীবনের বাইরে অন্য জীবনের কথা গায়ে মাখতে না চাওয়ার অভিযোগ। শোনা যায় এই অভিমানেই, হয়তো বা কিছুটা নিজেকে প্রমাণ করার দায় থেকেই লিখেছিলেন ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘বিত্তবাসনা’ কিংবা ‘এবিসিডি লিমিটেড’-এর মতো উপন্যাস। এতটাই বাণিজ্যসফল হয়েছিল এই সমান্তরাল প্রচেষ্টা যে, নবম মুদ্রণ নিঃশেষিত হওয়ার পর নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি-র দশম মুদ্রণের বিজ্ঞাপনে আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড-এর তরফে লেখা হয়, “চৌরঙ্গী ও কত অজানারে না লিখেও বোধহয় এই একটিমাত্র বইতেই তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হতেন।” বিক্রিবাটা কিংবা বাজার সাফল্যের নিরিখে শংকরের গ্রাফ এতটাই উচ্চমার্গে চিরকাল বিচরণ করে এসেছে যে, ‘বাজারকাটতির লেখক’ বলে তাঁর প্রতি বিদ্রুপঘেঁষা তির্যকতা ছুড়ে দেওয়াটা সমালোচকদের পক্ষে খুব কঠিন ছিল না। তা সত্ত্বেও, শংকরকে যে কোনোদিনই এই সহজ ছকটায় ফেলে দেওয়া গেল না, তার কারণ, তাঁর এই জনপ্রিয়তার কোনো একতা সহজ ফর্মুলাকে কিছুতেই খুঁড়ে এনে দেখানো যাবে না। হালকা চালের পাঠকপ্রিয় উপন্যাস যেমন লিখেছেন, তেমনই আবার ‘একা একা একাশি’-র মতো লেখকজীবনের স্মৃতিগদ্য লিখেছেন আত্মবিশ্বাসী ঢঙে, ‘সপ্তরথী’-র মতো জীবনী-অনুসন্ধানমূলক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, দীর্ঘদিনের বিবেকানন্দ-অনুসন্ধিৎসা থেকে গড়ে উঠেছে ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’, ‘আশ্চর্য বিবেকানন্দ’, ‘অবিশ্বাস্য বিবেকানন্দ’, ‘আমি বিবেকানন্দ বলছি’-র মতো সম্পূর্ণ অন্য ধারার বই।

 

ফলে শংকর না আটকে থেকেছেন এক বিষয়ে, না তাঁকে বাঁধা গেছে এক সংরূপে, না তাঁর লেখার কোনো সরলরৈখিক চাল চিনে নেওয়া গেছে। বহুপঠিত শংকরের লব্ধপ্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্তে আসলে একটাই মূল কথা— বিষয়ের প্রতি সততা এবং অবশ্যই আশ্চর্য প্রসাদগুণ। যে সৎ গল্প বলার উজ্জ্বলতায় দীপ্ত হয়ে ওঠে শংকরকাহিনির প্রতিটি পৃষ্ঠা, সেই সহজ স্বাদের স্মৃতি বারবার খুঁজে পেতে চেয়েই তাঁর পাঠক ক্রমাগত তাঁকে পড়তে চেয়েছে ভিড় করে। শংকর এই অদ্ভুত পাঠাভ্যাস তৈরি করে দিতে পেরেছিলেন তাঁর পাঠকদের মধ্যে, একবার পড়ে ফেলার আকস্মিকতা যেখানে মুছে যাবেই বারবার ফিরে ফিরে পড়তে চাওয়ার আকুলতায়।

Written by