
মদনমোহন তর্কালঙ্কার লিখেছিলেন, “পাখি-সব করে রব”। নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, “আমি হব সকালবেলার পাখি”। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা-গানে এসেছে পাখি-প্রসঙ্গ। প্রায় দু’শো বছর আগে রামচন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন ৪৮ পাতার ‘পক্ষির বিবরণ’। যামিনী রায় সহ বহু বিখ্যাত বাঙালি শিল্পীদের চিত্রকলায় ধরা পড়েছে পাখিদের নানা রূপ-রং। শুধু ছবি আঁকা নয়, বইপত্র ঘেঁটে ওষুধ খাইয়ে অসুস্থ পাখিদের পরিচর্যা করতেন অবন ঠাকুর। ভারতের ‘বার্ডম্যান’ সেলিম আলি-র কথা নতুন করে বলে দিতে হয় না। নানা ভাবে বাঙালি-জীবনের সঙ্গে জুড়ে আছে পক্ষীপ্রেম। এই বঙ্গে পাখি দেখা (Bird Watching) বা পাখির ছবি তোলা (Bird Photography) এখন ‘ট্রেন্ডিং’। কিন্তু ‘ট্রেন্ড’ অনুসরণ করতে গিয়ে কি কোনওভাবে অসন্তুষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি? ছবি তুললে পাখিদের কি কোনও লাভ হয়? না ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি? শুধু দিকবিদিক ঘুরে হাজার পাখি ক্যামেরাবন্দি করাই কি বার্ডিং? না কি এ এক ধরনের জীবনবোধ? পাখি দেখা নিয়ে এমনই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন দেবাশিস দাস, তাঁর লেখা ‘বার্ড বার্ডার বার্ডেস্ট’ বইতে।

এই বিপুল সংখ্যক মানুষ, যাঁরা পাখির ছবি তুলে সফল হতে চান, তাঁদের সাহায্যের জন্য তৈরি হয় এক ইন্ডাস্ট্রি। বার্ডিং গাইড, হাইড, হোমস্টে, ভাড়ার গাড়ি যার অংশ। আর পাখি, প্রকৃতি পণ্য।
পেশায় বিজ্ঞাপন কর্মী দেবাশিস, বহু বছর ধরেই পাখি দেখতে এবং পাখির ছবি তুলতে ভালোবাসেন। পাখি নিয়ে এটাই তাঁর প্রথম বই। পক্ষীবিদ ডা. কনাদ বৈদ্য এ বইয়ের মুখবন্ধে বলেছেন, “বিজ্ঞাপন কর্মী হিসেবে কাজ করতে করতে ‘পাখিতে ধরে লিছে’। এরকম বইয়ের কথা অনেকেই বলেন। কিন্তু লিখে উঠতে পারেন না।” বইটি মূলত একজন বার্ডার বা পাখি দেখিয়ের চোখে তার পাখি জীবনের রঙিন কিছু গল্প অগোছালো ভাবে বলে যাওয়া। কনাদবাবুর কথায়, যাঁদের ‘পাখিতে ধরে’ তাঁদের দু’টো জাত আছে। একদল পাখি দেখে। তাঁরা বার্ডওয়াচার বা বার্ডার। অন্যরা পাখির ছবি তোলে। তাঁরা বার্ড ফটোগ্রাফার। বার্ডাররা বাইনোকুলার, স্পটিং স্কোপ, সাউন্ড রেকর্ডার ইত্যাদি নিয়ে ফিল্ডে বেরোয়। তাঁদের কাছে পাখি দেখাটাই মুখ্য। নোটবুকে লিখে রাখেন নানা তথ্য, যা অনেক সময় গবেষণার কাজে লাগে। সাফল্য খুঁজতে খুঁজতে বার্ডাররা পৌঁছে যান ‘বার্ডেস্ট’ স্তরে। শখের ছবি হাতে পাওয়ার অমোঘ আকর্ষণে ঘটিয়ে ফেলেন অপরাধ। অন্যদিকে, বার্ড ফটোগ্রাফাররা পাখির ছবি তুলতে ব্যস্ত থাকেন। আই-লেভেল শট, ফ্লাইট শট, টেক-অফ্, ল্যান্ডিং সমেত নানা ধরনের ছবি তোলেন। সেসব কখনও প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনীতে যায়। ছবি পুরস্কৃত হয়। ভারতে এই দ্বিতীয় প্রজাতির সংখ্যাই বেশি।
ভারতে ঠিক কত মানুষ পাখির ছবি তোলেন? ইবার্ড, বিভিন্ন সংস্থার সদস্য-সংখ্যা, সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ ইত্যাদি দেখে আন্দাজ করা যায়, লাখ খানেক তো বটেই! সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২৪ সালে এ দেশে প্রায় দু’লক্ষ টেলিফটো লেন্স (২০০ এমএম বা তার বেশি ফোকাল লেংথের) বিক্রি হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ, যাঁরা পাখির ছবি তুলে সফল হতে চান, তাঁদের সাহায্যের জন্য তৈরি হয় এক ইন্ডাস্ট্রি। বার্ডিং গাইড, হাইড, হোমস্টে, ভাড়ার গাড়ি যার অংশ। আর পাখি, প্রকৃতি পণ্য।
দেবাশিসবাবুর কথায়, পাখির ছবি তুলতে গিয়ে কতটা ফসিল ফুয়েল পোড়ালাম, জঙ্গলে এসি, গিজারের ব্যবস্থা করার জন্য বিদ্যুতের চাহিদা কতটা বাড়লো, আর তা উৎপাদন করতে গিয়ে কত নদী শুকিয়ে গেল, কত গ্রাম নিশ্চিহ্ন হল সেই হিসেবও কিন্তু করা দরকার। ক্যামেরার সঙ্গে, কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন নিয়ে, পাখির খোঁজে বেরলে হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে। হয়তো বদলাবে বার্ডারের সংজ্ঞা। লেন্সের সাইজ দিয়ে নয়, বার্ডারের বিচার করতে শিখবো তার সংবেদনশীলতা, প্রকৃতির প্রতি তার দায়বদ্ধতার নিরিখে। বার্ডার হয়েই খুশি থাকবো ‘বার্ডেস্ট’ হয়ে সবাইকে টেক্কা দেবার চেষ্টা করবো না।
বই- বার্ড বার্ডার বার্ডেস্ট
লেখক- দেবাশিস দাস
প্রকাশক- পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশন্স (১৭৭, যোধপুর পার্ক)
মুদ্রিত মূল্য- ৫০০ টাকা
বইটি মজার মোড়কে, সহজ, স্বাদু ভাষায় লেখা। প্রচুর পাখির ছবি আছে লেখার সঙ্গে। প্রত্যেকটি পাখির ছবিতে দেওয়া আছে একটি করে কিউআর কোড, যা স্ক্যান করলে বেরিয়ে আসবে সেই পাখি নিয়ে খুঁটিনাটি তথ্য। শোনা যাবে পাখিটির ডাক এবং গায়ক পাখিদের গান। লেখক চেষ্টা করেছেন অ্যানালগ বই আর ডিজিটাল দুনিয়ার মধ্যে একটা সেতু তৈরির। পাখি, পাখির ছবি নিয়ে উৎসাহী পাঠক এবং যাঁরা সবে পাখি দেখা শুরু করেছেন, তাঁরা এই বই থেকে কিছু নতুন তথ্য পেলেও পেতে পারেন। পোড়খাওয়া বার্ডাররা পাবেন হাসির খোরাক, ভাবনার রসদ, তর্কের ইন্ধন।
বইটি মজার মোড়কে, সহজ, স্বাদু ভাষায় লেখা। প্রচুর পাখির ছবি আছে লেখার সঙ্গে। প্রত্যেকটি পাখির ছবিতে দেওয়া আছে একটি করে কিউআর কোড, যা স্ক্যান করলে বেরিয়ে আসবে সেই পাখি নিয়ে খুঁটিনাটি তথ্য। শোনা যাবে পাখিটির ডাক এবং গায়ক পাখিদের গান।
বইমেলায় বইটি পাবেন: মায়া বুকস (স্টল নং E-1, ৪নং গেটের কাছে), ধ্যানবিন্দু (স্টল নং ৫৬৫, ৯নং গেটের সামনে)। এছাড়া, সারা বছরই বইটি পাওয়া যাচ্ছে ১২৭, যোধপুর পার্কের দ্য বেঙ্গল স্টোর-এ এবং অনলাইন সংগ্রহের লিংক: https://thebengalstore.com/products/bird-birder-birdest-debashis-das
