অলকানন্দা সেনগুপ্তের শিল্প প্রতিবাদী, কিন্তু তাঁর পেলব নরম মনটা দমে যায়নি

লকানন্দা সেনগুপ্ত-এর নাম এলেই ফিগারেটিভ কাজের কথা চলে আসে। কিন্তু সেসব কাজের শরীর, একটা বাহ্যিক অবয়ব রয়েছে ঠিকই তবে তা অতিক্রম করে মনটাই আমাদের জাগিয়ে রাখে। সে মন লাল মখমলে মোড়া নয়, রক্তাক্ত। একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের নিউ সাউথ গ্যালারিতে চলছে শুধু ভাস্কর্যের উপর শিল্পী অলকানন্দা সেনগুপ্তের একক প্রদর্শনী, যেটি চলবে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

শিল্পীর জীবন ও যাপন মিলেমিশে গেলে যে সৃষ্টি হয় তার গোড়ার উপকরণ আসলে লড়াই আর সততা। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্পচৰ্চা করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আসলে পালিয়ে যাওয়াই।

সময়, সমাজকে যেভাবে আকার দিয়েছে সেসব ক্ষত অলকানন্দাকে ভাবায়, বিরক্ত করে, আরও ভোকাল করে। একটা রাজনৈতিক সমাজে বাস করলে জীবন যে মোটেই মধুর থাকে না, তা অলকানন্দার কাজে স্বাভাবিকভাবে উঠে আসে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৬ সালে স্কাল্পচার ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হন। দীর্ঘ নয় বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডিওতে কাজ করেছেন। শিল্প শিক্ষার এই দীর্ঘ সময়ে ওঁর নিবিড় যোগ তৈরি হয়েছে। তারপর পাশ করে অনিশ্চিত পৃথিবীর কাঠিন্যর সঙ্গে লড়েছেন। তারপর ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্কুলে চাকরি পান। বদলির চাকরি হওয়ায় থিতু হতে পারেননি অনেকদিন। তারপর ঐচ্ছিক অবসর নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করেন। মূলত টেরাকোটায় কাজ করলেও, অলকানন্দা অনেকরকম মিডিয়ামেই কাজ করে থাকেন। জিজ্ঞেস করলে জানান, “খুব একটা টাকা ছিল না। খুব বড়ো মেটালের কাজ করবো, পারিনি। কলেজে সে সময়ে কিছুই ছিল না। একটা ফারনেসও ছিল না। শুধু মাটি ছিল।”

কিছু না থাকা সবসময়েই বলিষ্ঠ করে আমাদের। এটা দুর্বলতা নয়। তাই হয়তো ওঁর কাজ এত জোরালো। শিল্পীর জীবন ও যাপন মিলেমিশে গেলে যে সৃষ্টি হয় তার গোড়ার উপকরণ আসলে লড়াই আর সততা। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিল্পচৰ্চা করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আসলে পালিয়ে যাওয়াই। শিল্পী চিন্তাশীল তাই সামাজিক ব্যাধিগুলোর শিকড় খুঁজে নিতে তাঁরা জানেন। অলকানন্দা নিজের জীবনে বারবার পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করেছেন ওঁর প্রতিবাদের ভাষায়। সে ভাষা সমস্যাকে শুলবিদ্ধ করে সামনে এনে দেখায় কঠিন সত্যের রূপ। শিল্পী বলেন, “বিশ্লেষণ করে দেখেছি, আমি সমাজের বিচ্ছিন্ন কেউ নই। আমি সমাজেরই অংশ। বৃহত্তর পরিসরে গেলে রাজনীতি আসে। তা না জানলে শিল্পের যথার্থ প্রকাশ ঘটানো যায় না।” অর্থাৎ উনি তথাকথিত শিল্পীর পোশাকি আবরণ ছেড়ে বেরিয়ে এসে সামাজিক জড়তাগুলোকে হাতে নিয়ে দেখতে চেয়েছেন। অন্ধকারকে অস্বীকার না করে, তা নিয়ে একটি ভিজ্যুয়াল কনভারসেশনে আসতে চেয়েছেন। তাই ওঁর কাজ রাজনৈতিক বলে মনে হয়।

বৃহত্তর রাজনীতির আগ্রাসনে মানুষের মন বিষিয়ে উঠেছে এমন একটা সময়ে কাব্যময় নাটকীয়তাকে কার্যত অগ্রাহ্য করে প্রতিবাদকেই জোরালো করেছেন অলকানন্দা সেনগুপ্ত। সেখানে কোনো ভণিতা নেই। যা আক্রান্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা কোনো না কোনোভাবে জীবনযুদ্ধে আঘাত পেয়েছে, সহ্য করেছে, গর্জে উঠেছে। নির্ভয়া থেকে আরজিকর, প্যালেস্টাইন থেকে কাশ্মীর সবই ওঁকে ভাবায়, অশান্ত করে।

বৃহত্তর রাজনীতির আগ্রাসনে মানুষের মন বিষিয়ে উঠেছে এমন একটা সময়ে কাব্যময় নাটকীয়তাকে কার্যত অগ্রাহ্য করে প্রতিবাদকেই জোরালো করেছেন অলকানন্দা সেনগুপ্ত। সেখানে কোনো ভণিতা নেই।

অলকানন্দার কাজে নারী চরিত্রের প্রাধান্য থাকলেও, আমি মনে করি সেসব চরিত্র লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কোনো আক্রান্ত প্রান্তিক মানুষের প্রতিমূর্তি হতে পারে। পৃথিবীর যেকোনো আক্রান্তের লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম কিচ্ছু হয় না। প্রদর্শনীর প্রথমদিন উপস্থিত ছিলেন শিল্পী অরুণিমা চৌধুরীও। তিনি বলেন, “অলকানন্দার কাজ প্রতিবাদী, কিন্তু কোথাও তার পেলব নরম মনটা দমে যায়নি।” আরও বলেন, “ওঁর কাজ অভিব্যক্তিপূর্ণ, শুধু হাত পায়ের প্লেসমেন্ট, মুভমেন্ট দেখলেই বোঝা যায়।” যথার্থই বলেছেন অরুণিমা চৌধুরী। একজন শিল্পী যেভাবে আরেকজন শিল্পীকে পড়তে পারেন তা সবসময়েই আলাদা মাত্রা যোগ করে। অরুণিমা প্রশংসা করেন অলকানন্দার স্বল্প রঙের ব্যবহার দেখে। মিনিমাল কিছু রং-রেখায় ব্যবহারে কাজগুলোর কিছু অংশ অজন্তার ফ্লোরাল মোটিভের কথা মনে করায়।

শিল্পী মালিয়া ভট্টাচাৰ্য তাঁর অগ্রজ অলকানন্দা সেনগুপ্ত সম্পর্কে বলেন, “অলকাদির শিল্পকর্ম দৃঢ় অথচ সরল। স্কাল্পচারাল ফর্ম এবং অভিব্যক্তিতে ভরপুর। যা সরাসরি বুকের ভিতর গিয়ে আঘাত করে। এবং বারবার মনে করায়, আমি যদি এইভাবে পারতাম!”

আমরা যারা মাটির চরিত্র ও টেরাকোটার টেকনিক্যাল সমস্যাগুলোর কথা জানি, তারা আন্দাজ করতে পারি এই কাজগুলো কতটা শারীরিক পরিশ্রম দাবি করে। শুধু পরিশ্রমের জন্যই অলকানন্দা সেনগুপ্তকে অন্য অনেকের থেকে এগিয়ে রাখে।

যে অলকানন্দা বারবার শাসনের নামে শোষণ করা একটা সিস্টেমকে প্রশ্ন করেছেন, সে কাজ নিয়ে কথা হওয়া দরকার। ওঁর কাজ আমাদের কাজ করতে বাধ্য করবে, সজাগ রাখবে।

Written by