আইরিশ ডাক্তারবাবু জ্যাক প্রেগারের স্বপ্ন চার দশক ধরে বুনে চলেছে ক্যালকাটা রেসকিউ

ডিসেম্বর মাস মানেই ছোটোদের অপেক্ষা শুরু সান্তা দাদুর জন্য। ওই যে লাল সাদা টুপি পরা বৃদ্ধ মানুষটি ক্রিসমাসের আগের রাতে চুপিচুপি এসে ছোটোদের নানা ধরনের উপহার দিয়ে যান। তবে এই সবটাই তো কল্পনা। পৃথিবীসুদ্ধু বড়োরা সে কথা জানে। তবে কলকাতা জানে বাস্তবে সান্তাক্লজ শিশুদের জন্য উপহারের ঝুলি নিয়ে না এলেও এই শহরে সেই সত্তরের দশকে এসেছিলেন জ্যাক দাদু। তিনি শুধু বছরের শেষের মাস নয়, সারা বছর ধরেই শিশুদের দিয়েছিলেন সুস্বাস্থ্য এবং সুশিক্ষার উপহার। সেই তখন থেকে আজও উত্তর কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলের কাছেই জ্যাক দাদুর পাঠশালায় প্রায় ২৭০ জন কচিকাঁচা প্রতিদিনই পাচ্ছে সোনালি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া আলোর উপহার।

 

ভাগ্যের বিড়ম্বনায় যেসব শিশুদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকু থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই শহরে আসা আইরিশ ডাক্তারবাবু জ্যাক প্রেগার, কলকাতার মিডিলটন রো এলাকাতে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করে কলকাতার আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের স্বাস্থ্যবিধি শিখিয়েছেন তিনি।

ভাগ্যের বিড়ম্বনায় যেসব শিশুদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারটুকু থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এই শহরে আসা আইরিশ ডাক্তারবাবু জ্যাক প্রেগার (Jack Preger), কলকাতার মিডিলটন রো এলাকাতে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করে কলকাতার আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের স্বাস্থ্যবিধি শিখিয়েছেন তিনি। তাঁর দেখানো সেই পথে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে উত্তর কলকাতার একটি স্বেচ্ছাসেবক সংস্থা, নাম ক্যালকাটা রেসকিউ (Calcutta Rescue)।

স্বাস্থ্যই জীবনের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। এ কথা মনে রেখে এই সংস্থা টালা পার্ক, ট্যাংরা, নিমতলা এই তিন জায়গায় স্থানীয় মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেন। এছাড়াও চিকিৎসার সরঞ্জাম ভর্তি দুটি মেডিকেল ভ্যান কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে মানুষদের সুস্থ করে তোলার কাজ করে থাকে।

স্বাস্থ্যের পরেই আসে শিক্ষার প্রসঙ্গ। সেই শিক্ষা শুধুমাত্র পুঁথিগত শিক্ষা নয়, বরং সুস্থ-সংস্কৃতি এবং সুস্থ মননের শিক্ষা। কলকাতার দর্জিপাড়া অঞ্চলে দশ নম্বর নীলমণি মিত্র লেনে যে বাড়িতে জ্যাক সাহেব থাকতেন সেখানেই শুরু হয় প্রথম স্কুল। এরপর আরো একটি স্কুল স্থাপিত হয় টালা পার্ক অঞ্চলে। কিন্তু নানাবিধ অসুবিধার কারণে এই দুটোই ইস্কুলের ঠিকানায় বর্তমানে মিশে গেছে কুড়ি নম্বর ঈশ্বর মিল লেনে। ছোটোদের স্বপ্ন দিয়ে সাজানো স্কুলের ডাক নাম জ্যাক দাদুর পাঠশালা। এখানে শিল্পীর কল্পনা ও শিশুদের স্বপ্ন মিলেমিশে ফুটে উঠেছে প্রতিটি দেওয়ালে। দেওয়ালের গ্রাফিতিতে কোথাও পণপ্রথার বিরুদ্ধে কোথাও আবার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দূষণের বিরুদ্ধে উপায় খোঁজার বার্তা চোখে পড়তে বাধ্য। যখন বড়ো বড়ো ইমারত গঠনের জন্য কাটা পড়ছে একের পর এক গাছ। সে সময় দাঁড়িয়ে এই স্কুলের মাঝ উঠোনের আম গাছটা বার্তা দেয় গাছ না কেটেও ভালো কিছু করা সম্ভব।

স্কুলবাড়ির দোতলা যেন ফুলের নার্সারি। সেখানে ছোট্ট ছোট্ট কুঁড়িরা নাচ গানের মাধ্যমে ভালোবাসতে শিখছে লেখাপড়াকে। শিক্ষিকাদের সঙ্গে আধো আধো বুলিতে মুখস্থ করছে বানান। খেয়াল খুশিতে এঁকে চলেছে নিজেদের মত। সংস্থার বর্তমান সেক্রেটারি স্নেহাশিস ভৌমিক বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “ক্যালকাটা রেসকিউ প্রথাগত স্কুল নয়, এই সংস্থা একেবারে ছোটো শিশুদের স্কুলে ভর্তি হওয়ার উপযুক্ত করে তোলে, আর যারা স্কুলে ভর্তি হয়ে গেছে তাদের মাতৃভাষা, ইংরেজি, অঙ্ক ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হলে আবার বুঝিয়ে দেন এই স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা। পাশাপাশি চলে নাচ, গান, হস্তশিল্প, কম্পিউটার প্রভৃতি প্রশিক্ষণ।”

জ্যাকদাদুর পাঠশালার কর্মকর্তারা স্কুলের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন একটি লেটার বক্স, নাম ‘মনের বাক্স’। এখানে, নাম না লিখেও নিশ্চিন্তে মনের কথা লিখে একটি চিঠি পোস্ট করা যায়। এই চিঠি পৌঁছবে ওই স্কুলেরই কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের হাতে।

নিমতলা, বাগবাজার, শোভাবাজার ইত্যাদি অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা সকালে স্কুল শেষে ক্যালকাটা রেসকিউ-র হলুদ রঙা বাসে চড়ে এসে পৌঁছায় এই ঠিকানায়। তারপর সারাদিন ধরে চলে সারস্বত চর্চা। দুপুরে একসঙ্গে বসে গরম গরম ভাত খায় বন্ধুরা।

একটু বড়ো হতে হতে বাড়তে থাকে সাংসারিক দায়দায়িত্ব, জীবনে যোগ হয় উপার্জনের তাগিদ। কিন্তু কোন পথে এগোলে সঠিক বিষয় পৌঁছানো সম্ভব, তাও বুঝে উঠতে পারেন না অনেকেই। এই সমস্যার সমাধানও আছে পাঠশালায়। স্নেহাশিসবাবু জানালেন, মাধ্যমিকের পর ছাত্র-ছাত্রীদের পছন্দ বুঝে তাদের জীবিকা অর্জনের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। সে ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র বেছে নিতে পারে তারা।

শৈশবে এবং বয়ঃসন্ধির সময় মনের নানা ধরনের পরিবর্তন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের শহরে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা আজও খানিকটা পিছিয়ে আছে বলে তৈরি হয় নানা ধরনের সমস্যা। একদিকে অদম্য কৌতূহল, অন্যদিকে সংকোচ এই দুই মিলে মনের মধ্যে যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয় তা থেকেই দিশেহারা হয়ে গুলিয়ে যায় কোনটা ঠিক আর কোনটাই বা ভুল। এই কথা উপলব্ধি করে জ্যাকদাদুর পাঠশালার কর্মকর্তারা স্কুলের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন একটি লেটার বক্স, নাম ‘মনের বাক্স’। এখানে, নাম না লিখেও নিশ্চিন্তে মনের কথা লিখে একটি চিঠি পোস্ট করা যায়। না না, সেই চিঠি কোনো ডাকঘরে পৌঁছবে না, এই চিঠি পৌঁছবে ওই স্কুলেরই কোনো মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের হাতে। সমস্যা বুঝে সমাধানের রাস্তাও ঠিক করে দেন তাঁরা।

স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট অফিসার শুভজিৎ সানা, বঙ্গদর্শনকে জানান, “শুধু লেখাপড়া নয় খেলাধূলাতেও এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বারবার নিজেদের সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুরু হয়েছে স্মার্ট ক্লাসরুম। সেখানে প্রযুক্তির সাহায্যে পড়াশোনা করে ছেলেমেয়েরা।”

বড়োদিনের মরশুমে সারা শহর সেজে উঠেছে আলোর মালায়‌। ক্রিসমাস ক্যারল আর কেকের গন্ধে যখন ভরে উঠছে শহরের বাতাস তখন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে ছোট্ট ছোট্ট এই কুঁড়িরা। বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে প্রদর্শন করবে নিজেদের ক্রীড়া দক্ষতা। আবার তাদের কোনো এক শিক্ষক হয়ে উঠবেন সান্তাক্লজ। সেই সান্তাক্লজ বাচ্চাদের হাতে তুলে দেবেন চকোলেট, ক্যাডবেরি। শিশুরা বুনবে স্বপ্নের পৃথিবী।

জন লেনন-এর সেই বিখ্যাত গানটা মনে আছে? “Imagine there is no heaven/ It’s easy if you try/ No hell below us, above us, only sky…” এই গানের স্বপ্নটাই যেন বাস্তব হয়ে ফুটে উঠেছে জ্যাক দাদুর পাঠশালায়। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চার দশক ধরে কল্লোলিনীর রূপ অনেকটা বদলে গেলেও, বেড়ে যাওয়া নাগরিক ব্যস্ততা মানুষকে আরও ব্যতিব্যস্ত করে তুললেও স্নেহ প্রেমের ফল্গুধারা আজও সত্যি কলকাতায়। আর এই ভালোবাসার জোরেই হয়তো এই শহরে আজও ফুল ফোটে দূষণের বিষবাষ্পকে চ্যালেঞ্জ করে।

____________________
ক্যালকাটা রেসকিউ-এর ঠিকানা, ফোন নম্বরের জন্য
https://calcuttarescue.org/contact/ -এখানে ক্লিক করুন।

Written by