
শিল্পকর্ম আপাতভাবে জড় মনে হলেও তার সচল অভিব্যক্তি মানুষকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেই হিন্দোল তৈরির করার দায়িত্ব শিল্পীর; বাংলার বুকে বহু বছর হল যে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন ভাস্কর অলকানন্দা সেনগুপ্ত (Alakananda Sengupta)।
অলকানন্দার কথা বলার ভঙ্গি অকপট ও তীব্র। চোখের দিকে তাকিয়ে তা কথা বলে, সরাসরি মানুষকে বিদ্ধ করে। ধাতু, কাঠ ও সেরামিক্সে কাজ করলেও পোড়ামাটির অতিপ্রাচীন ঘরানাতেই অলকানন্দা যেন অধিক স্বচ্ছন্দ।
অলকানন্দা সেনগুপ্তের ভাস্কর্যের সহজ-সরল ভাষা যেন একটা ভালোবাসার চাদরে জড়িয়ে ধরে আমাদের। তাঁর কথা বলার ভঙ্গি অকপট ও তীব্র। চোখের দিকে তাকিয়ে তা কথা বলে, সরাসরি মানুষকে বিদ্ধ করে। ধাতু, কাঠ ও সেরামিক্সে কাজ করলেও পোড়ামাটির অতিপ্রাচীন ঘরানাতেই অলকানন্দা যেন অধিক স্বচ্ছন্দ। মাধ্যমটিকে তিনি এক দিক থেকে নতুন রূপও দিয়েছেন, তাঁর পোড়ামাটি রঙিন। পোড়ানোর আগেই এই রং প্রয়োগ করেন তিনি, ফলে রং হয় স্থায়ী। সম্ভবত তিনিই বাংলার একমাত্র ভাস্কর, যিনি পোড়ামাটির কাজে এভাবে রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানান পরীক্ষানিরীক্ষা করে চলেছেন সাফল্যের সঙ্গে।

অলকানন্দা সেনগুপ্তের কাজের শুরু রবীন্দ্র ভারতী আর্ট কলেজ থেকে। ১৯৯৫ সালে সেখান থেকে পাশ করেন। তারপর একটি স্কুলের সঙ্গে প্রায় ২০ বছর যুক্ত থেকেছেন। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পর নতুন করে কাজ শুরু করেন। ভাস্কর্যে ইসরায়েল-প্যালেস্তাইনে যুদ্ধপীড়িত মহিলা ও শিশুদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারা ফুটিয়ে তোলা থেকে প্রান্তিক মেয়েদের নিজের ছত্রছায়ায় এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া – শিল্পী অলকানন্দা সেনগুপ্ত ও তাঁর ছাত্রীরা এই কাজগুলিতে নারীমনের জগৎ এবং পুরুষশাসিত সমাজের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মেয়েদের যাবতীয় অধিকার ও অর্জনের কথা বলে চলেছেন। পোড়ামাটি ও নানান ধাতুর মিশ্রণে হাতে গড়া তাঁর ভাস্কর্যগুলি হয়ে ওঠে মানবজাতির আনন্দ ও বেদনার বহিঃপ্রকাশ। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই-ই এই ভাস্কর্যগুলির প্রেরণা।
আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতার আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এর নিউ সাউথ গ্যালারিতে তাঁর গত তিন বছরের কাজের প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে। ২০১২ সালে কলকাতায় অলকানন্দা সেনগুপ্তের শেষ একক হয়েছিল। ১৪ বছর পর আবার ‘একক অলকানন্দা’। চলবে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

অলকানন্দার ভাস্কর্যে ধরা দেয় কখনও প্রকৃতি, কখনও যুদ্ধ-জীর্ণ পৃথিবী, কখনও আদিম-চিরন্তন ভালোবাসা, অন্যায়-অবিচার, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কখনও পুরুষতান্ত্রিকতার দম্ভ আর নারীর মন।
যাঁরা অলকানন্দার কাজ দেখতে অভ্যস্ত তাঁরা জানেন যে, তাঁর ভাস্কর্যে ধরা দেয় কখনও প্রকৃতি, কখনও যুদ্ধ-জীর্ণ পৃথিবী, কখনও আদিম-চিরন্তন ভালোবাসা, কখনও ধ্বংস, অন্যায়-অবিচার, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কখনও পুরুষতান্ত্রিকতার দম্ভ, কখনও নোংরা রাজনীতির বুদ্ধিহীনতা আর নারীর মন। কখনও বিষণ্ণ নারী, যৌনতায় ব্যবহৃত অসহায় নারী; আবার কখনও নারীর ভালোবাসা, প্রতিবাদ, রুগ্ন পৃথিবীতে লজ্জায় জিভ বের করা নারীর কালী-রূপ।

একক অলকানন্দা-য় প্রথম দিন অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি উপস্থিত থাকছেন স্বপ্না সেন, অরুণিমা চৌধুরী, সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়, মৃণাল ঘোষ-সহ আরও অনেকে। প্রদর্শনী চলবে বেলা ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। প্রবেশ অবাধ।
