
প্রায় ১০০০ বছর পুরোনো বাঙালির দুর্গাপুজো সাড়ে চার বছর হলো ইউনেস্কো-র তালিকায় নাম নথিভুক্ত করেছে। বাঙালির কাছে পুজো মানে শুধুই দেবীর আরাধনা নয়। পুজোর আগে ‘মার্কেটিং’, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, রাত জেগে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, রাস্তার ফুচকা-রোল-চাউমিন থেকে রেস্তোরাঁর বিশেষ মেনু—সব মিলিয়ে দুর্গাপুজো আসলে একটা পূর্ণাঙ্গ উদযাপনের উৎসব। দুর্গাপুজোই এশিয়ার একমাত্র উৎসব যা ইউনেস্কো-র ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ (Intangible Cultural Heritage) এর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে মণ্ডপ তৈরি, আলোক সজ্জা, ধুনুচি নাচ, উৎসবের সার্বজনীনতা, ইত্যাদি ছিল এই সংস্থার বিবেচনাধীন বিষয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন একটা স্থান পাওয়া গর্বের বিষয় বটে! আর এই গর্ব যাতে অটুট রাখতে বাঙালি অবিরাম প্রস্তুতি চালায় প্রতি বছর। সেখানেই উঠে আসে বাংলার থিম কালচার। প্রাথমিকভাবে থিম পুজো বলতে বোঝাতো গতানুগতিক বাঁশের প্যান্ডেলের শিল্পগত অলংকরণ। কিন্তু বিগত প্রায় একদশকে বাংলা তথা কলকাতা-দুর্গাপুজোর থিম উৎসবের আমেজে একটা আমুল পরিবর্তন এনেছে। দুর্গা প্রতিমার আরাধনার পাশাপাশি বাঙালির আবেগ জড়িয়ে রয়েছে নতুন চমক পাওয়ার উৎসাহেও।
একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে অনেকগুলি আলাদা কলকাতা। কখনও ইতিহাসের কলকাতা, কখনও গঙ্গার ধারের কলকাতা, কখনও স্থাপত্যের কলকাতা, কখনও আবার স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার শহর। কোথাও রাজস্থানের হাওয়া মহল, কোথাও গুজরাটের সোমনাথ মন্দির, আবার কোথাও জলছাপ, গঙ্গা, নকশি কাঁথা, লোককথা কিংবা ‘বিয়োজন’-এর মতো বিমূর্ত ভাবনা।
২০২৬-এর দুর্গাপুজোতেও থাকছে নানারকম থিমভাবনা। উত্তর থেকে দক্ষিণ, মধ্য কলকাতা থেকে সল্টলেক ও নিউ টাউন, পরিচিত একাধিক পুজো কমিটি ইতিমধ্যেই তাদের এবারের ভাবনা প্রকাশিত করেছে। উত্তর কলকাতার কথা আসুক প্রথমেই। টালা প্রত্যয়ের এবারের দুর্গাপুজোর থিম ‘বিয়োজন’ বা Detachment। নামের মধ্যেই রয়েছে বিচ্ছেদ হওয়া কিংবা সম্পর্কের একটি বিশেষ অবস্থার ইঙ্গিত। শিল্পের ভাষায় এই বিমূর্ত ভাবনাকে মণ্ডপে কীভাবে প্রকাশ করা হয়, সেটিই এখানে দেখার বিষয়। এদিকে উত্তর কলিকাতা সর্বজনীনের ৯৫তম বর্ষের ভাবনা ‘জলছাপের কলকাতা’। টাকা, পাসপোর্ট বা গুরুত্বপূর্ণ নথির কাগজে থাকা জলছাপ যেমন খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু আলোর সামনে ধরলে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে, তেমনই কলকাতার পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্মৃতি ও নস্টালজিয়াকে নতুন আলোয় তুলে ধরার সম্ভাবনা থাকছে।
অন্যদিকে, ১০৬ বছরে পা দিয়ে টালা বারোয়ারি নিয়ে আসছে ‘দুর্গাবাড়ি’। নামেই যেন রয়েছে বাঙালির পুরনো পুজোবাড়ির গন্ধ যেখানে দুর্গার আরাধনা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দীর্ঘদিনের উৎসব-স্মৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করছে। আর মানিকতলা চালতাবাগান লোহাপট্টির ‘নিশান’ বা The Mark নিয়ে আসছে ইতিহাসের এক অধ্যায়। ছত্তিশগড়ের রামনামী সম্প্রদায়ের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তৈরি এই ভাবনায় উঠে আসছে, মন্দিরে প্রবেশে বাধার পর শরীরেই ‘রাম’ নামকে চিহ্ন হিসেবে ধারণ করার ঘটনা। এই মণ্ডপ সামাজিক প্রাচীন প্রথা এবং নাছোড়বান্দা ভাবনার অনুষঙ্গ বহন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তর কলকাতার আরও এক পরিচিত পুজো কাশী বোস লেনের ৮৯তম বর্ষের থিম ‘পুজোর গন্ধ এসেছে’। নামটি শুনলেই কেমন যেন কাশফুল, নতুন জামাকাপড়, ঢাকের শব্দ আর পুজোর আগমনী আবহ মাথায় আসে এবং ধারণা করা হচ্ছে এরকম কিছুই হয়তো তুলে ধরবে এই থিম। অন্যদিকে চোরবাগান সর্বজনীনের ‘অরব’ বা Beyond Sound নামটি শব্দের সীমার বাইরে অনুভবের অন্য একটি স্তরের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কলকাতার থিম পুজোর আলোচনায় শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের নাম আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। ৫৪তম বর্ষে তাদের মণ্ডপের অনুপ্রেরণা রাজস্থানের বিখ্যাত ‘হাওয়া মহল’। রাজস্থানি স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য, অসংখ্য জানালার বিন্যাস এবং মৌচাকের মতো গঠনকে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে রূপ দেওয়ার মধ্যে স্থাপত্যের এক অন্য রকম উপস্থাপনা দেখা যাবে। উত্তর কলকাতার আরও একটি উল্লেখযোগ্য পুজো কুমারটুলি পার্ক এবার সমাজের কথা তুলে ধরছে। ভূপেন হাজারিকার বিখ্যাত গান ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’-এর নামেই এবারের ভাবনা। এখানে গঙ্গার আক্ষরিক প্রবাহের পাশাপাশি সমাজের নানা ব্যভিচার, দুর্নীতি, অপরাধ ও নৈতিক অবক্ষয়ের মতো বিষয়গুলিও তুলে ধরার প্রয়াস থাকছে।
এছাড়া, কলেজ স্কোয়ারের এবারের মণ্ডপের ভাবনায় থাকছে কলকাতার ঐতিহাসিক অ্যালবার্ট হল। ঔপনিবেশিক ভারতের স্থাপত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ভবনের ইন্দো-সারাসেনিক (Indo-Saracenic) স্থাপত্যশিল্পকে মণ্ডপের পরিসরে পুনর্নির্মাণ করার ভাবনা রয়েছে। ফলে এখানে পুজোর সঙ্গে কলকাতার স্থাপত্য-ইতিহাসও একসঙ্গে সামনে আসবে। উত্তর কলকাতা পেরিয়ে মধ্য কলকাতায় এলে ১৫০ বছরকে সামনে রেখে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের ‘বন্দেমাতরম’ বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। একটি ঐতিহাসিক গানের দীর্ঘ যাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে এবারের ভাবনা। ফলে এখানে থিমের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে ইতিহাস, স্মৃতি এবং জাতীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
থিমের এই বৈচিত্র্যই দেখিয়ে দেয়, কলকাতার দুর্গাপুজোয় মণ্ডপ এখন আর কেবল প্রতিমাকে ঘিরে তৈরি একটি কাঠামো নয়, তা হয়ে উঠেছে শিল্প, ইতিহাস, স্থাপত্য, সমাজ ও মানুষের অনুভূতির এক অস্থায়ী প্রদর্শনী।
দক্ষিণ কলকাতায় ঢুকতেই সুরুচি সংঘের ‘উৎস’, ৭৩তম বর্ষে একটি শব্দ, যার মধ্যে রয়েছে জন্ম—কোনও কিছুর মূল উৎসস্থলে ফিরে যাওয়ার ভাবনা। অন্যদিকে একডালিয়া এভারগ্রিন এবার নিয়ে আসছে গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের আদলে মণ্ডপ। স্থাপত্যনির্ভর মণ্ডপ নির্মাণে পরিচিত এই পুজোয় এবারও ভারতীয় স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনকে দুর্গাপুজোর পরিসরে দেখা যাবে। গত বছর যেখানে তামিলনাড়ুর তিরুভন্নামালাইয়ের অরুণাচলেশ্বর মন্দিরের আদল দেখা গিয়েছিল, এবার সেই যাত্রা পৌঁছচ্ছে গুজরাটের সোমনাথে।
বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের ‘যোজন’-এর ভাবনাতেও রয়েছে সংযোগের কথা। তাদের Mission RE—Rejoice, Recycle, Repeat-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে পরিবেশসচেতনতার একটি সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা থাকছে। অর্থাৎ পুরোনোকে বাদ দিয়ে নতুন নয়, বরং ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েই আরও সচেতন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিতে পারে এই মণ্ডপ। এছাড়া, ৯২তম বর্ষে মুদিয়ালি ক্লাবের ‘ঐতিহ্যের লোককথা’ আবার নিয়ে যাচ্ছে বাংলার লোকজ স্মৃতি, গল্প, বিশ্বাস ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের দিকে। দক্ষিণ কলকাতার আরও এক পরিচিত নাম দেশপ্রিয় পার্ক। তাদের এবারের ভাবনা ‘কাল্পনিক মন্দির’। কল্পনায় নির্মিত এক স্থাপত্যের ধারণাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপ তৈরির ইঙ্গিত মিলছে এই থিমে। বৃহৎ প্রতিমা ও মণ্ডপের জন্য পরিচিত এই পুজোয় তাই কল্পনা এবং নির্মাণশৈলী দুটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
৬৬ পল্লির ৭৬তম বর্ষের ভাবনা ‘তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। নামের মধ্যেই রয়েছে শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং আত্মসমর্পণের আবেগ, যা মূলত ‘বন্দেমাতরম্’ গানের ১৫০ বছরের পূর্তিকে কেন্দ্র করে হতে চলেছে। আর শতবর্ষ পেরিয়ে আসা আদি বালিগঞ্জ সর্বজনীনের ‘ভিত’ নামটিও তাদের ইতিহাসের সঙ্গে যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। মানুষের জীবনের সূচনা থেকে এ পর্যন্ত পরিবর্তনের ধারাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে এই মণ্ডপ। সাবেকি প্রতিমা, প্রায় ২৫ ফুটের দুর্গামূর্তি এবং একশো বছরের পরিবর্তনের গল্পের মধ্য দিয়ে অতীতের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর বার্তা থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ কলকাতার নাকতলা উদয়ন সংঘের এবারের থিম ‘কালধ্বনি’। নামটি সময়ের সঙ্গে সম্পর্কীয়। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমন্বয়ে তৈরি একটা ভাবাত্মক থিম হতে চলেছে হয়তো এই মণ্ডপ।
শহরের মূল কলকাতার বাইরে সল্টলেক এবং নিউ টাউনেও থিমের বৈচিত্র্যও কম নয়। সল্টলেক এফডি ব্লকের ৪২তম বর্ষের ভাবনা ‘নকশি কাঁথার মাঠ’। বাংলার লোকশিল্প, গ্রামীণ জীবন, স্মৃতি এবং নকশি কাঁথার পরিচিত মোটিফকে বৃহৎ মণ্ডপের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা থাকছে এখানে। আর নিউ টাউন সর্বজনীনের পঞ্চম বর্ষের ভাবনা ‘পদ্মভূষণ’। বাংলার নদী, নৌকা, পদ্ম এবং ঐতিহ্যবাহী চিত্রকল্পকে কেন্দ্র করে উৎসবকে নতুন মাত্রা দেওয়ার কথা জানিয়েছে পুজো কমিটি।
এই তালিকায় তাই একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে অনেকগুলি আলাদা কলকাতা। কখনও ইতিহাসের কলকাতা, কখনও গঙ্গার ধারের কলকাতা, কখনও স্থাপত্যের কলকাতা, কখনও আবার স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার শহর। কোথাও রাজস্থানের হাওয়া মহল, কোথাও গুজরাটের সোমনাথ মন্দির, আবার কোথাও জলছাপ, গঙ্গা, নকশি কাঁথা, লোককথা কিংবা ‘বিয়োজন’-এর মতো বিমূর্ত ভাবনা। থিমের এই বৈচিত্র্যই দেখিয়ে দেয়, কলকাতার দুর্গাপুজোয় মণ্ডপ এখন আর কেবল প্রতিমাকে ঘিরে তৈরি একটি কাঠামো নয়, তা হয়ে উঠেছে শিল্প, ইতিহাস, স্থাপত্য, সমাজ ও মানুষের অনুভূতির এক অস্থায়ী প্রদর্শনী।
তাই পুজো যত এগিয়ে আসবে, প্রশ্নটাও তত জোরালো হবে, এবার কলকাতা কী দেখাবে? কলকাতার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই মণ্ডপগুলি তার একাধিক উত্তর নিয়ে অপেক্ষা করছে।
__________
ব্যবহৃত ছবি: বঙ্গদর্শন আর্কাইভ

