মোবিয়াসের শীর্ষে লেখক
ডাকনাম রাজা। রায়চৌধুরী নয়, মুখোপাধ্যায়। ‘ভালো’ নাম অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়। পর্বতারোহী এবং অভিযাত্রী মহলে ‘রাজা’ নামেই পরিচিত। এঁকে বাস্তবের কাকাবাবু বলতেই পারেন। পেশায় একজন পর্বতারোহী। এই ব্যক্তি “সেই দলের মানুষ, সারা আকাশ যাদের ঘরের ছাদ, সারা পৃথিবী যাদের পায়ে চলার পথ।” একেবারেই প্রচারবিমুখ এই মানুষটি পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রথাগত চাকরির নিরাপত্তা ছেড়েছিলেন কয়েকটি দশক আগে। তারপর অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরেছে অজস্র অভিযানের গল্পে। আরোহণ করেছেন হিমালয় তথা অন্যান্য মহাদেশে অবস্থিত পর্বতমালার একাধিক শৃঙ্গ। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশের একাধিক দেশ চষে বেড়িয়েছেন অ্যাডভেঞ্চারের সন্ধানে। দু-চাকায় ভর করে পার হয়েছেন আফ্রিকার একাধিক দেশ। কখনও ‘দেশনায়কের পথে’ অনুসরণ করেছেন সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের যাত্রাপথ। কখনও বা পদার্পণ করেছেন সিকিমের দুর্গম কোনও শৃঙ্গে। যেখানে তাঁর আগে মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি কোনওদিন। অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের বিবিধ অভিযানের মাঝে একটির গল্প আমরা জানবো আজ। ২০১৫ সালে বিভূতিভূষণ সৃষ্ট শঙ্কর চরিত্রের যাত্রাপথ ধরে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন আফ্রিকা। গন্তব্য ছিল ‘চাঁদের পাহাড়’।
নিয়াকালেংগিজায় রোয়েঞ্জোরি ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশ দ্বার
অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের এই অভিযানের পূর্বে কোনও বাঙালির ‘চাঁদের পাহাড়’ অভিযানের কথা জানা যায় না। ২০১৫ সালেই সর্বপ্রথম কোনও বাঙালির বাস্তব ‘চাঁদের পাহাড়’ উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘চাঁদের পাহাড়’-এর পরিচয় বাঙালির কাছে নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি বইপ্রেমী বাঙালিরা তো বটেই; বৃহত্তর বাঙালি সমাজে এই উপন্যাসটির বিষয়ে জানেন না, এমন মানুষ অল্প। সত্যজিৎ রায়ের আঁকা কভারে অপরূপ সুন্দর এই উপন্যাসটি শোভা পায় অধিকাংশ বাঙালির বই সংগ্রহেই। বর্তমান সময়ে অডিও স্টোরি হিসেবেও উপন্যাসটি যথেষ্ট জনপ্রিয়। আর, একটি সিনেমা তৈরি হয়েছিল ২০১৩ নাগাদ। মূল উপন্যাসের আখ্যান অংশ কাল্পনিক হলেও পটভূমিটি ছিল সম্পূর্ণভাবে বাস্তবের আফ্রিকায় আধারিত। একাধিক অভিযাত্রীর আফ্রিকা ভ্রমণের বিস্তৃত বিবরণ পড়ে বিভূতিভূষণ রচনা করেছিলেন এই উপন্যাস। অধুনা কেনিয়া হয়ে উগান্ডা এবং শেষে জিম্বাবোয়েতে শঙ্করের যাত্রা শেষ হয়েছিল। চাঁদের পাহাড় বাস্তবের নিরক্ষীয় বর্ষাবন ঘেরা রোয়েঞ্জরি পর্বতমালা। হিরের খনির খোঁজে শঙ্কর পেরিয়ে যায় এই অঞ্চল। স্বপ্নে দেখা অ্যাণ্টন হাউপ্টম্যানের মতো ‘মাউন্টেন অফ দ্য মুন’ জয় করা হয়নি সেবার। কিন্তু একরাশ অভিজ্ঞতা ও হিরে সম্বল করে দেশে ফেরে বিভূতিভূষণের শঙ্কর। উপন্যাসটি অভিযাত্রী অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের অ্যাডভেঞ্চার স্পৃহার অন্যতম অনুপ্রেরণা। তাঁর লেখাতেই পাওয়া যায়, “যখন দেখলাম জীবনটা জলেই যাবে, …ছাদের আলসের চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় জীবন কেটে যাবে; তখন ভাবলাম একটা ঝাঁপ দিই।” এই অভিযানটি ছিল প্রিয় সাহিত্যিকের প্রতি তাঁর একটি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নিয়াবাটাবা থেকে নিয়ামিলেজুর পথে
পুরোনো মোম্বাসার গলি, ঠিক যেন উত্তর কলকাতা
অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের এই অভিযানের পূর্বে কোনও বাঙালির ‘চাঁদের পাহাড়’ অভিযানের কথা জানা যায় না। ২০১৫ সালেই সর্বপ্রথম কোনও বাঙালির বাস্তব ‘চাঁদের পাহাড়’ উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা। গত শতাব্দী থেকে দ্রুত বদলেছে দুনিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা। শঙ্করের সময়কার যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল আর নেই। যে রেললাইনের কাজে শঙ্কর আফ্রিকা পাড়ি দেয়, তার অবস্থাও ২০১৫ সালে জরাজীর্ণ। আকাশপথে মোম্বাসা পৌঁছেছিলেন অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়। খোঁজ করেছিলেন পোর্ট স্ট্রিটের। যে ঠিকানা থেকে প্রসাদদাসের চিঠি এসেছিল শঙ্করের কাছে। পরের গন্তব্য সাভো স্টেশন। উনিশ শতকের একেবারে শেষে যে অঞ্চল ছিল দুই মানুষখেকো সিংহের ভয়ে সন্ত্রস্ত। ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসে এই কাহিনি বিশদে বর্ণিত। জানা যায়, প্রায় ২৮ জন ভারতীয় শ্রমিক তাদের শিকার হয়েছিল। অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায় যখন পদার্পণ করেছেন সেখানে, ট্রেন চলাচল কমে এসেছে অনেকটাই। পুরোনো লাইন ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে নতুন হাইস্পিড রেল। সেই ঐতিহ্যবাহী ট্রেনে চেপেই অনিন্দ্যর পরের গন্তব্য ছিল নাইরোবি। তারপর নাইভাসা, নাকুরু হয়ে কেনিয়া থেকে উগান্ডায় পদার্পণ। এই দেশেই আছে বাস্তব ‘চাঁদের পাহাড়’। উগান্ডা এবং ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর সীমারেখাতেই রোয়েঞ্জরি পর্বতমালার অবস্থান।
আপার বিগো জলাভূমি
উগান্ডা প্রবেশ করে, রাজধানী কাম্পালা থেকে ফোর্ট পোর্টাল হয়ে কাসেসে। এখানেই শুরু অনিন্দ্যর ‘চাঁদের পাহাড়’ অভিযান। অনিন্দ্য জানান, বিভূতিভূষণের সেই বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় রোয়েঞ্জরির ভূপ্রকৃতি। দেখা যায় জয়েন্ট লোবেলিয়া, গ্রউন্ডসেল জাতীয় একাধিক সুদৃশ্য গাছপালা। পর্বতশৃঙ্গের পথে হাঁটার সময় দেখা মেলে কালোবাস বাঁদরের। যাদের কাণ্ডকারখানা দেখে শঙ্কর ‘হেসে খুন’ হয়েছিল। সঙ্গে দেখা মেলে ব্লু মাঙ্কি, রেড ডুইকার হরিণ, তিন শৃঙ্গ ক্যামিলিয়ন প্রভৃতি জীবজন্তুর। যদিও চোরা শিকারিদের কবলে তাদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে দ্রুত। অভিযাত্রীর স্মৃতিচারণের আনাচে কানাচে প্রমাণ মেলে, ওই স্থান স্বচক্ষে না দেখে শুধু বর্ণনা পড়েই কতটা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছিলেন বিভূতিভূষণ। আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে। যখন তথ্য আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না।
সাভো নদী, এই নদীর দুধারেই ছিল ভারতীয় শ্রমিকদের শিবির
সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ছাড়াও শেষ মুহূর্তে অভিযানটি হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের প্রতিবাদও। কেমনভাবে তা হয়েছিল, জানতে হলে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়। রোয়েঞ্জরির স্থানীয় জনজাতি বাকোঞ্জোদের কাছে পর্বতের উঁচু শৃঙ্গগুলি ছিল অত্যন্ত পবিত্র। ১৯০৬ সালে ইতালির ডিউক অফ আব্রুৎসি প্রায় তিনশো বাকোঞ্জো মালবাহককে সঙ্গে নিয়ে ‘জয়’ করেন শৃঙ্গগুলি। ‘বিজিত’ শৃঙ্গগুলির নাম দিয়ে দেন নিজের পছন্দ মতো। ইতালির রাজা, রানি, সেনাপতি এমনকি নিজের নামেও। আদিম অধিবাসীদের বিশ্বাস এভাবেই ঢাকা পড়ে যায় উপনিবেশের নগ্ন ক্ষমতা-প্রদর্শনের কাছে। আমাদের দেশেও উপনিবেশের এমন হাজারও চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। আছে প্রতিবেশী দেশ নেপালেও। যেখান পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ চোমোলুংমা আজ মাউন্ট এভারেস্ট নামেই পরিচিত। একইভাবে, রোয়েঞ্জরি পর্বতমালার উচ্চতম মাউন্ট স্ট্যানলি ম্যাসিফ অভিযাত্রী স্যার হেনরি মর্টন স্ট্যানলির নাম নামাঙ্কিত। ম্যাসিফের অন্তর্গত শৃঙ্গগুলির যে নাম আব্রুৎসি দিয়েছিলেন, আজও সেই নাম মান্য বলে ধরা হয়। সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম ‘মার্গারিতা’। অনিন্দ্য লিখেছেন, “ঔপনিবেশিকতা, শোষণ এবং তার এই উত্তরাধিকারের গ্লানি গ্রাস করেছিল আমাকে। আমি উঠিনি তাই মার্গারিতায়।” সঙ্গে তিনি জানান, সুগম রাস্তায় বহুবার আরোহণ করা শৃঙ্গে উঠতে ইচ্ছে হয়নি তাঁর। চলে গিয়েছিলেন পাশের অন্য একটি শিখরে। এবং সেই কারণেই, “বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’-এর সূত্র ধরে, যে পথ চলা শুরু হয়েছিল মোম্বাসা থেকে তা শেষ হয়েছিল মোবিয়াস শিখরে।”
হেজরনের হাতে ট্রায়সেরস জন্সটনি
ঐতিহাসিক উগান্ডা রেলওয়ের প্যাসেঞ্জার ট্রেন
সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ছাড়াও শেষ মুহূর্তে অভিযানটি হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের প্রতিবাদও। কেমনভাবে তা হয়েছিল, জানতে হলে যেতে হবে ইতিহাসের পাতায়।
অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তেই পাওয়া যায় তাঁর অভিযাত্রিক মননের পরিচয়। ‘উচ্চতম শিখর’ হাতের নাগালে পেয়েও ‘রেকর্ড’ তৈরির ইচ্ছে তাঁকে গ্রাস করেনি। বীরদর্পে ঢাক পিটিয়ে কোথাও ঘোষণা করেননি, “আমিই প্রথম, আমিই প্রথম।” কারণ, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ‘চাঁদের পাহাড়’-কে ছুঁয়ে দেখা। একবার স্বচক্ষে দেখা বিভূতিভূষণের বর্ণনার বাস্তবরূপ। তৃপ্তি ছিল তাঁর মনে এই ভেবে, “বিভূতিবাবুর শঙ্কর তার স্বপ্নের চাঁদের পাহাড়কে অবশেষে ছুঁয়েছে এক পাঠকের হাত ধরে।”
মেঘের উপরে দেখা দিল আলবার্ট এবং মার্গারিটা
_____________
অভিযাত্রী ও লেখক অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ২০২০ সালে অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায় রচনা করেন, ‘আবার চাঁদের পাহাড়’। তাঁর সাইকেলে আফ্রিকা অভিযানের বিবরণ পাবেন, ‘অতএব আফ্রিকা’ গ্রন্থে। আজাদ হিন্দ ফৌজের যাত্রাপথে সাইকেলে সিঙ্গাপুর থেকে মনিপুর অভিযানের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘দেশ নায়কের পথে’। সিকিমের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পাহাড়ি পাকদণ্ডির উপাখ্যান নিয়ে তাঁর সুদীর্ঘ গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘The Quiet Compass- Sikkim: Maps, Memory & Vanishing Routes’ সম্প্রতি প্রকাশিত হতে চলেছে।
*অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়ের ‘আবার চাঁদের পাহাড়’ গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও তাঁর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত।

