
‘শূদ্রক’-এর প্রযোজনা ও দেবাশিস মজুমদারের রচনা ও পরিচালনায় নাটক— ‘মরচে পড়া আলো’। ‘মরচে পড়া আলো’ নামটিই একটা রূপকধর্মী ইশারা দেয়। কিন্তু রূপক নয়, বরং সত্যাশ্রয়ী ঘটনার আড়ালে সময়ের ক্ষয়, সামাজিক অবক্ষয়, সম্পর্কের ভেতরে জমতে থাকা ঘুণ, প্রেম-অপ্রেম, স্মৃতিতন্তুর এক সূক্ষ্ম জাল রচনা করেছে এ নাটক।
নাটকের প্রধান চরিত্র (কমল চট্টোপাধ্যায়), যিনি ৭০ উত্তীর্ণ সফল এডভোকেট, ও তাঁর তরুণী সহকারী, যে আবার তাঁর পরকীয়া প্রেমের শরিক—অতীতের কেন্দ্রে থাকায়—সর্বক্ষণ এদের জালের আড়ালে রাখা হয়েছে। দুজনের সম্পর্কের আভাস উকিল সাহেবের চেম্বারের বাইরে কোথাও নেই, আর বোঝাপড়ার মধ্যেও একটা ‘ইউনিটি অ্যান্ড স্ট্রাগল’ লক্ষ করা যায়। যা কখনো মতান্তরে গড়ালেও মনান্তরে গড়ায় না। যেসব ক্লিশে হয়ে যাওয়া পরকীয়ার ঘটনা আমরা সাধারণত পর্দায় দেখি, সেসব থেকে এটি ভিন্ন। কেননা, মেয়েটি যথেষ্ট আত্মসম্মানবোধসম্পন্না, মানবিক, বসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং তাঁর পরিবারের সাংসারিক লক্ষণরেখা অতিক্রম করে না। এমনকি আর্থিক প্রলোভনকেও সে প্রত্যাখ্যান করে। এই পরকীয়া অবশ্য রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নয়, যথেষ্ট শরীরগন্ধী (জালের আড়ালে একটি ঘনিষ্ঠ চুম্বন-দৃশ্য রয়েছে।)
আলো নিভে যায়নি, কিন্তু তার ওপর মরচে জমছে। এই ভাবনাকে এক কাব্যময় গতি দিয়েছে দৃশ্যের মাঝে মাঝে ঘুরে যাওয়া কোরাসের দল। যারা আবৃত্তি করে কখনও জীবনানন্দ, কখনও বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, কখনও সুভাষ। ফলে নাটকটি পারিবারিক ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে ঘুরে যায় বৃহত্তর অঙ্গনে।

ঘটনা শুরু হয় পর্দা ওঠার আগে এডভোকেটের মৃত্যুর গুঞ্জন তুলে, যা দর্শক শুনতে পান ও অনেক কিছু আন্দাজ করেন। অর্থাৎ নাটকের পুরোটাই খণ্ডিত ফ্ল্যাশব্যাক। এডভোকেটের প্রথমা স্ত্রীর (ইন্দ্রাণী মৈত্র) ভূমিকাটি সংসারে অবহেলা, অসম্মান সহ্য করেও মধ্যবিত্ত সংসারে ছেঁড়া পাল ও শক্ত করে হাল ধরে থাকা এক নাবিকের। যার মুখের ওপর পড়েছে মরচে পড়া আলো।
আলো নিভে যায়নি, কিন্তু তার ওপর মরচে জমছে। এই ভাবনাকে এক কাব্যময় গতি দিয়েছে দৃশ্যের মাঝে মাঝে ঘুরে যাওয়া কোরাসের দল। যারা আবৃত্তি করে কখনও জীবনানন্দ, কখনও বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, কখনও সুভাষ। ফলে নাটকটি পারিবারিক ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে ঘুরে যায় বৃহত্তর অঙ্গনে। কবিতার মেটাফর এক পরিপূরক রূপকল্প হিসেবে ব্যাকগ্রাউন্ডে আনা হয়েছে, যেখানে একের পর এক ফুটে ওঠে রবীন্দ্রনাথ থেকে গণেশ পাইন ও সনৎ করের আঁকা ছবি। এই দৃশ্যপট নাটককে এক বহুমাত্রিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বলা যায়, গ্রিক নাট্যধারার পরিসরকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করেছেন পরিচালক।
নাটকটি মূলত এমন কিছু মানুষকে কেন্দ্র করে এগোয়, যারা জীবনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নিজেদের অতীত, ভাঙন এবং অপূর্ণতার মুখোমুখি। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক পরিবর্তন এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মধ্যে তারা খুঁজে বেড়ায়—আসলে কী হারিয়েছে? কেবল মানুষ, না নিজের ভেতরের আলোও? নাটকের প্রধান ভাবনা মানুষের ভেতরের মানবিকতার ক্ষয়, যা সর্বগ্রাসী এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শের মরচে পড়ে যাওয়া, স্মৃতি ও বর্তমানের সংঘাত, নিঃসঙ্গতা এবং যোগাযোগহীনতার ট্র্যাজেডি। তবুও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা—মরচে পড়া আলোকে আবার জ্বালিয়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।
মঞ্চভাবনায় ও সংগীতে একটা অভিনবত্ব আছে। বিশেষত জীবনানন্দের কবিতাকে গানরূপে ব্যবহার (সংগীত : উপালী চট্টোপাধ্যায়), সমান্তরাল দৃশ্যপটে বিকশিত ঘটনাপ্রবাহের বাস্তবতাকে একটি কেন্দ্রীয় রূপকের মধ্যে ঘনীভূত করার কৌশল। নির্দিষ্ট ঘটনা তখন আর শুধু চরিত্রের ভিতরে থাকে না; তা বৃহত্তর সমাজ, ইতিহাস বা মানবজীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এর ফলে এক বহুমাত্রিক অর্থ সৃষ্টি হয়। একই দৃশ্য একসঙ্গে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অস্তিত্ববাদী—বিভিন্ন স্তরে অনুধাবন করা যায়। এটি ব্রেখটের নান্দনিক প্রয়োগের কথা মনে পড়িয়ে দেয়

মরচে ও আলো—এই দুটি শব্দ পরস্পরবিরোধী। আলো মানে জীবন, সত্য, ভালোবাসা, মানবিকতা, আশা। মরচে মানে ক্ষয়, অবহেলা, সময়ের দাগ, স্থবিরতা। আলোতে তো মরচে ধরে না। তাহলে কেন এই নাম? কারণ নাটকটি বাস্তব আলো নিয়ে নয়, মানুষের অন্তরের আলো নিয়ে।
অতীতের বিন্যাস ধরার জন্য জালের ব্যবহার, আলো-অন্ধকারের ব্যবহার শুধু দৃশ্যসজ্জা নয়, নাটকের ভাষা। সংলাপের অন্তর্মুখী গতি এবং ন্যূনতম মঞ্চসজ্জার মাধ্যমে চরিত্রগুলির মানসিক অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। দৃশ্যবিন্যাসে বাস্তব ও স্মৃতির স্তর একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে নাটকটি সরল কাহিনির চেয়ে বেশি এক মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
আমরা শিরোনামের দর্শনের ওপর একটু আলো ফেলব। মানুষের অন্তর্জীবন নিয়ে রচিত একটি নাট্যভাষ্য। তাই এর বিশ্লেষণও প্রতীকী স্তরে করলে বেশি অর্থপূর্ণ হয়।
মরচে ও আলো—এই দুটি শব্দ পরস্পরবিরোধী। আলো মানে জীবন, সত্য, ভালোবাসা, মানবিকতা, আশা। মরচে মানে ক্ষয়, অবহেলা, সময়ের দাগ, স্থবিরতা। আলোতে তো মরচে ধরে না। তাহলে কেন এই নাম? কারণ নাটকটি বাস্তব আলো নিয়ে নয়, মানুষের অন্তরের আলো নিয়ে। সেই আলো নিভে যায়নি, কিন্তু আর উজ্জ্বলও নয়; সময় ও সমাজের ধুলো-মরিচায় ঢেকে গেছে। সময় মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেয়—স্বপ্ন, সম্পর্ক, আদর্শ, বিশ্বাস। কিন্তু সময় কিছু ফিরিয়েও দেয়—স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিই অনেক সময় সবচেয়ে বড়ো যন্ত্রণা। নাটকের চরিত্রদের কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেও পড়া যায়। মার্টিন হাইডেগার বলেছিলেন, মানুষ প্রায়ই দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসে নিজের প্রকৃত সত্তাকে হারিয়ে ফেলে। আর Albert Camus দেখিয়েছেন, অর্থহীনতার মধ্যেও মানুষকে নিজের অর্থ নিজেকেই নির্মাণ করতে হয়।
‘মরচে পড়া আলো’ এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে এক ধরনের সংলাপ রচনা করে। এডভোকেটের স্ত্রীর আশ্রমে চলে যাওয়া, নিজেকে ফিরে পাওয়ার ব্যর্থ অনুসন্ধান ছবির আর-একটি দিক তুলে ধরেছে। সে পরিবারবিচ্ছিন্ন হতে পারল না, কেননা মেয়ে (আমেরিকাবাসী), নাতি, ছেলের চিন্তায় ঘরে ফিরে গেল। নাতি ছেলেটি শিক্ষিত; তার চাকরি ছেড়ে দেশে দেশে নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার খবর ক্রমে দূরে থাকা স্বজনদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এভাবেই নাটকটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প হলেও বৃহত্তর অর্থে আধুনিক সমাজের সমালোচনা। যুদ্ধবিরোধী এক অবস্থান বোঝাতে প্যালেস্টাইন যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবস্থায় যুদ্ধবিরোধী বক্তব্যটি আলাদা রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং নাটকের মানবতাবাদী পরিসরের সম্প্রসারণ। যদিও যুদ্ধবিষয়ক উল্লেখিত অংশটি কিছুটা প্রক্ষিপ্ত মনে হয়। আসলে লেখক পৃথিবীব্যাপী ঘনিয়ে আসা সংকটকে একটা সামগ্রিকতায় বেঁধে ফেলতে চেয়েছেন।
এই নাটকের ভাবনার সঙ্গে অস্তিত্ববাদী দর্শনের একটি সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। নাটকটি যেন শেষ পর্যন্ত বলে—আলো কখনও পুরোপুরি নিভে যায় না। মানুষ যদি নিজের ভেতরের মরচে চিনতে পারে, তবে সেই আলো আবারও জ্বলে উঠতে পারে। এই আশাবাদই নাটকের সবচেয়ে মানবিক দিক।

প্রধান চরিত্রটি যেহেতু মৃত, এবং পুরো নাটকটাই খণ্ডিত ফ্ল্যাশব্যাক, তাই জালের আড়ালে থাকা শুধু মঞ্চসজ্জার কৌশল নয়, বরং একটি অস্তিত্বগত (ontological) অবস্থান। সে আর জীবিত মানুষের জগতে নেই। সে উপস্থিত, কিন্তু স্পর্শযোগ্য নয়; দৃশ্যমান, কিন্তু নাগালের বাইরে। জালটি তাই জীবিত ও মৃত, বর্তমান ও অতীত, স্মৃতি ও বাস্তবের মধ্যবর্তী পর্দা।
এই কৌশলের একটি বড়ো শক্তি আছে। দর্শক কখনও সরাসরি চরিত্রটিকে জানে না; বরং অন্যদের স্মৃতি, অপরাধবোধ, ভালোবাসা, অনুশোচনা এবং অসমাপ্ত কথোপকথনের মাধ্যমে তাকে নির্মাণ করে। অভিনয়ের কথা আলাদাভাবে না বলে দুর্ধর্ষ টিমওয়ার্কের কথাই বলব। দেবাশিসবাবু নিজে এক বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যা বেশ উপভোগ্য।
সব মিলিয়ে ‘মরচে পড়া আলো’ এ সময়ের নিরিখে এক ব্যতিক্রমী প্রযোজনা।

