
সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। জানুয়ারির শেষ। সাগরপাড়ে কখনোই ঠান্ডা সেরকম গা কাঁপানো না হলেও, সন্ধে নামার আগে থেকেই যে হালকা বাতাসটা বয় সেটাকে প্লেজেন্ট বলা চলে। হোটেলের লন ছেড়ে দশ ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে সৈকত ধরে পুব দিকে যাওয়াই মনস্থ করলাম। গতকাল গিয়েছিলাম পশ্চিমে। একটা উঁচু মতো বালির ঢিবির উপরে বেশ খানিক সময় বসে রাশি রাশি লাল কাঁকড়ার ইতি উতি দৌড়াদৌড়ি দেখে বেশ মজা পাচ্ছিলাম। খেয়াল করিনি কখন যে অন্ধকার নেমেছে। বালি টালি ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু ঘাবড়ে গেলাম… আসবার সময় দেখেছি লন ছেড়ে গেটের মুখে একটা নোটিশ বোর্ড লটকানো আছে, সন্ধ্যা ছটায় গেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার। সুতরাং আধো অন্ধকারে খানিক পা চালাতেই হল। (স্মৃতির গোপালপুর)

আমার ঠিক সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গোপালপুরের লাইট হাউস যার উপরে বাতি জ্বলে উঠবে খানিক বাদেই। আরও এগিয়ে যাই। বোঝবার চেষ্টা করি কোথায় ছিল বালিয়াড়ির সেই খাড়া ঢাল যার ওপর দিয়ে নেমে আসা যেত সৈকতে।
আজ সেই জন্য হাতে সময় নিয়ে বেরুনো। ভেজা বালির উপর দিয়ে হেঁটে চলেছি। এখন সমুদ্রে ভাঁটা। জল নেমে গেছে বেশ খানিকটা। তবু মাঝে মাঝে কয়েকটা বেয়াড়া গোছের ঢেউ এসে হঠাৎ আছড়ে পড়ে, পায়ের পাতা ভিজিয়ে দিয়ে মুহূর্তে পালিয়ে যায়। এধারে ওধারে আবর্জনার ছড়াছড়ি। ফুল, বেলপাতা, সিঁদুরের প্যাকেট, বেতের ঝুড়ি, ছেঁড়া চটি, জলের বোতল এমন আরও কত কী! আর আসে প্রচুর ঝিনুক শাঁখ আর জলজ প্রাণী যার মধ্যে কাঁকড়াই বেশি। সৈকতের পুব দিকে বেশ খানিকটা হেঁটে গেলেই তো সেই ব্যাকওয়াটারের শান্ত সরোবর। প্রচুর জেলে ডিঙ্গি দূরে দূরে দেখা যায়। দূর থেকে তাদের চাল চলনে খুব একটা ব্যস্ততা চোখে পড়ে না। আমার ঠিক সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গোপালপুরের লাইট হাউস যার উপরে বাতি জ্বলে উঠবে খানিক বাদেই। আরও এগিয়ে যাই। বোঝবার চেষ্টা করি কোথায় ছিল বালিয়াড়ির সেই খাড়া ঢাল যার ওপর দিয়ে নেমে আসা যেত সৈকতে। মা আমার হাত ধরে খুব ভয়ে ভয়ে নামলেও আমি সুযোগ পেলেই বসে পড়তাম ঢালের ওপরে যাতে হুট করে স্লিপের মত নেমে আসা যায়। তারপর সর্বাঙ্গে বালি মেখে দৌড়ে গিয়ে সমুদ্রের জলে ঝাঁপ। (স্মৃতির গোপালপুর)
লম্বা বিঘৎ টাইল সাজানো সিঁড়ির আড়ালে বালিয়াড়ি উধাও। উঠে এসে একটু এগিয়ে খোঁজ করি হোটেলের হলদেটে দোতলা বাড়িটার – যার ওপর নিচে ছিল সমুদ্রমুখী বারান্দা। হোটেলের নাম ছিল বাহারি – ‘তাজমহল’! পিছনের দিকটায় নারকেল, ক্যাসুরিনা আর ঝাউ গাছের ছায়া মোড়া জেলে আর মাঝি মাল্লাদের গ্রাম। লোনা বাতাসে দোলে বিশাল গাছের মাথাগুলো। যে রাস্তাটা বেরহামপুরের দিক থেকে ছুটে সৈকতের কাছে এসে ধাক্কা খেয়ে বাঁদিকে ঘুরে গেছে তার দুপাশে কেয়া গাছের জঙ্গল। কেউ খবর দিতে পারল না। মনে মনে হিসেব কষে দেখি, সময় তো বড়ো কম নয়, এর মাঝে কেটে গেছে ৫৩ বছর। হয়ত ঝড় ঝঞ্ঝা এসে ভেঙে দিয়ে গেছে অথবা গেছে কোনো ব্যবসায়ীর হাতে। একটু পশ্চিমে হেঁটে আসি। লাইট হাউসটা এখন একদম যেন মাথার ওপর। মনে পড়ল, ওর পাশেই ছিল এক সাহেবের বাংলো। কী যেন নাম – টমাস না উইলসন; মেমসাহেবের চোখ ছিল নীল। বাপ ঠাকুরদার দালানের সিকিভাগ তখনই গিয়েছিল সাগরের পেটে। বাকি বারো আনা জুড়ে তাদের সংসার। সমুদ্রপারের ধবধবে সাদা রঙের বাংলোতে শঙ্কায় কাটে তাদের জীবন। বাগানের কাজু খাইয়ে ছিলেন মেমসাহেবা। না, সেই বাংলোটারও হদিশ পাওয়া গেল না। (স্মৃতির গোপালপুর)

তবে এগোনো যাক এবার আরও পুবে। সমুদ্র ওখানে বাঁক নিয়ে খানিক দূরে সড়ে গেলেও তার জল ঢুকে পড়েছে ভিতরে যাকে বলে ব্যাকওয়াটার। মিষ্টি জলের সঙ্গে লোনা জল মাখামাখি হয়ে তৈরি হয়েছে সরোবর। রাস্তার ডানদিকে, সৈকত সংলগ্ন গুদাম ঘর গুলো ভূতের মত দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাস বলে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে যখন উড়িষ্যা কলিঙ্গ রাজ্যের অংশ হিসেবে সমৃদ্ধি লাভ করেছিল, তখন থেকেই গোপালপুরের বালুচর সামুদ্রিক অভিযানের সাক্ষী। জাভা, বালি এবং সুমাত্রায় উপনিবেশ গড়তে কিছু মানুষজন সম্ভবত এখান থেকেই পাড়ি দিয়েছিল সাগরপারের সেই অজানা দেশের উদ্দেশ্যে। আজও কার্তিক পূর্ণিমায় ‘বালি যাত্রা’ পালিত হয়। ‘বৈঠা বন্দনা’-র মধ্য দিয়ে নাবিকদের জন্য নিবেদিত হয় শ্রদ্ধা যারা বুক বেঁধে করেছিল সাগর পার। (স্মৃতির গোপালপুর)
হেঁটে চলেছি আরও পুবে। আড়াই যুগ আগে একটা শান্ত গ্রাম্য পরিবেশ ছিল এদিকটায়। এখনকার ছবি অন্য। একটা সময় ডেনমার্কের ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্গত ছিল সাগরপারের ছোট্ট জনপদ গোপালপুর। এখান থেকে সুদূর বার্মায় বাণিজ্য চলত। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে (১৯১৪ থেকে ১৯৪৫) গোপালপুর খাকি পোশাকধারী সৈন্যদের আস্তানা হয়ে গেল। রেঙ্গুনে সৈন্য ও রসদ পরিবহনের পূর্বাঞ্চলীয় ঘাঁটি হয়ে দাঁড়াল গোপালপুর। বাণিজ্য বন্দর আর নৌ ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে সেই শান্ত জনপদ পরল জাঁকজমকের বেশ। হোটেল ব্লু হেভেনের জনাকীর্ণ নাচের আসর ঘিরে তখন প্রাণের মেলা। ১৯১৪ সালে সুদূর ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে এসে সিনোর ম্যাগলিওনি তৈরি করলেন বিলাসবহুল বিচ রিসোর্ট যা নাকি পাল্লা দিতে পারে কলকাতার স্পেন্সেস হোটেল, উইলসন হোটেলের সঙ্গে। মন্দির শহর পুরীতে ভক্তের সমাগমে ভিড় লেগে থাকে। আর তার একশ মাইল দক্ষিণে বালিয়াড়ি ঘেরা গোপালপুরের তখন এক স্বপ্নময় উপস্থিতি; আস্তানা বাঁধলেন বেশ কিছু ইউরোপিয়ান আর রেল কোম্পানির অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বাবুরা। যুদ্ধের সময় বার্মার সঙ্গে বাণিজ্য হ্রাস পেতে শুরু করে এবং ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ক্রমশ বাণিজ্যিক কার্যকলাপ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গোপালপুরের একসময়ের প্রাণবন্ত, জমকালো বলরুমগুলো খোলা আকাশের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। কোলাহলপূর্ণ জেটিগুলো জীর্ণ হয়ে যায়। গুদামঘরগুলো পরিণত হয় ভবঘুরেদের নোংরা আশ্রয়স্থলে।

সেবার গোপালপুরে বেড়াতে এসে বাবার সঙ্গে নিয়ম করে এদিকটায় আসা হত। প্রায় এক মাস ছিলাম। এদিকটায় একটা নুলিয়া আর জেলে বস্তি ছিল – তাদের বাড়ির সামনে বসে চলত জাল বোনা বা নৌকা মেরামতির কাজ। বাতাসে মাছের আঁশটে গন্ধের সঙ্গে আলকাতরার গন্ধ মিশে ভেসে যেত অনেক দূর। নুলিয়াদের বাচ্চাগুলো, সে হয়ত হবে আমারই বয়সী, জলে নেমে দিব্যি সাঁতার দিত। পশ্চিমে হাওয়া বদলে উৎসাহী বাঙালি তখনও ‘গোপালপুর-অন–সি’ নিয়ে খুব একটা মাতামাতি করেনি। দু-একজন সাহেবকে অবশ্য দেখতাম লাঠি হাতে সান্ধ্য ভ্রমণে। একদিন সেরিফ এসেছিল আমাদের সঙ্গে। সে ছিল আমাদের তাজমহলের ছোটো ম্যানেজার। তার সঙ্গে এই পথে গিয়েই বাঁদিকে কোথায় যেন একটা কাজু গাছের ক্ষেত দেখে এসেছিলাম। দুদিন পরে সেখান থেকে সে নিয়ে এসেছিল কাজু ফল ভর্তি ডাল। হোটেলের পিছনের উঠোনে কাঠের আগুনে ঝলসে বানিয়ে দিয়েছিল কাজু। সব স্মৃতি!

একটা সময় ডেনমার্কের ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্গত ছিল সাগরপারের ছোট্ট জনপদ গোপালপুর। এখান থেকে সুদূর বার্মায় বাণিজ্য চলত। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে (১৯১৪ থেকে ১৯৪৫) গোপালপুর খাকি পোশাকধারী সৈন্যদের আস্তানা হয়ে গেল।
সূর্য ডুবে গেছে। পশ্চিমের আকাশের শেষ লালটুকু শুষে নিয়ে সন্ধ্যা নামছে। পশ্চিম প্রান্তে নামি দামি হোটেল গুলোর আলো বাড়াবাড়ি রকমের হলেও এদিকে বেশ খানিক আলো আঁধারি। সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার শব্দ আর মুখে লোনা বাতাসের ঝাপট। লাইট হাউসের আলোটা আধো অন্ধকারে ঘুরে চলেছে দশ সেকেন্ডে একবার। একটা ধ্বংসাবশেষের ভেতর দিয়ে গুটিগুটি নেমে এলাম সমুদ্র সৈকতে। এবার ফেরার পালা।

চলতে গিয়ে হঠাৎ নজর গেল জলের দিকে। সাদা সাদা ঢেউগুলো এসে ভেঙে পড়ছে। বোধহয় জোয়ার আসবার তোরজোড় চলেছে। কে যেন একটা নড়ে চড়ে উঠে এদিকেই আসছে। আবছা অন্ধকারে বেঁটে খাটো লোকটাকে দেখে ঘাবড়েই গেলাম প্রথমে। কিন্তু তারপরেই বুঝলাম শেয়ালের মত ছুঁচলো কান আর নেড়া মাথা লোকটা তো সেই প্রোফেসর হিজিবিজবিজ। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছি – হাতে এখনও তার সেই একচোখো দূরবীনটা। মিটিমিটি চাহনিতে দুষ্টু হাসির ভাব এখনও রয়েছে একই রকম। মোবাইলের টর্চের আলোটা আলতো করে মুখে ফেলতেই মিহি গলায় বললেন, “এত দেরিতে এলে, ও তো চলে গেল! ছবির মত মানুষ পেয়ে গেলাম বুঝলে, এক ঘণ্টায় জোড়া লেগে গেল, চলে ফিরে বেড়াল, পরিষ্কার কথা বলল, ষষ্ঠীচরণ ভয় পাচ্ছিল বলে মাথায় মুগুরের বাড়ি মারল আর তারপরে সোজা চলে গেল সমুদ্রের দিকে। বুঝলে একবার ভাবলুম ডাকি, কিন্তু নাম তো নেই, কী নামে ডাকবো! মানুষের মাথা, সিংহের পা, শজারুর পিঠ, রামছাগলের শিং – অথচ জলে গেল কেন সেটাই তো বুঝতে পারলাম না…”! এই বলেই গোল মত মাথাটা ভীষণ ভাবে নাড়তে নাড়তে হিজিবিজবিজ মিলিয়ে গেল অন্ধকার ভাঙাচোরা বাড়িগুলোর দিকে। আমি তাড়াতাড়ি পা চালালাম হোটেলের দিকে।
_________________
‘প্রোফেসর হিজিবিজবিজ’ চরিত্রটি ও ঘটনা সত্যজিৎ রায়ের একই নামের গল্প থেকে নেওয়া। ছবি সৌজন্যে: লেখক

