পশ্চিমবঙ্গ চারুকলা উৎসব ২০২৩ : বাংলার শিল্পী ও শিল্পের মিলনোৎসব

চারুশিল্পের পসরায় সেজে উঠেছে রবীন্দ্রসদন, নন্দন চত্বর

যাঁরা কলকাতা থেকে অনেক দূরে থাকেন, যাঁরা তরুণ প্রজন্মের শিল্পী, বছরে একবার রাজ্যের প্রানকেন্দ্রে প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে তাঁদের কাজ মিলেমিশে যাচ্ছে। সেকারণেই এটা সমগ্র শিল্প জগতের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা উৎসব—তিলোত্তমায় শিল্পী ও শিল্পের মিলনোৎসব। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের রাজ্য চারুকলা পর্ষদের আয়োজনে, ২ থেকে ৯ নভেম্বর রবীন্দ্রসদন, নন্দন সংলগ্ন প্রাঙ্গন, একাডেমি অফ ফাইন আর্টস, একতারা মুক্তমঞ্চ ও গগনেন্দ্র প্রদর্শশালা জুড়ে হয়ে গেল বর্ণাঢ্য চারুকলা উৎসব বা চারুকলা মেলা। গতকাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য চারুকলা পর্ষদের সভাপতি তথা শিল্পী যোগেন চৌধুরী, সহ-সভাপতি শিল্পী শুভাপ্রসন্ন, পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি এবং কারিগরী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও পর্যটন বিভাগের মন্ত্রী শ্রী ইন্দ্রনীল সেন প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তি। রাজ্যের একাধিক প্রবীণ শিল্পীদের ‘মহাশিল্পী’ সম্মানে সম্মানিত করে, ৫০ জনের বেশি শিল্পী একসঙ্গে ছবি এঁকে প্রতি বছরের মতো এবছরও চারুকলা উৎসবের শুভসূচনা হল। 

 

এবছরও চারুকলা মেলায় বসেছে বাংলার নানা গোষ্ঠীর শিল্পকর্মের পসরা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ৫০টির বেশি স্টলে প্রদর্শিত হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পচর্চারত নির্বাচিত শিল্পীদের শিল্পকর্ম। নবীন-প্রবীন শিল্পীদের পারস্পরিক মেলবন্ধনের পাশাপাশি শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্ম বিক্রিরও সুযোগ পান তাঁরা। শিল্প সংগ্রাহকেরা এই মেলা থেকে চিত্র ও ভাস্কর্য, পটচিত্র, পোস্টার, ছাপাই ছবি ও ফটোগ্রাফি ও সেরামিক মাধ্যমের শিল্পকর্ম শিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি সংগ্রহ করার সুযোগ পাবেন এবং পর্ষদ প্রকাশিত বই ও অ্যালবামও কেনার সুযোগ আছে। প্রতিদিনই উৎসব প্রাঙ্গনে আয়োজিত হয়েছে গান ও ছবির আড্ডা। এছাড়াও ছিল বিভিন্ন শৈল্পিক অনুষ্ঠান।

তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দনীল সেন বলেন, “২০১১-র পর থেকে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু চারুকলা পর্যদ নয়, সংগীত অ্যাকাডেমি, নজরুল অ্যাকাডেমি এগুলো ঢেলে সাজাচ্ছেন। যাঁরা প্রখ্যাত শিল্পী এবং নবাগত শিল্পী সবাইকে নিয়েই আমরা এই ধরনের কাজ করে চলেছি। আগামী দিনেও করবো। মূলত তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দিতেই এই আয়োজন।”

এই শিল্পমেলা আয়োজিত হয় মূলত তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য। ক্রমশ এই উৎসবের পরিসর, পরিধি বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিভিন্ন জেলা থেকে, গ্রাম থেকে প্রবীণ-নবীন শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্ম নিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই উৎসবে সামিল হন। ছবি বিক্রির পাশাপাশি শহরের মানুষের কাছে নিজেদের কাজ প্রদর্শনীর সুযোগ এই মেলা। পাশাপশি থাকে সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পীদের কাজ। এবছর তরুণ শিল্পীদের প্রায় ১১০০ বেশি ছবি জমা পড়েছে, যার মধ্যে ২০০-র বেশি কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। যোগ্য শিল্পীকে উৎসাহিত করতে পুরস্কার ও শংসাপত্রও দেওয়া হয় মেলা শেষে, কাজগুলি প্রদর্শিত হয় গগনেন্দ্র প্রদর্শালায়।

মিস্কড মিডিয়ার মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত দর্শনকে তুলে ধরেন শিল্পী পুজা সরকার। তাঁর কথায় “প্রায় দশ বছর হল এখানে যোগদান করছি। অভিজ্ঞতা কম-বেশি অন্যান্য বছরের মতোই। এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করাটাই আমার কাছে অনেক।”

 

গত বছরের মতো এ বছরের মেলায় পোস্টারের সম্ভার নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি ব্যতিক্রমী স্টল। স্টলের তরফ থেকে শিল্পী কাঞ্চন দাস বলেন, “গত বছর আমরা প্রথম স্টল নিয়েছিলাম। নামী শিল্পী থেকে নবীন শিল্পী এমনকি যাঁরা প্রথাগত শিল্পী নন, তাঁদের করা পোস্টারও আমরা প্রদর্শন করছি। যে কেউ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পোস্টার আঁকতে পারেন। আমাদের পোস্টার সমসাময়িক সমাজ, রাজনীতি সর্বোপরি মানুষের কথা বলে।”

নদিয়া জেলার ‘হোয়াইট চারকোল’ স্টলের পক্ষ থেকে আর্ট কলেজের ছাত্র অঙ্কুশ সেনগুপ্ত বলেন, “এবছর আমার প্রথম অংশগ্রহণ। সারা বছরই আমরা কাজ করি। গ্যালারি ভাড়া নিয়ে প্রদর্শনী করার সুযোগ মেলে না সবসময়। চারুকলা মেলা সেই অভাব পূরণ করলো।”

মেলার প্রথম দিন শিল্প-উৎসাহী সহ সাধারণ দর্শকদের ভিড় ছিল দেখার মতো। বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীদের কথায়, এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পেরে তাঁরা খুবই আনন্দিত।

ছবি- নিজস্ব

Developed by DXDasia