
আর্ট কলেজের সঙ্গে কৈশোরের যে যোগ, তাকে ভোলা যায় না
আর্ট কলেজ নিয়ে আমার স্মৃতিচারণ কোথা থেকে শুরু করবো জানি না। বলতে গেলে ইতিহাস হয়ে যেতে পারে। তবে আমার যেটা মনে হচ্ছে সেটাই বলি। ছোটোবেলার একটা আলাদা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট থাকে। আসলে বলতে পারি যে, আর্ট কলেজের সঙ্গে কৈশোরের সেই যে যোগ সেটা ভুলে থাকা যায় না। তখন আমরা নতুন জীবন শুরু করেছি, ঘর থেকে গুটি গুটি পায়ে বেড়িয়ে বৃহত্তর জগতে আসছি, গোটা মন জুড়ে ভয়, উত্তেজনা, উন্মাদনার তোলপাড়। মনে মনে ভাবছি গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ মানে এতো অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, হ্যাভেলের জায়গা। আজও এরকম একটা ভাবনা আমার মনকে দখল করে রেখেছে।
আর্ট কলেজে যখন ভর্তি হলাম, তখন সবে ব্রিটিশরা আমাদের দেশ ছেড়ে গিয়েছে। আট ন’বছর মতো হবে। কারণ, আমি তো আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছি ১৯৫৫ তে। আর্ট কলেজের বাগান, ঘরের রং, চেয়ার-টেবিল, পুকুরের জলের কাছের বাগান সব কিছুর কথা মনে পড়ে। ও রকম পরিচ্ছন্নতা ভাবা যায় না। এই কলেজে আমাদের সময় ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসতো উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত ঘর থেকে।

মেয়েদের একটা গ্রুপ এল পড়তে। সব কিছুর ওপর দেখতাম ওদের একটা কম্যান্ড ছিল। ওদের একটা সফিস্টিকেশান ছিল। কিন্তু কলেজে সেই সময় এত হৈ-হল্লা ছিলনা। সবাই আলাদা আলাদা রাজনৈতিক বিশ্বাসে বিশ্বাস করলেও কলেজের ভিতর কোনও রাজনৈতিক বিভেদ ছিল না। আমাদের কালচারাল প্রোগ্রাম হত, ডুমুরতলা ছিল, সেখানে আমরা বসতাম, ক্যান্টিনে আড্ডা দিতাম। কলেজে ঢুকলেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে আসত। সিঁড়ি, সিঁড়ির ধাপে টাঙানো ছবি, দেওয়াল জুড়ে ফ্রেসকো, অবনীন্দ্রনাথের মূর্তি এসব কথা আজও মনে পড়ে।
এবার একটু আর্ট কলেজে ঢোকার গল্প বলি। আমি তো বাড়িতে বসে বসে ছবি আঁকতাম, আমার কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না। আমি যখন অ্যাডমিশান টেস্ট দিতে গেলাম, সেখানে দেখে দেখে একটা ইউরোপিয়ান স্ট্যাচু আঁকতে হয়েছিল। সেই সময় দেখি কী, আমার আশেপাশে যারা কাজ করছে, তারা প্রচুর মেজারমান্ট করছে। আমি তো ওসব জানি না। আমি করলাম কী, আমার মতো করে নিপুণভাবে কাগজের ঠিক মাঝে মূর্তিটা আঁকলাম। র্যাং ক ভালো হল না ঠিকই, কিন্তু সিলেক্ট হলাম। ও রকম দেখে দেখে মূর্তি তো আগে কখনও আঁকিনি। যাই হোক, আমাকে কিন্তু প্রথমে স্কাল্পচারে দেওয়া হয়েছিল। আমি রাজি হয়ে গেলাম। শুরু করলাম ক্লাস। মাস্টারমশাই হিসেবে একে একে পেলাম প্রদোষবাবু, মাখনবাবু আর রথীনবাবুদের।

তখন দেখতাম, দল বেঁধে সব সুন্দর দেখতে মেয়েরাও আর্ট কলেজে পড়তে আসছে। ফিল্মস্টার কাবেরী বোসের বোন কৃষ্ণা বসু, অরুন্ধতী ঘোষ – এঁদের কথাও মনে আছে। কাবেরী ঘোষ, সে আবার খুব ড্যান্স করত। তারা সব পড়তে এসেছিল। ওদিকে সেকেন্ড ইয়ারের পর আমি আমার পজিশন রিভাইভ করি। যত্ন করে কাজ করতে থাকি, তারপর পেইন্টিং-এ চলে আসতে অসুবিধে হয় নি। সেই সময় সাঁচী-র একটা মূর্তি দেখে পোর্ট্রেট পেইটিং করি।
সেই সময় আমাদের ইনচার্জ ছিলেন দেবকুমার বাবু। স্টিল লাইফ, পোর্ট্রেট, কম্পোজিশান, সাদা-কালোর কাজ, স্কেচ সব করতাম। একবার দেবকুমার বাবু আমার কাজের ওপর লিখে দিলেন কনগ্রাচুলেশনস। সেই থেকে ফিফথ ইয়ার পর্যন্ত ফার্স্ট হয়েছি। ওদিকে আবার আমি ছিলাম ক্লাসেও সবার ছোট।
এবার একটা মজার কথা বলি। প্রথমে আর্ট কলেজে ঢুকি হাফ প্যান্ট পরে। তারপর ধুতি পরতাম ও আরো পড়ে পায়জামা পরেই কলেজে যেতাম। সেসব একদিন ছিল। আমরা খুব সোশ্যাল ছিলাম, খেলাধুলো করতাম। বিপিন গোস্বামী আমাদের সিনিয়ার ছিলেন। শঙ্করদা মানে ভাস্কর শঙ্কর ঘোষ স্পোর্টস নিয়ে থাকতেন।
এসবের সঙ্গে সঙ্গে আমার সব সময় মনে পড়ে শিক্ষকদের কথা। যেমন গোপাল ঘোষের কথা বলি। ওঁনার হাবে ভাবে আচরনে মনে হত তিনি যেন ছাত্রদের খেয়ালই করছেন না। সেটা কিন্তু ঠিক নয়। তিনি সব খেয়াল করতেন। একদিন যেমন একজনকে ডেকে বললেন “তোমার দ্বারা কিছু হবেনা বাপু। তুমি তোমার বাবার দোকান সামলাও গিয়ে।” এরকম সব রিমার্ক করতেন। ওঁনার ক্লাসও ছিল মজার। বোর্ড লাগিয়ে ক্লাসে একটা এনক্লোজার তৈরি করেছিলেন। সেখানে ঘরের মতো জায়গায় টেবিলে বইপত্র, দেওয়াল পিকাসোর ছবি, ওঁনার মেয়ের ড্যান্সের ছবি লাগানো থাকতো। সেখানে বসে ঘাড় গুঁজে প্যাস্টেলে কাজ করতেন। বছর বছর এনক্লোজার চেঞ্জ করতেন। ছোট ছোট মদের বোতল আনতেন। লাঞ্চে ড্রিঙ্ক করতেন। আর ড্রিঙ্ক করার আগে শশা কাটতেন। সেই কাটাটাই দেখার মতো। এই দৃশ্য দেখে মেয়েরা ভয়ে পালাত। গোপালবাবুর মুখ থাকত গম্ভীর, প্যান্টের ওপর পরতেন হাফ শার্ট। প্রায়ই হাতটাকে দূরবিনের মতো মুষ্ঠি পাকিয়ে ফুল দেখতে যেতেন জলের ধারের বাগানে। অন্যদিকে রথীনবাবু ছিলেন রসিক। তিনি মেয়েদের সঙ্গেও রসিকতা করতেন। তাছাড়া দেখতে তো রাজপুত্রের মতো ছিলেন। আর গোপালবাবু নিজে প্রচুর মদ খেতেন, কিন্তু রামকিঙ্করের মদ খাওয়ার সমালোচনা করতেন। এটাই মজার। শিক্ষক হিসেবে কিশোরী রায়কে পেয়েছি। দেখতাম একদিক থেকে ড্রইং না করে রং দিয়ে সরাসরি মুখ আঁকছেন আর অন্যদিকে শেষ করছেন।

ফিফথ ইয়ারে পেলাম সত্যেন ঘোষাল কে। ওঁনার ঘরে ওঁনার বিদেশে বসে করা মেম সাহেবের একটা ন্যুড স্টাডি ছিল। আমাদের সাথে দেখা হলেই বলতেন “কী করলে হে দেখি”।
সহপাঠী হয়ে যেমন এসেছিল সুনীল দাস। ওর দেখাদেখি ঘোড়ার স্কেচ করতাম, আস্তাবলে যেতাম। নিউ মার্কেটে গিয়ে চার আনা দিয়ে শিক কাবাব খেতাম। এখন শুধু এসব কথাই মনের মধ্যে ভেসে ভেসে আসে স্বপ্নের মতো। আসলে আর্ট কলেজের দিন গুলি ভোলা যায় না। পুরোটা বলতে গেলে ইতিহাস হয়ে যাবে।
