
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার গুমাই বিলে চলছে ধান কাটা উৎসব
‘পথের কেনারে পাতা দোলাইয়া করে সদা সঙ্কেত/ সবুজে হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে আমার ধানের ক্ষেত/ ছড়ায় ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে/ ঝাঁকে আর ঝাঁকে টিয়ে পাখিগুলো শুয়েছে মাঠের পরে’- কবি জসীমউদ্দীনের এই ‘ধানক্ষেত’ কবিতাই যেন চোখের সামনে এসে ভর করে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার গুমাই বিলের দিকে তাকিয়ে।
হালকা কুয়াশার পর্দা সরে গিয়ে মিষ্টি রোদ এসে পড়তেই দেখা গেল দিগন্তজোড়া প্রান্তরের সোনালি ঢেউ। মৃদু বাতাসে পাকা ধানের শীষের দোলা বিলের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। এর মাঝেই দেখা গেল কাস্তে হাতে ব্যস্ত কৃষকদের। চট্টগ্রামের শস্যভান্ডারখ্যাত রাঙ্গুনিয়ার গুমাই বিলে চলছে ধান কাটা উৎসব। মাঠের পাকা ধান কেটে তুলতে হবে গোলায়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিলের ফসলের ক্ষেতে ধান কাটার ধুম পড়েছে।সকালে গুমাই বিলের চারা বটতল, কদমতলী, লিচুবাগান, ছুপিপাড়া সংলগ্ন বিলের বিভিন্ন অংশে দেখা যায় পুরোদমে চলছে ধান কাটার কাজ।কৃষকেরা ধান কাটায় ব্যস্ত। কেউ কেউ কাঁধে করে ধানের আঁটি নিয়ে বিলের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে পরিপূর্ণ এক দৃশ্য যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা।
সোনালি ধানে ভরা মাঠ- ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখি তাই উড়ে আসছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম শস্যভান্ডার গুমাই বিলের দিকে। প্রায় তিন হাজার হেক্টর আয়তনের এ বিলের চারদিকে মৃদু বাতাসে এখন ভেসে বেড়াচ্ছে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ। পাকা ধানের সুগন্ধের টানে বিলে আগমন শত শত টিয়া পাখির। পাকা ধান খাওয়ার জন্য বিলের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর তাদের কিচিরমিচির শব্দ এবং সারি বেঁধে উড়ে বেড়ানো এ যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে অপরূপ লীলাভূমি। গুমাই বিলের নিদারুণ সুন্দর দৃশ্যে নজর কাড়ছে এলাকাবাসীর। বিকেলের দিকে আসে ঝাঁকবাঁধা পাখি, তবে সন্ধ্যা হতে না হতেই মিলিয়ে যায় ফুড়ূত করে।
কোনো এক ধানের ক্ষেতে এমন উৎসব দেখেই হয়তো কবি জীবনানন্দ দাশ ‘বাতাসে ধানের শব্দ’ কবিতায় লিখেছিলেন- ‘মৃদু ঘাসে; শান্তি পায়; দেখেছি হলুদ পাখি বহুক্ষণ থাকে চুপ ক’রে/ নির্জন আমের ডালে দুলে যায়-দুলে যায়-বাতাসের সাথে বহুক্ষণ/ শুধু কথা, গান নয়-নীরবতা রচিতেছে আমাদের সবার জীবন/ বুঝিয়াছি শুপুরীর সারিগুলো দিনরাত হাওয়ায় যে উঠিতেছে নড়ে’।
এলাকার লোকজন জানান, ‘পাখির ঝাঁক অনেক সময়ই ধানক্ষেত নষ্ট কওে ফেলে। তার পরও এদের আগমন ধান কাটার উৎসবে যুক্ত করেছে নতুন আনন্দ। কারণ টিয়া পাখির সারি দেখতে অনেকেই এখানে ছুটে আসছেন দূরদূরান্ত থেকে।তারাও বুঝতে পারছে, নতুন ধানের ব্যাপক ফলনের খবর পৌঁছে গেছে দূরদূরান্তের আকাশেও। পাখি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও তারা কেউই এগুলোকে মারেন না। এসব পাখিকে কেউ যাতে হত্যা না করেন, সেজন্য প্রচারও চালাচ্ছে। এ সময় বিভিন্ন ধরনের পাখির আনাগোনাও বেশি থাকে। কিছু পাখি ধানক্ষেত নষ্ট করলেও কৃষকরা এদের হত্যার জন্য কোনো ফাঁদ পাতেন না। এটা ভালো লক্ষণ।’
ছবি- কমল দাশ (লেখক)
