এ বছর থেকে কি বন্ধ হয়ে যাবে পৌষমেলা?

মেলা পরিচালনার দায়িত্ব নিতে নারাজ বিশ্বভারতী

চলতি বছর থেকে আদৌ পৌষমেলা হবে কিনা, তাই নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে শান্তিনিকেতনে। রবি ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শতাব্দীপ্রাচীন পৌষমেলার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। তবে ঐতিহ্য মেনে পৌষ উৎসবের আয়োজন করা হবে। মঙ্গলবার রাতে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে একথা জানিয়ে দিল বিশ্বভারতী। 

মেলা পরিচালনা নিয়ে বারবার পরিবেশ আদালতের মামলায় জর্জরিত হয়ে পড়ার জেরেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানা গিয়েছে। ২০১৫ সালে পৌষমেলাতে ব্যাপক দূষণের অভিযোগ এনে জাতীয় পরিবেশ আদালতে মামলা করেন পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। এবছর ফের পরিবেশ আদালতে মামলা করেছেন তিনি। সেই মামলায় যুক্ত করা হয়েছে বিশ্বভারতীর উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রারকেও। মামলা চালাতে গেলে বিশ্বভারতীকে বিপুল আর্থিক বোঝা মাথায় নিতে হচ্ছে।  

মঙ্গলবার বিশ্বভারতীর লিপিকা অডিটোরিয়ামে মেলা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সব অধ্যাপক, কর্মকর্তা ও শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। সেখানে উঠে আসে, মামলার ব্যয়ভার বহন করার মতো আর্থিক সঙ্গতি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। পৌষমেলার আর্থিক লভ্যাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে যায় না, শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের তহবিলেই জমা হয়। পরিবেশ আদালত এবং দেশের অন্য সব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পালনীয় শর্ত মেনে এই বিশাল মেলা আয়োজন করার পরিকাঠামো তাদের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেই। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ প্রেস রিলিজেও একথা উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে, মেলার আয়-ব্যয়ের যাবতীয় দায়ভার শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের। ট্রাস্ট যদি মেলার আয়োজন করতে না চায়, তাহলে মেলা বন্ধ হয়ে যাবে। 

এদিকে শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে বিশ্বভারতীর সাহায্য ছাড়া কোনোভাবেই মেলা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। যার ফলে এবছর থেকে পৌষমেলার ভবিষ্যৎ বিরাট প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে গেল। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, এবছরের ৭-৯ পৌষ উপাসনা, পরলোকগত আশ্রমিকদের স্মরণ, মহর্ষি স্মারক বক্তৃতা, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন, সমাবর্তন এবং খ্রিষ্টোত্সউব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পৌষ উৎসব যথাযথভাবে পালিত হবে। 

পৌষমেলার সঙ্গে বাঙালির আবেগ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রত্যেক বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে যান, আনন্দ করেন, কিন্তু বাংলার ঐতিহ্য এই মেলাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতজন সচেতন থাকেন? দায়সারাভাবে যেখানে সেখানে প্লাস্টিক, খাবারের টুকরো, অন্যান্য বর্জ্য পদার্থ ফেলে নোংরা করেন পৌষমেলার অংশগ্রহণকারীরাই। সারা বিশ্বে পরিবেশকে বাঁচিয়েই অনেক বড়ো বড়ো মেলা হয়। তাহলে বাংলা থেকে কেন দূষণের অভিযোগে এই ধরনের ঐতিহ্যময় সব মেলা একে একে হারিয়ে যাবে? প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব কবে আম-বাঙালি উপলব্ধি করবে? মেলার ক্রেতা, বিক্রেতা, পর্যটক – সবাই যতদিন না সক্রিয়ভাবে পরিবেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেবেন, ততদিন ধীরে ধীরে প্রকৃতির সঙ্গে বিলুপ্ত হতে থাকবে বাংলার সংস্কৃতিও। 

শান্তিনিকেতনকে যাঁরা ভালবাসেন, তাঁদের আন্তরিক কামনা এই যে পরিবেশ দূষণকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে পৌষমেলা আবার স্বমহিমায় ফিরে আসুক। প্রকৃতিকে বাঁচিয়েই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলি আবার মেলা শুরু করার কোনো না কোনো বিকল্প উপায় বের করবেন, এরকমই সবার আশা। 

Developed by DXDasia