লালমাটির ভুবনডাঙায় জাপানি ক্যাফে

বিশ্বভারতীর মধ্যেই সঙ্গীত ভবনের ঠিক উল্টোদিকে এই আশ্চর্য ক্যাফে

খড়ে ছাওয়া এক আশ্চর্য ঠেক। সঙ্গীতভবনের ঠিক পাশেই। নামটা শুনেও কৌতূহল উজিয়ে উঠবেই। ঠিকানা জানতে চাইলে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য লোকের অভাব হবে না ভুবনডাঙা থুড়ি শান্তিনিকতনে। ঢুকলেই আপনার শহুরে অভ্যেস খানিক ধাক্কা খাবে। এমন ক্যাফেও হয়? পায়ের নিচে কুচি-কুচি পাথর-বিছানো রাস্তা। ওটাই মেঝে। মাটির দেওয়াল-জুড়ে আঁকা। কাঠের বেঞ্চিতে বসে দোতারা হাতে গান গাইছে কেউ। এক ছাউনি থেকে আরেক ছাউনির মাঝখানে আকাশের শামিয়ানা। একটা দোলনা। আর তাতে দিব্বি গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছে একটা নাদুসনুদুস বিড়াল। সেই আবার কখনো উঠে আসছে ক্যাশ-কাউন্টারের টেবিলে। প্রচলিত শহুরে ক্যাফের দুনিয়া থেকে আপনি ততক্ষণে অনেকটাই সরে এসেছেন। অবাক হচ্ছেন এবং একইসঙ্গে সেই বিস্ময় ভালোও লাগছে বেশ। এমনই আমেজ ঘিরে ধরবে আপনাকে ‘কাসাহারা দ্য ক্যাফে’ -তে গেলে। 

‘কাসাহারা’- নামটা খানিক চেনা ঠেকছে কি? বোলপুর, বিশেষত শান্তিনিকেতন অঞ্চলের মানুষজন কিন্তু ‘কাসাহারা- দ্য ক্যাফে’ কে একডাকেই চেনেন । বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের মধ্যেই সঙ্গীত ভবনের ঠিক উল্টোদিকের এই রেস্তোরাঁ এক অর্থে এই অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্রই । সকাল নটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ভিড় জমে থাকে, দুতিন শিফটে কাজ হলেও কর্মীরা মাঝে মধ্যে হিমসিম খেয়ে যান এখানকার ‘ক্রাউড’ সামাল দিতে দিতে। তিলধারণের জায়গা মেলে না দোল উৎসবের সময় হপ্তাখানেক। পৌষমেলার কথা তো আলাদাভাবে বলা বাহুল্য মাত্র!  ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কাসাহারার চিকেন ভর্তার খ্যাতি খুব অল্প সময়ে মধ্যেই প্রায় প্রবাদে পরিণত এখন। কর্ণধার দেবজিত রায় সস্ত্রীক দেখাশোনা করেন প্রত্যেকদিনই, তাঁরাই এ রেস্তোরাঁর প্রতিষ্ঠাতাও বটে। ইকনমিক্সের পি.এইচ.ডি. দেবজিত আজন্ম শান্তিনিকেতনের আবহেই মানুষ, বাইরের লোভনীয় মোটা অঙ্কের চাকরির বদলে গড়ে তুলেছেন ‘কাসাহারা-দ্য ক্যাফে’, পূর্বপুরুষের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। জানলে আশ্চর্য হতে হয়, সেই মানুষটি ছিলেন জাপানের অধিবাসী।

 

‘কাসাহারা’– কোনও বিশেষ অর্থবহ জটিল ব্যাকরণভিত্তিক শব্দ নয়। কিমতারো কাসাহারা-জন্মসূত্রে জাপানি, একজন গুণী শিল্পী। ১৮৬৮-তে জন্ম, কাঠের কাজ ও জাপানের বিশেষ রীতির বাগান তৈরিতে দক্ষ এই মানুষটি সপরিবারে ভারতবর্ষে আসেন ১৯২২-এ। বুদ্ধগয়া মন্দিরের সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজে সরকারি প্রয়োজনে এদেশে আসা। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে কাঠের কাজের শিক্ষক হয়ে যোগ দিয়েছেন কাসাহারা। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ প্রিয়পাত্র এই শিল্পী মানুষটি এরপর থেকে যান এখানেই। দুই মেয়ে ইতোকো এবং মিচোকো-ও শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা হয়েই রয়েছেন আজীবন। শ্রীনিকেতন-এর হর্টিকালচারের কাজকর্ম ,যার প্রাথমিক শুরু হয়েছিল কাসাহারার হাতেই– তার সূত্রেই পরবর্তী সময়ে ধীরানন্দ রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয় ইতোকো কাসাহারার। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ক’টি বিয়ের পৌরহিত্য করেছিলেন, কাসাহারার এই মেয়ের বিয়ে ছিল তার মধ্যে একটি। রেস্তোরাঁর প্রতিষ্ঠাতা দেবজিত রায় তাই কাসাহারার চতুর্থ প্রজন্ম।

বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসের মধ্যেকার এই রেস্তোরাঁর বয়স খুবই অল্প। অথচ এইটুকু সময়ের ভেতরেই এখানকার ছাত্রছাত্রী ছাড়াও বাইরে থেকে আসা ভোজনবিলাসীদের রসনার তৃপ্তিও ঘটছে এখানে। এর পরিবেশও কিন্তু অন্যান্য হালফ্যাশনের রেস্টুরেন্টের মতন নয়, রীতিমতো জাপানি কায়দায় কাঠের বেঞ্চিতে বসে খাওয়াদাওয়া করার ব্যবস্থা হয়ে আছে। শুধুই যে উৎকৃষ্ট গুণমানের খাবারের জন্যই কাসাহারা এই প্রজন্মের মানুষের প্রিয় আড্ডাখানা তা কিন্তু নয়! গিটার, বাঁশি, দোতারা, মাউথ অর্গ্যান ইত্যাদি  নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের গানবাজনার আসর এখানে বসে যায় প্রায়ই; খাবার ও আড্ডায় মজে থাকতে দেখা যায় দেশবিদেশের নানান ভাষার মানুষদেরও । শান্তিনিকেতনের দৈনন্দিন ছোট্টখাট্টো অশান্তি মিলিয়ে যায় এমন পরিবেশে- সুখাদ্যের সুঘ্রাণে! আমরা যে আদতে লোলুপ, এমন রত্নখনির অন্বেষণেই আমরা পরিতৃপ্ত তাই।

Developed by DXDasia