
উত্তরবঙ্গে রাজ বসুর সময়োপযোগী ভাবনা
করোনা দুর্যোগ এবং লকডাউনের জেরে বিধ্বস্ত উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্প। দার্জিলিং ও সিকিম-ভুটান পাহাড় ছাড়াও সমতল এলাকাতেও করোনা দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর কোনও পর্যটকের দেখা নেই। অথচ এখানকার অর্থনৈতিক কাঠামোর অন্যতম ভিতই হল পর্যটন।
পূর্ব হিমালয়ে অনেকদিন ধরেই চলছে গ্রামীণ পর্যটন
পাহাড়ের সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ, জঙ্গল, চা বাগান এবং সেখানকার মানুষদের টানে উত্তরবঙ্গে কার্যত সারা বছর ধরে দেশবিদেশের পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। এখন সব করোনার গ্রাসে। অথচ হিসাব বলছে, সরাসরি এই পর্যটনের সঙ্গে দু-লক্ষ লোকের রুটিরুজি নির্ভর করে। আর পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে ছয় লক্ষ। ডুয়ার্সে একেকটি পর্যটককে মরশুমে ৬২ হাজার রুম ভাড়া দেওয়া হয়। হোম স্টে ভাড়া দেওয়া হয় ১২ হাজার। গাড়ি চালক, ট্যুর অপারেটর, গাইড, হোটেল কর্মী, রেস্তরাঁ-সহ আরও অন্য অনেকের সারা বছর জীবিকা চলে শুধুমাত্র একেকটি পর্যটক মরশুম পার করে। কিন্তু এবার করোনা গ্রীষ্মকালীন পর্যটক মরশুমকে মাটিতে বসিয়ে দিয়েছে। সামনে আসছে পুজোর মরশুম। কীভাবে এই দুর্যোগ কাটিয়ে পর্যটনকে আবার এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার জন্য ভাবনা এবং প্রয়াস শুরু করেছেন ট্যুর অপারেটররা।
এই বিশেষ ভ্রমণকে তাঁরা নাম দিচ্ছেন ‘হিলিং ভিলেজ’
উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট ভ্রমণ গবেষক এবং ভ্রমণ সংগঠনের কর্মকর্তা রাজ বসু জানাচ্ছেন, করোনা নিয়েই এখন বাঁচতে হবে। তাই করোনা আবহে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কীভাবে অন্যরকম ট্যুরিজম শুরু করা যায় তার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পূর্ব হিমালয়ে অনেকদিন ধরে চলছে গ্রামীন পর্যটন। তার সঙ্গে এবার তাঁরা শুরু করতে চলেছেন হিলিং ভিলেজ। পাহাড়ি গ্রামে অনেক পুরোনো ঐতিহ্য সংস্কৃতি রয়েছে, মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে কীভাবে কৃষিকাজের মাধ্যমে সুস্থ থাকা যায়, রাখালরা কীভাবে গরু চড়ায় সেসব দেখে বহু কিছু শেখা যায়। শহুরে জীবন ছেড়ে নিঃশব্দে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে গিয়ে অনেক কিছু দেখা এবং শেখার এই বিশেষ ভ্রমণকে তাঁরা নাম দিচ্ছেন 'হিলিং ভিলেজ'। কীভাবে গ্রামীন এই দূষণবিহীন জীবনে নিজেকে একাত্ম করে শরীর মন চাঙ্গা রাখা যায় তারই প্যাকেজ নিচ্ছেন রাজ বসুরা।
পর্যটনকে এখন এই করোনা আবহে মনে করতে হবে একটি ট্রিটমেন্ট-ট্যুরিজম
কোনও বয়স্ক মানুষ, শহরে থেকে হয়তো দমবন্ধ হয়ে আসছে, তিনি কিছুদিনের জন্য হিলিং ভিলেজ ট্যুরে যেতে পারেন। তিন চার মাসের জন্য যদি মনে করেন এই ট্যুরে বের হবেন, যেতে পারেন। যদি মনে হয় এই করোনা আবহে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে গিয়ে নিঃশব্দে নীরবে একপ্রকার আইসোলেশনে যাবেন প্রকৃতির মাঝে, যেতে পারেন। গ্রামে পেয়ে যেতে পারেন ক্ষেত থেকে নিয়ে আসা তাজা শাক, সবজি। রাজবাবু বলছিলেন, কোনও অবসরপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি যদি মনে করেন হিলিং ভিলেজের প্যাকেজ ট্যুরে বেরিয়ে চার-পাঁচ বছর গ্রামেই কাটাবেন তারও বন্দোবস্ত হচ্ছে।
বন্ধ অবস্থাকে করোনা সতর্কতা মেনে কীভাবে সচল করা যায় তার জন্য রাজ বসু অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন
পর্যটনের ধরন আপাতত এভাবেই বদলে ফলা হচ্ছে করোনা আবহে। আগের মতো একসঙ্গে দলবেঁধে পাঁচ দিনে ছ’টি স্থান ঘুরে চলে গেলেন, এখন আর তা হবে না। পর্যটন বা ঘোরাঘুরিকে এখন এই করোনা আবহে মনে করতে হবে একটি ট্রিটমেন্ট-ট্যুরিজম। মুখে অবশ্যই মাস্ক বাঁধতে হবে। মেনে চলতে হবে সামাজিক দূরত্ববিধি। তার পাশাপাশি সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাত স্যানিটাইজ করা এসব তো আছেই। এককথায় সরকারের কোভিড প্রোটোকলে যা যা নিয়ম রয়েছে তার সব দিক অনুসরণ করেই নতুন এই হিলিং ভিলেজ ট্যুরিজম পুজোর আগেই অর্থাৎ অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যাতে শুরু করা যায় তার প্রয়াস শুরু হয়েছে বলে রাজবাবু জানিয়েছেন।
হিলিং ভিলেজ ট্যুরিজম পুজোর আগেই শুরু হয়ে যাবে
তবে যারাই এই প্যাকেজ ট্যুরে বের হবেন তাদেরকে আগে থেকে শরীর স্বাস্থ্য বিষয়ক সব তথ্য দিতে হবে। রাজবাবু বলেন, করোনা সাময়িকভাবে একটি ধাক্কা দিয়েছে বটে। চূড়ান্ত পর্যটন মরশুমে দার্জিলিং পাহাড়, সিকিম, ভুটান এলাকায় যেখানে পর্যটনে পাঁচ থেকে নয় কোটি টাকার লেনদেন হত, তা এখন বন্ধ রয়েছে। কিন্তু এই বন্ধ অবস্থাকে আপাতত করোনা সতর্কতা মেনে কীভাবে সচল করা যায় তার জন্য তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। বিভিন্ন এলাকাও এর জন্য স্যানিটাইজ করে নেওয়া হচ্ছে। কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের কিছু অতি উৎসাহী ভ্রমণ প্রিয় মানুষ হিলিং ভিলেজ ট্যুরিজম নিয়ে খোঁজখবর নেওয়াও শুরু করেছেন। করোনা আবহে নিজেকে সুস্থ রাখা বিশেষ করে গ্রামে গিয়ে রোগ প্রতিরোধক শক্তি বৃদ্ধির জন্য টাটকা জৈব কৃষির শাকসবজি গ্রহণ, টাটকা অক্সিজেন এবং মনের স্ট্রেস কাটানোর বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে ভালো থাকতে পারেন।
