
খাঁটি বনাম ভেজাল আচার চিনব কীভাবে?
আচার খেতে ভালোবাসেন না, এমন বাঙালি বোধহয় খুঁজলে পাওয়া যাবে না। বাংলার ঘরে ঘরে, বারোমাস চলে আচারের পার্বণ। আচার পক্ষপাতহীন। যে কোনও রকমের খাবারই হোক না কেন, ভাঁটা পড়ে না আচারের স্বাদে। বরং আচারের সঙ্গতে খাবারের স্বাদ যায় আরও বেড়ে। টক, ঝাল, মিষ্টি, স্বাদের বাহারে রসনার তৃপ্তি পরিপূর্ণ হয়। ভাত-ডালের সঙ্গে, পরোটার সঙ্গে আচার জিভে জল আনে। আবার আচারের তেল দিয়ে মুড়িমাখার জুড়ি মেলা ভার। ঠাকুমা-দিদিমার দৌলতে এক সময় মোটামুটি সব বাড়িতেই খোঁজ করলে লঙ্কার আচার, আমের আচার, তেঁতুলের আচার, লেবুর আচার, কুলের আচার -একটা না একটা মিলতই। এখন ঘরে বানানো আচার-এর পরম্পরা কমে এলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। আর আচারের জনপ্রিয়তায় ভাঁটা তো পড়েনি একেবারেই।
আরও পড়ুন: চেখে দেখুন হাঁসের সসেজ ও আচার
আচার প্রসিদ্ধ ভিনরাজ্যেও। বিহারের লিট্টি আর আচার একবার খেলে, তার স্বাদ গোটা জীবনে ভোলা মুশকিল। রাজস্থানেও আচারের চল বিপুল। দক্ষিণ ভারতেও জনপ্রিয় আচার। তবে এটা জানলে খানিক অবাকই হতে হয় যে, আচারের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটে ভিনরাজ্যের মাধ্যমে। সুলতানি আমলে মানসিংহের হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ ঘটে আচারের। ঐতিহাসিকদের মতে, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন খাদ্য হল আচার। ২৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার সময় থেকে আচারের প্রচলন শুরু। আচারের সঙ্গে জুড়ে আছে ক্লিওপেট্রা, কলম্বাসের নাম। তবে সেসব অন্য কাহিনী।
শুধু স্বাদের বাহারই নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ ভেজালহীন আচার। লঙ্কাতে রয়েছে ক্যাপসাইসিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বিটা ক্যারোটিন। ফলে হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকে। এতে আছে ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি। আর আছে আয়রন। লঙ্কার আচার তৈরিতে লঙ্কা ছাড়াও ব্যবহৃত হয় লেবু, জিরা, মৌরি, আজোয়ান আর অল্প পরিমাণ খাঁটি গুড়। যা আচারে আনে টক-ঝাল-মিষ্টি জিভে জল আনা স্বাদ। তেঁতুলে প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ রয়েছে। তেঁতুলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস। তেঁতুল ডায়াবেটিস, শরীরের ওজন, স্নায়ুচাপ কমানোর অব্যর্থ উপাদান। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ আমগুড় মুখে দিলেই মনে পড়ে যায় ছো্টোবেলার স্মৃতি। কাঁচা আমে আছে ভিটামিন সি, যা ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যবৃদ্ধি ঘটায়। অ্যানিমিয়া কমায়, বিভিন্ন উৎসেচক ও হরমোনকে নিয়ন্ত্রনে রাখে। জলপাইয়ের আচার নিয়মিত খেলে হজমের সমস্যা কমে। কমে কোলন, পাকস্থলী, অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি। আদার আচারে আছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি উপাদান। রয়েছে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, বিভিন্ন ভিটামিন। এছাড়া আছে জলপাইয়ের আচার, কদবেলের আচার ইত্যাদি। সবার আছে আলাদা আলাদা পুষ্টিগুণ। আচারের পুষ্টিগুণ বলে শেষ করা যাবে না।
তবে এখন রেডিমেড আচারের রমরমা। এইসব আচারে মেশানো হয় ক্ষতিকারক রাসায়নিক রং। দীর্ঘসময় ধরে সংরক্ষণের জন্য মেশানো হয় ক্ষতিকারক প্রিজারভেটিভ, যা আগে সরিষার তেল দিয়ে করা হতো। মিষ্টি স্বাদের জন্য মেশানো হয় কৃত্রিম সুইটনার, যা কার্সিনোজেনিক বলে নিজেদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO। তাই কী খাব-কেন খাব, কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল, তা যাচাই করে নিতে হবে ক্রেতাদের।
তাই আচার কেনার সময়ে দেখে নেওয়া উচিৎ প্যাকেটের গায়ে ‘কেমিক্যাল অ্যান্ড প্রিজারভেটিভ ফ্রি (Chemical and Preservative Free)’ লেখা আছে কি না। এই কি-ওয়ার্ডটাই গুগলে সার্চ করে দেখা করে যেতে পারে কোন কোন দোকানের নাম আসছে। দ্য বেঙ্গল স্টোর (The Bengal Store) নামে একটি ছোটো বিপণী বহুদিন ধরেই ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে খাঁটি খাবারের জিনিস। তার মধ্যে আছে আচারও। সংস্থার এক কর্মী জানালেন, “আমরা দোকানে খাঁটি আচারই রাখি। আনুষঙ্গিক ১০০% খাঁটি মশলা এবং সরিষার তেল আমরাই আচার প্রস্তুতকারককে সরবরাহ করি। সেই মশলাগুলি সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাছ থেকে, যাঁরা চাষ করার সময় কোনও রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করেন না। প্রতিটি জিনিসের বিশুদ্ধতা খড়গপুর আইআইটির এএফটি ল্যাব থেকে যাচাই করে নিয়ে তবেই বিক্রি করা হয়। তাই এই দোকানের আচারে পাওয়া যায় ঘরে তৈরি আচারের স্বাদ।” তাই আচার সাধারণত ঘরেই বানিয়ে নেওয়া উচিৎ, বা কেনা উচিৎ এমন দোকান থেকেই, যেখানে পাওয়া যায় বিশুদ্ধতার গ্যারান্টি।





