
এখানে নিয়মিত আড্ডার পাশাপাশি চলে বই প্রকাশ, সিনেমা-থিয়েটার প্রদর্শন
দমদম (Dumdum) থেকে ট্রেনটা বিকেল রং মেখে ছুটে চলেছে মধ্যমগ্রামের (Madhyamgram) দিকে। স্টেশন সংলগ্ন একটি শান্ত পরিবেশের দিকে হেঁটে চলেছি বাংলা তথা বিশ্ব থিয়েটার ও থিয়েটার সংলগ্ন অন্যান্য বিষয়ের এক মুক্তাঞ্চলে। জায়গা সম্পর্কে অভীক ভট্টাচার্য (Abhik Bhattacharya) বলছেন, “এমন একটা স্পেস ভেবে ২০২২ সালের ৮ জানুয়ারি কলকাতা (Kolkata) মহানগরেরে কিছুটা বাইরে মফসসল শহর মধ্যমগ্রামে আমরা গড়ে তুলি ‘ভাবনা জংশন’ (Vabna Junction)। আপাতত মাত্র ৬৩০ বর্গফুট স্পেসে গড়ে তুলেছি বই গ্যালারি (পড়ার ও সংগ্রহ করার সুবিধা যুক্ত), একটি আড্ডা স্পেস যেখানে নিয়মিত আড্ডা-সহ শিল্প বিষয়ক আলোচনা, কথোপকথন, বই প্রকাশ, চলচ্চিত্র প্রদর্শন ইত্যাদি হয়ে থাকে।”

ভাবনা জংশন স্পেস
অভীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে আপনাদের আলাপ করিয়ে দিই। অভীকদা, এই সময়ে বাংলার অন্যতম প্রধান নাট্যপত্রিকা ‘ভাবনা থিয়েটার’ (Vabna Theatre)-এর সম্পাদক। সম্পাদনার আগে তিনি নিয়মিত অভিনয় ও নাট্যদল পরিচালনা করেছেন। তারপর আধুনিক ও সাম্প্রতিক বাংলা থিয়েটারের দলিল তৈরি করার জন্য এমন একটি পত্রিকার সূচনা করেন। আমরা যারা কলকাতা কেন্দ্রিক থিয়েটারকেই থিয়েটার চর্চা বলে মনে করি, তাদের এই ভ্রান্ত ভাবনা বিরুদ্ধে একটা দর্পণ তৈরি করেছে এই পত্রিকা। বাংলার প্রায় প্রতিটি সাংস্কৃতিক পরিসরে থিয়েটারের কী কাজ হচ্ছে, ভাবনা থিয়েটার তার একটা মানচিত্র তৈরি করার চেষ্টা করে চলেছে। শুধু থিয়েটার কেন, থিয়েটারের মতো এই যৌগিক শিল্পের জন্য অন্যান্য শিল্প মাধ্যমগুলোর খোঁজ আমরা পেয়ে থাকি ভাবনা থিয়েটার পত্রিকায়।

বাংলাদেশের থিয়েটার নির্দেশক অনন্ত হীরার সঙ্গে অভীক ভট্টাচার্য
অভীক ভট্টাচার্যের মনে হল, এই যে বিরাট বিপুল বঙ্গ নাট্য সংস্কৃতি, এর তো একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। একে তো নথি, তথ্য, ছবি, আলোচনার মাধ্যমে ডকুমেন্ট কিংবা ডকুমেন্টারি করে সংগ্রহে রাখতে হবে। যাতে আমরা যারা বাংলার বিভিন্ন প্রদেশে পৌঁছাতে পারছি না, তারা যেন অন্তত জানতে পারি এই মুহূর্তে থিয়েটারের হাল হকিকত কী। এই ভাবনা থেকেই ‘ভাবনা জংশন’। গোটা বাংলার থিয়েটারপ্রেমী, কর্মী, গবেষকদের মুক্তচিন্তাঞ্চল এই গ্যালারি। অভীকদা তাঁর জংশন নিয়ে ভাবেন। বলেন,“প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে এক চিলতে সময় বের করা আজ রীতিমতো কঠিন কাজ একদা আড্ডাপ্রিয় বঙ্গজদের। অথচ, আড্ডার ছলে কত কী যে আবিষ্কার হয়েছে তা ইতিহাসে প্রমাণিত। আজকের সময়ে তেমনই এক বিশুদ্ধ শিল্প আড্ডার মুক্তাঞ্চল হিসেবে এমন এক ক্ষেত্র খুঁজতে চেয়েছি বারবার।”
এই যে বিরাট বিপুল বঙ্গ নাট্য সংস্কৃতি, এর একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। একে ডকুমেন্ট করে রাখতে হবে। যাতে আমরা যারা বাংলার বিভিন্ন প্রদেশে পৌঁছাতে পারছি না, তারা যেন অন্তত জানতে পারি এই মুহূর্তে থিয়েটারের হাল হকিকত কী। এই ভাবনা থেকেই ‘ভাবনা জংশন’।

ইতালির নাট্যকর্মী অনিল আলেস্যন্দ্রো বিশ্বাস

তেপান্তর নাট্যগ্রামের কল্লোল ভট্টাচার্য
গ্যালারির ভিতরে প্রবেশ করা যাক। ঢুকেই দেখতে পাচ্ছি ভাবনা থিয়েটার পত্রিকার প্রথম দিকের সংখ্যার প্রচ্ছদ, লেখার এনলার্জ করা ছবি। এই ছবিগুলো একটা সাংস্কৃতিক সময়কে ধরে রেখেছে দৃপ্তভাবে। পত্রিকাটি যে সময় থেকে পথচলা শুরু করে, অর্থাৎ ২০১০, তখন থেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া বইতে থাকে। এবং সংস্কৃতিরও যে বিপুল পরিবর্তন হবে, তা আর বলার অবকাশ রাখে না। এর পরেই আসে গ্যালারির মূল স্পেস। নজর কেড়ে নেয় ঘরের অলংকরণ, করেছেন নাট্যকর্মী, শিল্পী অদ্রীশ কুমার রায় ও অনুপম মাজি। ওঁরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নাটকেও সেট ডিজাইন করে থাকেন। এই স্পেসটির বাঁদিকের অংশটি বাঁশের কারুকার্য করে শেল্ফ তৈরি করা হয়েছে। শিল্পচর্চার বিভিন্ন বইপত্র, তা শুধু থিয়েটারেরই নয়, একাধারে পাঠ ও বিপননের জন্য রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বইপত্র পড়ার সুযোগ রয়েছে গ্যালারিতে বসে। গবেষকদের জন্য বহু দুঃষ্প্রাপ্য ইতিহাস-গ্রন্থ বিশেষ করে নাটক কিংবা আর্টের বই ভাবনা জংশনে পাওয়া যায়। অভীক ভট্টাচার্য চেষ্টা করে চলেছেন রাজ্য, দেশ, বিদেশের বহু বইপত্র সংগ্রহ করে রাখতে। এমন একটি গ্যালারি আদতে একটি সংস্কৃতি চর্চার পথকে আরও বেশি প্রসারিত করে।
তার পাশেই আছে আলোচনার জন্য ছোট্ট মঞ্চ, যেখানে দর্শক আসনে অন্তত কুড়ি জন বসতে পারবেন। এখানেই বিভিন্ন আলোচনা, বইপত্র প্রকাশ কিংবা সেমিনার হয়ে থাকে। তবে গ্যালারিতে কোনও বিষয়ই খুব ভারিক্কি রূপে হয় না। খুব আন্তরিকভাবে সংলাপ বিনিময় চলে এখানে। ভারত, বাংলাদেশ কিংবা ইতালির শিল্পী-নাট্যকর্মীরা এখানে এসে যেন নিজের ঘরের মতো করে আড্ডা দিয়ে গেছেন সবার সঙ্গে। এতে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়েছে অনেক বেশি বিস্তৃত। শিল্পী ও ভাস্কর সৌমেন কর, নাট্যতাত্ত্বিক আশিস গোস্বামী, ইতালির নাট্যকর্মী অনিল আলেস্যন্দ্রো বিশ্বাস, পুতুলনাট্যকার সুদীপ গুপ্ত, বাংলাদেশের অনন্ত হীরা, অভিজিৎ সেনগুপ্ত, তেপান্তর নাট্যগ্রামের কল্লোল ভট্টাচার্য, নেপাল থেকে এসেছেন নাট্যনির্দেশক আশেষ মাল্লা, ওড়িশা থেকে সুবোধ পট্টনায়ক, অল্টারনেটিভ লিভিং থিয়েটারের (Alternative Living Theatre) নির্দেশক প্রবীর গুহ, নতুন ভাবে মহাভারতের দীর্ঘ আখ্যান রচয়িতার লেখক শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ, নাট্যকার ও চিন্তাবিদ কুন্তল মুখোপাধ্যায়, তমাল সেন, ব্রতীন রায় প্রমুখেরা এসে আলোচনা, চিন্তা, মতামত বিনিময় করে গেছেন বহু সাধারণ নাট্যকর্মী, শিল্পী ও শিল্প প্রেমীদের সঙ্গে। এর পাশে আরও একটি কক্ষ ক্রমশ গড়ে উঠছে, যেখানে তৈরি হবে একটি ফ্লেক্সিবল চিত্র প্রদর্শনীর গ্যালারি। আর নানা ধরনের আলাপ, আলোচনা রেকর্ড করার একটি কক্ষ। যা আগামীতে গড়ে উঠবে। চারুশিল্প ও কারুশিল্পের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ হয়েছে এই গ্যালারিতে। অভীক ভট্টাচার্যের আরও ভাবনা আছে এই গ্যালারি নিয়ে। তিনি বলেন, “এই স্পেসে আগামীতে ছোটোদের জন্য হাতে কলমে আয়োজন করা হবে নানা ধরনের শিল্প কর্মশালা একটু অন্য মেজাজে। আর থাকবে আমাদের প্রাচীন হস্তশিল্প ও লুপ্তপ্রায় বই-পত্রের বিপুল সম্ভার।”
ভারত, বাংলাদেশ কিংবা ইতালির শিল্পী-নাট্যকর্মীরা এখানে এসে যেন নিজের ঘরের মতো করে আড্ডা দিয়ে গেছেন সবার সঙ্গে। এতে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হয়েছে অনেক বেশি বিস্তৃত।

নেপালের নাট্য-নির্দেশক আশেষ মাল্লা এবং ওড়িশার সুবোধ পট্টনায়ক
এই স্পেসের নির্মাণ সজ্জায় রাখা হয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও কৃষ্টির স্পর্শ। সেভাবেই গড়ে উঠেছে প্রতিটি আসবাব। সবকিছুর পর আড্ডার সঙ্গে উৎকৃষ্ট চা ও কফির স্বাদ উপভোগ করেন এই মুক্তাঞ্চলের আড্ডাবাজরা।
চাইলে আপনিও একদিন ট্রেনে চেপে, কিংবা বাসে করে মধ্যমগ্রামের এই থিয়েটার গ্যালারিতে এসে দেখে যেতে পারেন ভাবনা জংশন। বুঝতে পারবেন বাংলা সংস্কৃতির মুখটা কতটা সুন্দর।
