উত্তমকুমারের ধুতির ডিজাইন করে দিয়েছিলেন অভিনেতা ছবি বিশ্বাস!

বন্ধুদের সঙ্গলাভের জন্য প্রেসিডেন্সি ছেড়ে বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হিয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস

“মনে রাখব? কেন মনে রাখব? ওর বিশেষত্বটা কী?” —  ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ চলচ্চিত্রে ছবি বিশ্বাসের বিখ্যাত সেই সংলাপ। অথচ আশ্চর্য, বাঙালি দর্শককে তাঁর নিজের সম্পর্কে ছবি বিশ্বাস একবারও এ প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি। বাঙালি যতদিন সিনেমা দেখবে ততদিন অভিনয়ের এক বিশেষ প্রতিষ্ঠান হিসাবে  তারা মনে রাখবে ছবি বিশ্বাসকে। পর্দায় তাঁর রয়্যাল প্রেজেন্স এবং স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দক্ষতা এই দুইয়ের মিশেলে বাংলা ছবির অনেকটা জায়গা জুড়ে আছেন এই মানুষটি।

একটা সময় মনে করা হত বাংলা ছায়াছবি ছায়াদেবী ও ছবি বিশ্বাস ছাড়া জৌলুসহীন। চরিত্রাভিনেতা হয়েও যে দর্শকমনে নায়ক-নায়িকার সমান গৌরব অর্জন করা যায় তা প্রমাণ করেছিলেন এঁরা। তবে মূখ্য চরিত্র  হিসেবেও ছবি বিশ্বাসের ছবির সংখ্যা নেহাত কম নয়। শখের বশেই প্রথম অভিনয় করতে আসা তাঁর। পারিবারিক সমর্থনও পেয়েছিলেন নিশ্চিত। আভিজাত্যপূর্ণ এবং বনেদিয়ানায় ভরপুর ছিল সে পরিবার। মোগল সম্রাট আকবর 'বিশ্বাস' উপাধি দিয়েছিলেন চব্বিশ পরগনার ছোটো জাগুলিয়ার 'দে' পরিবারকে। পরে শিক্ষা ও ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এই পরিবারের উত্তর প্রজন্ম কলকাতার বিডন স্ট্রিটে চলে আসে। এই বংশেরই সন্তান শচীন্দ্রনাথ দে বিশ্বাস। বাবা ভূপতিনাথ ও মা কাত্যায়নী। মা শচীন্দ্রকে আদর করে ডাকতেন ছবি বলে, পরবর্তীতে অভিনয়ে আসার শুরুর দিন থেকেই শচীন্দ্রনাথ, 'ছবি' ও 'বিশ্বাস'-কেই তাঁর নাম ও পদবি হিসেবে ব্যবহার করেন। সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল, হিন্দু স্কুল পরবর্তীতে বন্ধুদের সঙ্গলাভের আশায়  প্রেসিডেন্সির পড়া ছেড়ে বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন ছবি। মদনমিত্র লেনে নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের বাড়ির বৈঠকখানায় ছিল 'বারবেলা বৈঠক ক্লাব ', এখানেই তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে শিশিরকুমার ভাদুড়ির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন যুবক ছবি, নিয়মিত না শিখলেও ছবিবাবু নিজের অভিনয় জীবনের গুরু মানতেন শিশির ভাদুড়িকে। ছবি বিশ্বাস সে সময় শিকদার বাগান বান্ধব সমাজের 'নদীয়া বিনোদ'-এ নিমাই চরিত্রে কীর্তনাভিনয় করেছেন মোট ১৭৫ রাত। কাঁকুড়গাছি নাট্যসমাজ ও হাওড়া নাট্যসমাজেও  অভিনয় করেছেন বহুদিন।  'মীরকাশেম', 'পথের দাবী, 'পরিণীতা', 'ধাত্রীপান্না', 'চাঁদ সদাগর', 'কাশীনাথ', 'চন্দ্রনাথ'-এর মতো ৩৯টি নাটককে নিজ অভিনয় দক্ষতায় বিখ্যাত করেছিলেন ছবি বিশ্বাস। এসব চলতে চলতেই ১৯৩৬ সালে হঠাৎ করেই সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ আসে। পরিচালক তিনকড়ি চক্রবর্তী নিরুপমা দেবীর 'অন্নপূর্ণা মন্দির'-এর জন্য লম্বা, সুদর্শন নায়ক খুঁজছিলেন, প্রযোজক প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি পথেই পেয়ে গেলেন ছবিকে। 

সত্যজিৎ রায়ের দেবী চলচ্চিত্রে ছবি বিশ্বাস

প্রথম অভিনীত ছবির পর কাজ পেতে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল ছবি বিশ্বাসকে। তারপর একটা সময় সত্যিই যেন শুরু হল ছবিযুগ। 'হাত বাড়ালেই বন্ধু', 'আম্রপালি', 'রাজা সাজা', 'শুনো বরনারী', 'নীলাচলে মহাপ্রভু', 'সপ্তপদী'-সহ ২৬০-এর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস।  সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় 'জলসাঘর', 'কাঞ্চনজঙ্ঘা', 'দেবী', তপন সিনহার পরিচালনায় 'কাবুলিওয়ালা'য় ছবি বিশ্বাসের অভিনয় ভোলার নয়।  সংলাপের মাঝের পজ্কে কীভাবে চোখের অভিনয়ে ভরিয়ে তোলা যায়, হাঁটাচলা, গলার স্বর এমনকি কস্টিউমেও কীভাবে স্বতন্ত্র ছাপ রাখা যায় তা বাংলা সিনেমাকে উপহার দেন ছবি বিশ্বাস। বলিউডেও প্রস্তাব আসে অভিনয়ের কিন্তু ছবিবাবু মুম্বই যেতে রাজি না হওয়ায় রাজ কাপুর তাঁর সিনেমায় ছবি বিশ্বাসের অংশটুকু শুট করার জন্য তাঁর টিম নিয়ে কলকাতায় এসেছিলেন। ছবির গানে লিপ দেওয়া, 'প্রতিকার', 'যার যেথা ঘর' নামে দুটো ছবির পরিচালনা, কলাকুশলীদের হয়ে কাজ করার জন্য 'অভিনেতৃ সংঘে'র সভাপতি অহীন্দ্র চৌধুরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করা, যে কোনো বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে ছবি বিশ্বাসকে মনে রাখতে বাধ্য বাংলার মানুষ। 

শৈল্পিক জীবন ছিল তাঁর। ভালো ছবি আঁকতেন, বাটিকের ও এমব্রয়ডারির কাজ জানতেন। উত্তমকুমারের ধাক্কাপাড় ধুতির ডিজাইন ছবি বিশ্বাস নিজেই করিয়েছিলেন কারিগর দিয়ে, যা পরে 'উত্তমকুমার ধুতি' নামে পরিচিতি পায়। ভালে টেবিল টেনিস খেলতেন, ক্রিকেটেও আগ্রহ ছিল। রেডিওতে আবৃত্তি করেছেন, গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে'র সঙ্গে ছোটোবেলায় বেশ কিছুদিন তালিমও নিয়েছিলেন জমিরুদ্দীন খান সাহেবের কাছে। আর ছিল বাগান করার শখ। স্ত্রী সমীরা ও ছবিবাবুর যৌথ প্রচেষ্টায় তাঁদের সংসারটি হয়ে উঠেছিল শ্রীযুক্ত। বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে নিজের হাতে ফল, ফুলের বিশাল বাগান করেছিলেন ছবি বিশ্বাস। বাড়িতে কেউ গেলে তাকে নিজের বাগানের ফুল দিয়ে 'ওয়েলকাম' জানাতেন৷

মানুষটির রসবোধ ছিল খুবই, খেয়ালী স্বভাবও ছিল স্মরণীয়। স্টুডিও পাড়ায় অভিনেতা বিকাশ রায়, পাহাড়ী সান্যাল, কমেডিয়ান অভিনেতা নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছবি বিশ্বাসের রসিকতা আজও গল্পের মতো ছড়িয়ে আছে।  

তপন সিনহার কাবুলিওয়ালা চলচ্চিত্রে ছবি বিশ্বাস

নিজের ডেলিকেট স্কিন নষ্ট হওয়ার ভয়ে আঁঠা দিয়ে দাঁড়ি গোঁফ লাগাতে চাইতেন না, তাই কাবুলিয়ালায় নিজের ইচ্ছেমতো ভেসলিন দিয়ে বিশাল দাঁড়ি লাগিয়ে রহমত হয়ে উঠেছিলেন। অসাধারণ অভিনয়ে নিজের খামখেয়ালিপনা ঢাকা পড়ে যেত, ছবি বিশ্বাসকে এই জন্যই তাবড় পরিচালক থেকে ফ্লোরবয় সকলেই মেনে চলতেন। টানা পাঁচ বছর নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের পর হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন 'নর্তকী' সিনেমায় অশীতিপর সন্ন্যাসীর চরিত্র করবেন। সিনেমা রিলিজের পর ঘোষণা করলেন এবার থেকে তিনি নায়ক নন, শুধুই চরিত্রাভিনেতা। উত্তমকুমার পর্যন্ত ওঁর এই সিদ্ধান্তে অবাক হয়ে বলেছিলেন এই দুঃসাহস একমাত্র ছবি বিশ্বাসের মত বড়ো মাপের অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব।প্রায়ই এক শটে সিন ওকে করতেন তিনি, তাই জীবনের শেষ শটটাও যেন একবারেই ওকে হয়ে যায়।

সুস্থ শরীরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে জাগুলিয়ার পৈতৃক বাড়িতে আসার পথেই ১৯৬২ সালের আজকের দিনে ছবি বিশ্বাসের মৃত্যু হয় পথ দুর্ঘটনায়। শিল্পীর দেহ কাটাছেঁড়া করতে চাননি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়, তাই তাঁর অনুরোধেই ছবি বিশ্বাসের মরদেহ ময়নাতদন্তের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিল।

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার আর্কাইভ 
 

Developed by DXDasia