ঐতিহাসিক অশোককুমার দাস : সত্যজিৎ রায়ও যাঁর শরণাপন্ন হয়েছিলেন

শিল্প-ইতিহাসে আজীবন অবদানের জন্য লন্ডন থেকে ডি-লিট পেয়েছেন

হঠাৎ কলকাতা থেকে ট্রাঙ্ককল। কিছুক্ষণ রিসিভার ধরে থাকার পর ওপার থেকে গলা শোনা গেল, ‘আমার নাম সত্যজিৎ রায়’। বললেন, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য তোলার ব্যাপারে তিনি চিন্তিত। ওই দৃশ্যে ১৮৫৭ সালের ইংরেজ সেনাবাহিনীর ব্যবহারের জন্য তাঁর বেশ কিছু ‘মাজল লোডিং’ বন্দুক চাই। তাছাড়া সঙ্গিন, তরোয়াল, উটের পিঠে বসে চালানোর জন্য ‘ক্যামেল গান’, চাকাওয়ালা চালু কামানের গাড়ি, বারুদের বাক্স, পুরোনো দিনের হাওদা বা পালকি, ভালো মেড়া (ভেড়া), পুরোনো গোলন্দাজ যে দেখিয়ে দিতে পারবে ‘ডিসমাউন্টিং অফ দ্য ক্যানন’ ব্যাপারটা কী করে হয় -এসব কি শুটিং-এর জন্য পাওয়া যাবে? আরও জানালেন, লখনউয়ে অধিকাংশ জিনিস পাওয়া গেলেও যদি কিছু বিশেষ ধরনের বন্দুক পাওয়া যায়, তাহলে জয়পুরেই ওই দৃশ্যের শুটিং করতে চান, কারণ এখানে হাতি ও উট পাবার সুবিধা।

যেমনটা আমরা জানি, ছবির জন্য এমন নিপুন গবেষণা রায়বাবুর পক্ষে স্বাভাবিক। কিন্তু, শুধু গবেষণা দিয়ে তো আর শুটিং হয় না, লাগে গবেষণা অনুযায়ী উপাদানের যোগান। সেদিন কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র শুটিং-এর জন্য সত্যজিৎ রায় যাঁর শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তিনি ড. অশোককুমার দাস (Asok Kumar Das)। অশোকবাবু তখন জয়পুর মহারাজা সওয়াই মানসিংহ মিউজিয়ামে কর্মরত। ফোন করার আগে রায়বাবুর খেয়াল ছিল না, ১৯৭১ সালে যুগোস্লোভিয়ার কনসাল জেনারেলের বাড়িতে,  তিনি যখন সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘star of Yugoslavia’-তে ভূষিত হচ্ছিলেন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন অশোকবাবু। সামনাসামনি সেই প্রথম একটু পরিচয়। কিন্তু তারও কয়েকবছর আগে ‘সন্দেশ’ পত্রিকার মাঘ, ১৩৬৯ সংখ্যায় মহেঞ্জোদারো-হরপ্পার আবিষ্কার বিষয়ে আশোকবাবুর লেখা ‘মাটির নিচে ইতিহাস’ প্রকাশিত হয়েছিল। সেই অশোককুমার দাসের রেফারেন্স দিয়ে  রায়বাবুকে নাকি প্রত্নতত্ত্ব-মিউজিয়াম জগতের লোকজন আশ্বাস দিয়েছিলেন, অশোকবাবুই নাকি ওঁকে ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র জন্য প্রকৃত সাহায্য করতে পারবেন। 

অশোককুমার দাস সত্যিই সেবার বিন্দুমাত্র নিরাশ করেননি সত্যজিৎ রায়কে। প্রয়োজনের বেশি কিছু দিয়েছিলেন। ১৪২৩ সালের শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত অশোকবাবুর লেখা ‘সত্যজিৎ রায়ের চিঠি’-ই তার প্রমাণ। যাঁর খবর বিশ্বের তাবড় তাবড় ইতিহাসবিদ-প্রত্নতত্ত্ববিদ-গবেষকরা রাখেন, যাঁকে ছাড়া নিরুপায় বোধ করেন বাঙালির আইডল সত্যজিৎ রায়, সেই অশোককুমার দাস-কে ক’জন বাঙালি চেনেন? কতজন জানেন, শিল্প-ইতিহাসে আজীবন অবদানের জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সংবর্ধিত করেছে?৮৬ বছর আগে মেদিনীপুর জেলার গড়বেতায় জন্ম। কিংবদন্তি ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের পরামর্শদাতা ছিলেন। ভারতীয় মিউজিয়ামের মিনিয়েচার চিত্রকর্মের সমৃদ্ধ সংগ্রহ তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং ১৯৬৪ সালে, মিনিয়েচার চিত্রকর্মের উপর উচ্চশিক্ষার জন্য, স্কলারশিপ পেয়ে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ’-এ ভর্তি হন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই এবার তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অফ লেটার্স (ডক্টর অফ লিটারেচার বা ডি.লিটও বলা হয়) দিলো।

লন্ডনে ডি-লিট পাওয়ার পর স্ত্রী-মেয়ে (বাঁদিকে), ছেলে-বৌমা ও নাতনির (ডানদিকে) সঙ্গে

প্রতিভার প্রতি অতি অহং বোধ, ইন্টারনেট-প্রচার, ‘সেলেব’ তকমার লোভ, ‘পি আর’ এসব জলঘোলা তখনও শুরু হয়নি। এককালে মাটির টানে, মানুষের টানে মানুষ চলত। উল্লেখযোগ্য বাঙালি ব্যক্তিত্বরা ছিলেন মাটির মানুষ একইসঙ্গে সর্বভারতীয় ও আন্তর্জাতিক। সেরকমই যে কয়েকজন আজও আছেন, অশোকবাবু অন্যতম একজন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট প্রাপ্তির খররটি জানার পর, বিশ্বভারতীর অধ্যাপক বিশ্বজিৎ রায় যেমন তাঁর ফেসবুক-দেওয়ালে লিখেছিলেন, “তাঁর এই ডিলিট প্রাপ্তি পড়াশোনার সাবেকি বাঙালিয়ানা-ঘরানার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।” 

অশোককুমার দাস মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলায় এদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ, প্রায় ৬০ বছর আগে কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে একজন রক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক, গবেষক, লেখক বহুদিন জয়পুর সিটি প্যালেস মিউজিয়ামের (Jaipur City Palace Museum) ডিরেক্টর ও কিউরেটর হিসেবে কাজ করেছেন। জাহাঙ্গীরের সমসাময়িক মুঘল পেইন্টিংগুলি নিয়ে চর্চা, প্রাচ্য থেকে কীভাবে তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, এই নিয়েই ছিল তাঁর পিএইচডি থিসিসটি, যা ১৯৬৭ সালে বই হিসেবে প্রকাশ পায়। প্রায় ৬০টিরও বেশি বই লিখেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রজমনামা, ওয়ান্ডারস অফ নেচার : উস্তাদ মনসুর অ্যাট দ্য মুঘল কোর্ট, স্প্লেনডার অফ মুঘল পেইন্টিং বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য। সেই সময় মুঘল শিল্পকর্মে পাশ্চাত্যের প্রভাব দেখা গেছিল, উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, ১৫ শতকের জার্মান চিত্রশিল্পী এবং মুদ্রণকার আলব্রেখট ডুরার-এর খোদাই, যা মুঘল দরবার অবধি পৌঁছেছিল। মুঘল শিল্পীরা সেই খোদাই কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং তাঁদের কাজে তার ছাপ পড়ে। আবার, রেমব্রান্ট বা ১৮ শতকের ডাচ শিল্পী—ফ্রান্সের রোমান্টিক চিত্রশিল্পী ইউজিন ডেলাক্রোইক্স মুঘল শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, শিখেছিলেন, নিজেদের লেখা বইতে বিশদে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এভাবে অশোকবাবুর লেখা থেকে জানা যায়, মুঘলশিল্পকলার প্রাচ্য-পাশ্চাত্য যোগ।

মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলায় এদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ অশোককুমার দাস, প্রায় ৬০ বছর আগে কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে একজন রক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক, গবেষক, লেখক বহুদিন জয়পুর সিটি প্যালেস মিউজিয়ামের প্রাক্তন ডিরেক্টর ও কিউরেটর হিসেবে কাজ করেছেন।

জাদুঘর নিয়ে অশোকবাবু বরাবর আবেগপ্রবণ। সময় পরিবর্তিত হয়েছে, প্রযুক্তি পরিবর্তিত হয়েছে, এবং অধ্যাপক অশোককুমার দাস চান জাদুঘরগুলিও পরিবর্তিত হোক। ভারতীয় জাদুঘরে মুঘল সম্রাট আকবরের সমসাময়িক রামায়ণ এবং রাজনামা সহ বেশ কিছু সেরা সম্পদ আছে। আছে সেই সময়ের মহাভারত। দুটি মহাকাব্যের পাণ্ডুলিপিই মূল্যবান  চিত্রকলা, সংস্কৃত থেকে ফারসিতে অনুবাদ সহ খোদাই করা হয়েছে এবং পারিবারিক বিরোধের কারণে অন্তত ২৫ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের ঢালের আড়ালে সংরক্ষিত আছে। এই ঐতিহাসিক এবং মূল্যবান নথিগুলি দেখেছেন এমন শেষ কয়েকজনের মধ্যে অশোকবাবু একজন। মুঘল, রাজস্থানী এবং পাহাড়ি চিত্রকর্মে তাঁর দক্ষতার জন্য একাধিকবার লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এবং অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, নিউ ইয়র্ক সিটির মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট সহ বিশ্বের সেরা গ্যালারিগুলিতে একজন পরামর্শদাতা হিসাবে সসম্মানে আমন্ত্রিত হয়েছেন।

ইরানের রাজা রেজা শাহ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোররজী দেশাই, মহারাজা ভবানী সিংহ প্রমুখ গণ্যমান্যদের জয়পুর সিটি প্যালেস মিউজিয়াম ঘুরে দেখাচ্ছেন অশোকবাবু

তাঁকে দেখে কতশত মানুষ উদ্ধুদ্ধ হয়েছেন শিল্পকলার ইতিহাস জানতে। পেশাজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে থাকেন অশোকবাবু। নিয়মিত বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে যাওয়া, ক্লাস বা সেমিনারে বক্তব্য রাখা এসব চলেই। তাঁর জীবনসঙ্গী শ্যামলী দাসও একজন স্বনামধন্য টেক্সটাইল-গবেষক। আবিশ্বের নানা ইতিহাস তো বটেই বিশেষত বাংলার প্রকৃতি, তার রূপলাবণ্য, জীববৈচিত্র, শিল্পবৈচিত্র নিয়ে নিরন্তর চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন এই দম্পতি। দুজনেই সদা হাস্যময়, নির্মল। ছবি তোলা অশোকবাবুর আর এক নেশা। এখনও গ্রামবাংলায় ঘুরে ঘুরে মন্দির দেখতে বড়ো ভালোবাসেন। ছোটো শিশুর মতো জানার কৌতুহল ফুটে ওঠে তাঁর শারীরিক ভঙ্গিমায়। মাটিতে থেবড়ে বসে পড়ে, ক্যামেরা বন্দী করেন পুরা-নিদর্শন, প্রাচীন মন্দিরের গায়ে খোদিত ঐতিহাসিক কারুকাজ। এ শুধু অ্যাকাডেমিক আগ্রহ হতে পারে না, শিল্পের প্রতি, ইতিহাসের প্রতি অনাবিল ভালোবাসা। 

দুটিতে, জুটিতে

গত ১৩ জুলাই অশোকবাবুর লন্ডনে সম্মাননা গ্রহণের পরদিনই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। বঙ্গদর্শন.কম –এর পক্ষ থেকে জানতে চাই, শিল্প-ইতিহাসচর্চা জরুরি কেন বলে আপনার মনে হয়? এর সঙ্গে তো একজন ব্যক্তি মানুষের আবেগ জড়িয়ে থাকে, AI-এর যুগে শিল্পচর্চার গুরুত্ব কী ক্রমশ কমবে? আমাদের দেশে ক্ষমতাবলে মুঘল বা ইসলামিক ইতিহাস অপসারণ করার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবেত্তা হিসেবে আপনি বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?

প্রবীন ইতিহাসবেত্তা কোনও রকম কুণ্ঠা না নিয়েই বলেন, “AI হল বড়োলোকি ব্যাপার। শিল্প-চেতনা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, তার প্রয়োজন কোনও দিন ফুরাবে না। আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করি আমাদের রুচি ও শিল্প বোধের বড়োই অভাব। বাড়ির পরিবেশ,  স্কুলের শিক্ষা সহায়ক না হলে, ছোটো থেকে এই বোধ জন্মায় না।

মুঘল ইতিহাস স্কুল-সিলেবাসে না থাকলে বা কম করে দিলেই তো ইতিহাসের প্রবাহ থেকে মুছে যাবে না। মুঘল সংস্কৃতি তো ভারতীয় সংস্কৃতিরই সমন্বয়, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, বেশভূষা, গান, বাজনা, নাচ, শিল্প, স্খাপত্য, আরও নানা দিকে তার প্রভাব, তা অস্বীকার করা যায় কি? ইতিহাস তো এক দিনে গড়ে ওঠে না, এক দিনে ভেঙ্গেও যায় না।”

___________

ছবিঋণঃ অশোককুমার দাস, অভ্র বসু

Developed by DXDasia